ইজিবাইক নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড!

খুলনা সংবাদদাতা :  অবৈধ ইজিবাইক চলাচলে বাধা দেওয়ায় বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করলেন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদ্য বিদায়ী পুলিশ কমিশনার নিবাস চন্দ্র মাঝি।

নগরীর একটি হোটেল আয়োজিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে নিবাস চন্দ্র মাঝি বলেন, ‘নগরীতে ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ এবং এর থেকে অর্থ আদায় সবই রাজনৈতিক নেতারা করে থাকেন। ফলে পুলিশ এ ব্যাপারে অসহায় হয়ে পড়েছেন নেতাদের কাছে। ইজিবাইক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করায় আমাকে বদলি করা হয়েছে।’

আমদানি নিষিদ্ধ হলেও খুলনা শহরে প্রতিনিয়ত ইজিবাইকের সংখ্যা বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র মনিরুজ্জামান মনি। তিনি জানান, নগরীতে প্রায় ৪০ হাজার ইজিবাইক চলাচল করছে। এর নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার এবং এখনই লাগাম টেনে ধরা দরকার।

এর আগেও অবৈধ ইজিবাইক চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে নানা পদক্ষেপের কথা বলেছেন রাজনৈতিক নেতাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কিন্তু এর আশানুরূপ কোনো ফল মেলেনি।

২০১৬ সালের ১১ মে তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুস সামাদের সভাপতিত্বে খুলনা জেলা প্রসাশকের সম্মেলন কক্ষে ‘জেলা ও মহানগর যানজট নিয়ন্ত্রণ, ব্যাটারি চালিত থ্রি-হুইলার (ইজি বাইক) ও অবৈধ হকার উচ্ছেদ’ সংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেআইনি যান হিসেবে ইজিবাইক বন্ধ করার পক্ষে মত দেওয়া হয় ।

কিন্তু ওই সভায় খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান, খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মিজানুর রহমান মিজান মত দেন, খুলনা মহানগরীতে বাস্তবতার নিরিখে এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ বন্ধ না করে ক্রমান্বয়ে সীমিত পরিসরে চলাচলের জন্য মোট পাঁচ হাজার ইজিবাইক চলাচলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাঁরা মতামত দেন, যেসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় ভাবে যন্ত্রাংশ সংযোজন করে ইজিবাইক বিক্রি করে সেসব প্রতিষ্ঠান যাতে ইজিবাইক বিক্রি করতে না পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

ওই সময় খুলনা সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আনিসুর রহমান বিশ্বাস ও জেলা পরিষদের প্রশাসক শেখ হারুনুর রশিদ ও সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান এ বক্তব্য সমর্থন করেন।

সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পাঁচ হাজার ইজিবাইক মহানগরীর কয়েকটি সড়কে চলাচল করতে পারবে এবং এর চালকদের লাইসেন্স থাকতে হবে। একইভাবে নগরীর ইজিবাইক শো-রুমগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। এ ইজিবাইকগুলোতে বিশেষ রং নির্দিষ্ট এবং তালিকা প্রদান করবেন সংসদ সদস্য এবং সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

তবে এই সিদ্ধান্তের পর দুই বছর পেরোলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। চিহ্নিত করা হয়নি সেই পাঁচ হাজার ইজিবাইক। বরং গত দুই বছরে নগরীর অলি-গলি এবং জেলার বিভিন্ন স্থানে ইজিবাইকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) খুলনা সার্কেলের উপপরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. জিয়াউর রহমান জানান, ২০১২ সালে নিষিদ্ধ করা হলেও যন্ত্রাংশ আমদানির নামে ইজিবাইক আসছে। খুলনায় অর্ধশত  ইজিবাইক শো-রুম রয়েছে। তাঁরা কয়েকটি শো-রুম সিল গালা করে দিয়েছিলেন, সিটি করপোরেশন ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করেছে। কিন্তু তারপরও প্রতিদিনই নতুন নতুন ইজিবাইক রাস্তায় নামছে। নগরী আর জেলা মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার ইজিবাইক চলাচল করে রাস্তায়।

অবশ্য ইজিবাইক চালকরা অভিযোগ করেন, কয়েকটি শ্রমিক লীগের নেতাকর্মীরা তাঁদের কাছ থেকে ভর্তি ফি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং মাসিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করে চাঁদা নেয়।

টাকা আদায়ের কথা স্বীকারও করেছেন অটোবাইক শ্রমিক লীগ খুলনা অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক বাবুল হোসেন মোল্লা। তিনি জানান, নগরীতে তাদের পাঁচটি সংগঠন ইজিবাইক চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। এসব সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও খুলনা ২ আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান। তবে চাঁদা আর ভর্তি ফির টাকা কোথায় যায় তা বলতে রাজি হননি তিনি।

এদিকে খুলনাবাসীর জন্য যন্ত্রণার আরেক নাম হয়ে উঠেছে ইজিবাইক। যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা আর সড়কের মাঝপথে যাত্রী ওঠানামা করানো তাদের নিত্য নৈমিত্কি ঘটনা।

খুলনা পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. হামিদ আজগার জানান, হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনায় যত রোগী আসে তার বেশির ভাগই ইজিবাইক ও অন্য যানবাহনের কারণে।

বিআরটিএ খুলনা সার্কেলের উপপরিচালক জিয়াউর রহমান জানান, ২০ বছরের নিচে  বাংলাদেশের আইনে কেউ পেশাদার চালক হতে পারে না। কিন্তু ইজিবাইকের ক্ষেত্রে তা কেউ মানছে না। নগরীতে বেশির ভাগ দুর্ঘটনার কারণ এই ইজিবাইক।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের আঞ্চলিক সভাপতি আব্দুর রহিম বক্স দুদু জানান, বাস-ট্রাকের সাথে দুর্ঘটনা হলে ইজিবাইকের নামে মামলা করা যায় না। কারণ নাম্বার, ড্রাইভিং লাইসেন্স কিছুই নেই তাদের। ফলে প্রতিনিয়ত তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালের মটর শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি মতিয়ার রহমান জানিয়েছেন, ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ করতে তাঁরা লাঠিয়াল বাহিনী তৈরি করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *