বাংলা সন ও পঞ্জিকার ইতিহাস

শামসুজ্জামান খান :  বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখন ভোক্তার সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বাংলাদেশ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় ঢুকে যাওয়ায় মানুষের হাতে নগদ পয়সাও জমা হচ্ছে

আমাদের এই উপমহাদেশের সভ্যতা নদী তীরবর্তী অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার মতোই কৃষি সভ্যতা। নদী তীরবর্তী বলেই যে এ সভ্যতা কৃষি সভ্যতা সেটি সহজেই অনুমেয়।

বাংলাদেশ প্রাচীন ভারতীয় এ সভ্যতারই অংশ। প্রাচীন কৃষি সভ্যতার আনুষঙ্গিক নানা সংস্কার-বিশ্বাসও এই সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। এসব সংস্কার প্রথমে কৃষি উৎসবের অঙ্গীভূত ছিল, পরে নববর্ষ উৎসব চালু হলে এসব সংস্কারমূলক আঞ্চলিক উৎসব তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

বাংলাদেশের প্রাচীন এমন একটি সংস্কারমূলক উৎসবের নাম ‘আমানি’ উৎসব। আমানি ছিল মেয়েলি উৎসব, এর লক্ষ্য ছিল পরিবারের কল্যাণ ও পারিবারিক কৃষির সমৃদ্ধি কামনামূলক। এ পারিবারিক উৎসবের আচার সম্পন্ন করতেন গৃহকর্ত্রী।

কৃষি আবিষ্কারে নারীর পথিকৃতের ভূমিকা এবং তারই ফলে নারীতান্ত্রিক বা মাতৃতান্ত্রিক সমাজের স্মৃতিচিহ্নবাহী বলে কেউ কেউ এ আচারমূলক অনুষ্ঠানটিকে চিহ্নিত করেন।

প্রাচীনকালে সমাজে শত্রুনিধনের আচার পালন করার রীতি ছিল বছরের প্রথম দিনে। লোকবিশ্বাস ছিল, এতে সারা বছর শত্রুর আক্রমণ ও অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। সেকালের বাংলায় নববর্ষে উদযাপন করা হতো বিগত বছরের গ্লানি মুছে ফেলার কামনায় কিছু আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।

চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী কোনো কোনো অঞ্চলে এ ধরনের অনুষ্ঠানের খবর পাওয়া যায়। অন্যদিকে চৈত্রসংক্রান্তি বা পহেলা বৈশাখের দিনে গাজন বা চড়ক অনুষ্ঠানের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে নতুন বছরের মঙ্গল কামনা।

লোকবিশ্বাস : চড়কের বাণফোঁড়ের ক্লেশের মধ্য দিয়ে বিগত বছরের পাপক্ষয়ের আরাধনা এবং নতুন বছরের সুখ শান্তি কামনা করা হতো। তাহলে দেখা যাচ্ছে চৈত্রসংক্রান্তি ও নববর্ষকে জোড়া উৎসব ধরা হলে তা একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনা দু’ধরনের উৎসবকেই অঙ্গীভূত করেছে।

রবীন্দ্রনাথের নববর্ষের গানেও বিগত বছরের জরা ও গ্লানি মুছে নতুন বছরে অগ্নিস্নানে ধরাকে শুচিস্নিগ্ধ করার অঙ্গীকারই ব্যক্ত হয়েছে। এভাবেই নববর্ষ উদ্যাপনে ঐতিহ্যের রূপান্তর প্রক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।

দুই

সুপ্রাচীনকাল থেকে বঙ্গদেশে বাঙালি কৃষিজীবী সম্প্রদায় নানা দেশীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করেছেন। ইংরেজ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিদারি প্রথা চালু হলে প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের জন্য নববর্ষের দিনে জমিদার বাড়িতে পুণ্যাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এদিন প্রজাবৃন্দ জমিদার বাড়িতে এসে খাজনা পরিশোধ করে জমিদারের দর্শন পেত এবং মিষ্টি মুখে আপ্যায়িত হতো।

সাধারণ মানুষের হাতে তখন নগদ পয়সার অভাব ছিল। ফলে মুদির দোকান থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাকিতে কেনার রেওয়াজ ছিল। নববর্ষের দিনে দোকানিরা হালখাতার আয়োজন করতেন।

হালখাতার দিনে দোকান ধূপধুনা দিয়ে সাজানো হতো। সারা বছর যারা বাকিতে জিনিসপত্র কিনেছেন তারা বকেয়া শোধ করে মিষ্টি মুখে আপ্যায়িত হতেন। এখন গ্রাম-বাংলায় হালখাতা আগের মতো জাঁকজমকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় না।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখন ভোক্তার সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বাংলাদেশ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় ঢুকে যাওয়ায় মানুষের হাতে নগদ পয়সাও জমা হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কেনাকাটায় বাকির ব্যবসা প্রায় উঠেই গেছে।

আর তাই জৌলুস হারিয়েছে হালখাতা অনুষ্ঠানটিও। তবে নববর্ষের অন্যান্য গ্রামীণ অনুষ্ঠান ও মেলা এখনও কিছু পরিমাণে চালু আছে, উদাহরণ হিসেবে লাঠিখেলা বা কাঠি নাচ (কুষ্টিয়া, নড়াইল ও কিশোরগঞ্জ), ষাঁড়ের লড়াই (কেন্দুয়া, নেত্রকোনার ভাটি অঞ্চল), মোরগের লড়াই (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), গরুর দৌড় (মুন্সীগঞ্জ), ঘোড়দৌড় (বৃহত্তর সিলেট ও ময়মনসিংহের ভাটি অঞ্চলে) হাডুডু খেলা (মানিকগঞ্জসহ অন্যান্য স্থানে) এবং সারা দেশে নানারকমের মেলার আয়োজনও ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব মেলায় যাত্রা জারি সারি প্রভৃত বিনোদন ব্যবস্থা যেমন ছিল অপরিহার্য তেমনি সারা বছরে তৈজসপত্র কেনা এবং মানুষের মেলামেশার জন্য মেলাগুলো ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এসব অনুষ্ঠান-উৎসব বা প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর সার্বিক আনন্দের উৎস এবং ঐতিহ্যে অংশগ্রহণের উপযোগী মাধ্যম। কিন্তু সর্বজনীন জাতীয় বিস্তার এসব অনুষ্ঠানের ছিল না এবং এসব অনুষ্ঠানকে পরিকল্পনার মাধ্যমে নববর্ষের উৎসবের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্তও করে নেয়া হয়নি।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নব-উদ্ভূত শিক্ষিত নগরবাসী বাঙালি মুসলমান ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্র-কাঠামোর মধ্যেও তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নানা গোষ্ঠীর আচার অনুষ্ঠান, ক্রিয়াকরণকে (Rituals) জাতীয় আধারে বিন্যস্ত করে নতুন এক সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক জাতিগঠনমূলক কর্মকাণ্ডে শামিল হতে প্রয়াসী হয়।

কিন্তু দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ধর্মতান্ত্রিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকারী পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এবং পূর্ব বাংলায় তার অনুসারীরা বাঙালির সমন্বিত সংস্কৃতির উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করেছে, একে নানা কৌশলে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। কারণ এর মধ্যে তারা দ্বিজাতিতত্ত্বের মৃত্যুবীজের অঙ্কুরোদগম লক্ষ করেছে।

তাই এর বিরুদ্ধে শুরু করেছে বাঙালিকে জাতিগত নিপীড়ন- তার আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে দেয়ার কূটকৌশল। এ ধারাতেই বাধা এসেছে বাঙালির নববর্ষ উদ্যাপনেও।

১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলার সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ উৎখাত হয়ে যাওয়ার পরই শুধু যুক্তফ্রন্ট সরকার ও তার মুখ্যমন্ত্রী একে ফজলুল হক বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করে বাঙালির জাতিগঠন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে একটি সুস্পষ্ট পথনির্দেশ দান করেন এবং সে বছর বিপুল উৎসাহে বাঙালি তার নববর্ষ উদ্যাপন করে।

তিন

রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগৃতির উৎসমুখ খুলে যাওয়ায় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ৯২-ক ধারা জারি করে স্বৈরশাসন চালু এবং রাজনৈতিক কর্মী, এমনকি সংস্কৃতি ক্ষেত্রের প্রগতিশীল সক্রিয়বাদীদের বিপুলহারে গ্রেপ্তার করায় সংস্কৃতির মুক্তধারার যে উৎসমুখটি খুলে গিয়েছিল তা আবার অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

১৯৫৮-এ আইয়ুবের সামরিক শাসন জারি হওয়ায় মুক্তবুদ্ধির চর্চা, গণমুখী সংস্কৃতির অনুশীলন একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু জনতার সংগ্রাম থেমে থাকতে পারে না। ১৯৬১ সালে ছাত্রলীগ বের করে গোপন লিফলেট ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’।

১৯৬২ সালে চার ছাত্রনেতার নেতৃত্বে স্বাধীনতার নিউক্লিয়াস গঠন, এই বছরেই ‘দেশ ও কৃষ্টি’ বইয়ে বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও ছাত্রদের শিক্ষা আন্দোলন সামরিক স্বৈরতন্ত্রের ওপর তীব্র আঘাত হানতে থাকে এবং বাঙালির এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার আন্দোলন তার রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী ও স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয়।

এ সময়ের ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ এক নতুন ও নব দিকনির্দেশক স্লোগান হিসেবে আবির্ভূত হয়। বাঙালিত্বের চেতনার তীব্র চাপে সে বছর (১৯৬৪) প্রাদেশিক সরকার বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করে।

সেদিন ঢাকার বিভিন্ন নববর্ষ অনুষ্ঠানে অভূতপূর্ব জনসমাগম হয়। বাংলা একাডেমি, পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ, ছায়ানট (প্রতিষ্ঠা ১৯৬১), পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশ, নিক্বন ললিতকলা কেন্দ্র, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ, সমাজকল্যাণ কলেজ ছাত্র সংসদ, গীতিকলা সংসদ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে হাঙ্গামার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার পরও বাংলা একাডেমির বটতলায় ‘ঐক্যতানের’ অনুষ্ঠানে এত দর্শক-শ্রোতার সমাগম হয় যে, ভিড়ের চাপে কয়েকজন আহত হয়। বাঙালির নববর্ষ অনুষ্ঠানে এত বিপুল মানুষের উপস্থিতি দেখে দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার বিস্ময় প্রকাশ করে।

এরপর বাংলা নববর্ষকে জাতীয় উৎসবে রূপ দিয়ে ছায়ানট রমনার অশ্বত্থমূলে অনুষ্ঠানের আয়োজন শুরু করে ১৯৬৭ সালে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ‘ছয় দফা’ আন্দোলন শুরু করার পর এই আয়োজন এক নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করে।

সেই থেকে বাংলা নববর্ষ সব বাঙালির জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে এবং রমনার বটমূলে ছায়ানটের এ অনুষ্ঠান এখন প্রতিবছর বিশাল থেকে বিশালতর হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা।

নানা প্রতীক মুখোশ ও জন্তু জানোয়ারের চিত্রণে এই উৎসব শুভ কল্যাণে যেমন জাতিকে বার্তা দেয় তেমনি অপসংস্কৃতি, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের প্রতি প্রকাশ করে তীব্র ঘৃণা।

চার

এবার আমরা বাঙালির বর্ষপঞ্জি বা পঞ্জিকা বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করব। নববর্ষ উৎসব সব দেশেই সর্বজনীন উৎসব। সে জন্যই সমাজ বিকাশের ধারায় একটা উন্নত পর্যায়েই কোনো জাতির নববর্ষ উৎসব ও তার পঞ্জিকার উদ্ভব ঘটে।

তাই এর একটা ধারাবাহিক ইতিহাস থাকে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বের দিক থেকে ব্যাখ্যা করলে বাংলায় বর্ষবরণ ও বাঙালির বর্ষপঞ্জি উদ্ভাবনের যে পরিচয় পাওয়া যায় তা অন্যান্য সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত প্রক্রিয়ারই পরিচয় বহন করে।

ইংরেজি ‘ক্যালেন্ডার’ শব্দটি মূলে ল্যাটিন শব্দজাত। যত দূর জানা যায়, এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল : ‘হিসাব-বই’। অন্যদিকে ইংরেজি আলমানাক শব্দটি আরবি ভাষা থেকে এসেছে বলে অনুমিত হয়। ‘আলমানাক’ যে অর্থ প্রকাশ করে তার বাংলা অর্থ করলে ‘পঞ্জিকা’ বলা যেতে পারে।

ক্যালেন্ডার বলি, আর আলমানাক বলি- দুয়েরই জন্মস্থান প্রাচীন মিসর। পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন পঞ্জিকা মিসরে প্রস্তুত হয়েছিল বলে পঞ্জিকাকে মিসরীয় সভ্যতার অবদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

মিসরীয়রাই প্রায় ৬ হাজার বছর আগে চান্দ্র হিসাবের ভুল চিহ্নিত করে সৌর পদ্ধতির গণনা শুরু করে। নীলনদ-তীরবর্তী এ বাসিন্দারা অত আগে প্রায় ৩৬৫ দিনে বছরের হিসাবের খুব কাছাকাছি পৌঁছে (The Calender : Devid Erwing Duncan : Fourth Estate, London, 1998)। এখানে খুব তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল কৃষির সঙ্গে পঞ্জিকার অপরিহার্য সম্পর্ক। মিসরকে নীলনদের দান বলেছেন বিশ্বের প্রথম ঐতিহাসিক হেরোডেটাস।

নীলনদের একদিকে সবুজ কৃষিক্ষেত্র, অন্যদিকে ধূসর মরুভূমি। নীলনদ না থাকলে মিসর কৃষি সভ্যতার জননীস্বরূপ হতে পারত না। অন্যদিকে পাশ্চাত্যের সমুদ্রতীরবর্তী রোমে রোমান ক্যালেন্ডার (ইংরেজি ক্যালেন্ডার কথাটি ভুল। কারণ ওই ক্যালেন্ডারের সঙ্গে রোমের ক্যাথলিক ধর্মের সম্পর্ক ছিল- প্রটেস্টান্ট ইংরেজরা

তাই ওই ক্যালেন্ডার ১৭০ বছর পর্যন্ত গ্রহণ করেনি) বা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার চালু হয়ে তা পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত বহাল থাকে। পরে সে ক্যালেন্ডারের ভুলভ্রান্তি শুধরে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু হয়। সে ক্যালেন্ডার এখন সারা পৃথিবীতে ব্যাপকভাবে চালু হয়ে গেছে।

আমরা বলেছি, কৃষির সঙ্গে পঞ্জিকার সম্পর্ক নিবিড় ও অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ আমরা মিসরীয় ক্যালেন্ডার এবং ইউরোপের জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের কথা বলব। মিসরীয় সভ্যতায় বিশ্বের প্রথম যে ক্যালেন্ডার তৈরি হয় তাতে কৃষি উৎপাদন পদ্ধতির প্রভাবই ছিল প্রধান। কারণ কৃষি ঋতুনির্ভর।

বছরের নির্দিষ্ট সময়ে ফসলের বীজ সংগ্রহ, বীজ বপন, ফসলের পরিচর্যা ফসল কাটা- সবকিছুই সময়মতো করা চাই। তাই চান্দ্র ক্যালেন্ডার কৃষির জন্য উপযোগী নয়। চান্দ্র ক্যালেন্ডারে বছরে সাড়ে ১০ দিনের হেরফের হয়।

তাই চান্দ্র ক্যালেন্ডার (হিজরি ইত্যাদি) অনুসরণ করলে এ বছরে যখন ফসল বোনা হবে, তিন বছর পর তা এক মাস পিছিয়ে যাবে। কৃষি উৎপাদন ও তার ব্যবস্থাপনায় তাই চান্দ্র ক্যালেন্ডারের পরিবর্তে সৌর ক্যালেন্ডার প্রচলন হয়। মিসরীয় ক্যালেন্ডারেই এ সংশোধন করা হয়। বহু পরে (১৫৫২) ইউরোপের জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ত্র“টি দূর করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চন্দ্র ও সূর্যের আবর্তনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হয়।

ফলে জাগতিক কর্মকাণ্ড সূর্যের আবর্তননির্ভর বা ঋতুনির্ভর আর ধর্মীয় উৎসবাদি চন্দ্রকলার হ্রাসবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আসলে পঞ্জিকার মধ্যেও আমাদের সমাজ জীবনের ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ দুই সত্তাই একত্রে অবস্থান করাতে পঞ্জিকা জীবনের পূর্ণতারও প্রতীক।

বাংলা ও বিহারের (বাংলার বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা ও নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন এবং বিহারের ঐতিহাসিক অধ্যাপক কাশীপ্রসাদ জয়সোয়াল প্রমুখ) প্রখ্যাত বিজ্ঞানী-ঐতিহাসিক মনে করেন বাংলা সনের উদ্ভাবক সম্রাট আকবর।

তিনি তার রাজ্য শাসনের ২৯ বছরে (হিজরি ৯৯২ এবং ১৫৮৪ সালে) পঞ্জিকা সংস্কারে হাত দেন। তিনি তার নবরত্নসভার জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ সিরাজির নেতৃত্বে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের সনকে সৌর ও চান্দ্র বৈশিষ্ট্যে সমন্বিত করেন। তিনি একটি কেন্দ্রীয় ইলাহি সন করেছিলেন, কিন্তু বিভিন্ন অঞ্চলের ঋতু ও কৃষি উৎপাদনের দিকে লক্ষ রেখে প্রজাদের খাজনা দেয়ার সুবিধার্থে নানা আঞ্চলিক সনের প্রবর্তন করেন বা আঞ্চলিক সনের কাঠামো নির্দেশ করে দেন।

সেই কাঠমো-সূত্র অবলম্বন করেই কোনো কর্তৃপক্ষ বা আঞ্চলিক অধিপতি বাংলা সন চালু করেন। আমরা মনে করি নবাব মুরশিদ কুলি খান বাংলা সনের প্রবর্তক। আকবর অন্য যে আঞ্চলিক সন প্রবর্তন করেন তা হলো উড়িষ্যার আমলি সন, বিলায়েতি সন, সুরাসানি সন ইত্যাদি। এ সনগুলোকে বলা হয় ‘ফসলি সন’। বাংলা সনও তেমনি ফসলি সন।

‘আইন-ই-আকবরি থেকে জানা যায়, সম্রাট এমন একটি ত্র“টিমুক্ত এবং বিজ্ঞানসম্মত সৌরসনের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্যই আদর্শ হবে। বাংলা সনের মধ্যে তার সে আকাক্সক্ষা পূর্ণ হয়েছিল বলে লক্ষ করি।

কেননা বাংলা সন যেমন হিজরি সন নয়, তেমনি এটি ইলাহি সনের উপজাত হলেও মূল ইলাহি সন থেকে ভিন্ন। হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করা হলেও এর গঠন-পদ্ধতি ভারতীয় শকাব্দের মতো, তবে এটি শকাব্দের সমগোত্রীয় নয়। শকাব্দের সঙ্গে এর সম্পর্ক এইটুকু যে, এর মাস ও দিনের নাম শকাব্দ থেকে নেয়া হয়েছে।’

বাংলা সন একেবারেই স্বকীয়। আমাদের এ অঞ্চলে ২৪টির মতো সন ছিল। সেসব সন রাজা-বাদশাহ, ধর্ম বা সীমিত অঞ্চলের (ত্রিপুরা রাজ্য), কিন্তু বাংলা সন বাংলাদেশ ও জাতির নামে। তাই এ সন বাঙালির এত প্রিয়- জনজীবনে এত গুরুত্ববহ।

ভারত উপমহাদেশে পঞ্জিকা-সংস্কার উদ্যোগ প্রথমে নেয়া হয় মহারাষ্ট্রে। লোকমান্য বালগঙ্গাধর তিলক, শঙ্করবালকৃষ্ণ দীক্ষিত (`দ্র. The Indian Calender, Robert Sewel & Sankara Balkrishan Dikshit : M. B. Das Publishers, Delhi, 1995), ভেংকটেশ বাপুশাস্ত্রী কেতকর, যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি, ড. মেঘনাদ সাহা ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রমুখ।

শহীদুল্লাহ্ বাংলা একাডেমির পঞ্জিকা সংস্কার কমিটির প্রধান ছিলেন। তার সংস্কারের পর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি টাস্কফোর্স শহীদুল্লাহ্ কমিটির সংস্কার প্রস্তাবনার উন্নয়ন সাধন করেন। তা নিম্নরূপ : সাধারণভাবে বাংলা বর্ষপঞ্জির বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে ৩১ দিন এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে ৩০ দিন গণ্য করা হবে।

গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির অধিবর্ষে যে বাংলা বছরের ফাল্গুন মাস পড়বে সেই বাংলা বছরকে অধিবর্ষ গণ্য করা হবে।

অধিবর্ষে ফাল্গুন মাস ৩১ দিনে গণ্য হবে। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী রাত ১২টায় তারিখ পরিবর্তিত হবে।

পাঁচ

উপসংহারে বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলায় বাংলা সন-তারিখে যে অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে, সে প্রসঙ্গটি উল্লেখ করা দরকার। এ অসামঞ্জস্যের ফলে নববর্ষ, রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তী দুই অঞ্চলে একদিন আগে পরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এর দায় বাংলাদেশের নয়। শহীদুল্লাহ্র সংস্কারে বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতির্পদার্থবিদ মেঘনাদ সাহার সংস্কার প্রস্তাবকেই বাংলা একাডেমির পঞ্জিকা সংস্কারে গ্রহণ করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ভারতে ড. সাহার প্রস্তাবের কিছু সংশোধন করে এসপি পাণ্ডে কমিটি ১৪ এপ্রিলে পহেলা বৈশাখ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন।

ভারত সরকার কর্তৃক গৃহীত পাণ্ডে শীর্ষক কমিটির রিপোর্টে বলা হয় ‘The Year shall start with the month of vaisaka when the sun enters niranayana mesa rasi which will be 14th April of the gregorian calendar. (Indian Journal of History of sciences 39.4(2004) 519-534). বাংলা একাডেমির টাস্কফোর্সও একই তারিখে পহেলা বৈশাখ নির্দিষ্ট করেছেন এবং বাংলাদেশে সরকারিভাবে তা চালু হয়েছে। কিন্তু ভারতে সেখানকার পঞ্জিকাকারদের ব্যবসায়িক স্বার্থে পাণ্ডে কমিটির রিপোর্ট কার্যকর হয়নি।

পশ্চিম বাংলায় মেঘনাদ সাহার বৈজ্ঞানিক সংস্কারকে উপক্ষো করে পঞ্জিকাকারদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ভবিষ্যতে সন তারিখের ক্ষেত্রে তারা আরও গুরুতর সংকটের মধ্যে পড়বে।

এ বিষয়ে পশ্চিমবেঙ্গর বিখ্যাত পঞ্জিকা বিশারদ অধ্যাপক ক্ষেত্রমোহন বসু বলেছেন : হিন্দু পঞ্জিকাকারদের নিরয়ণ গণনা নিতান্ত মান্ধাতা আমলের সেকেলের হইয়া দাঁড়াইয়াছে।

নিরয়ণ গণনা-পদ্ধতির ফলে অধিবর্ষের সংখ্যা প্রতি ১০০ ও ৪০০ বছরে যথাক্রমে ২৬ ও ১০৩টিতে পৌঁছে যাচ্ছে। বঙ্গদেশের ঋতুচক্রের সঙ্গে তার মাসের চিরন্তন সম্পর্কে ব্যবধান সৃষ্টি হচ্ছে।

ফলে কয়েক হাজার বছর পর বৈশাখ মাসের শুরু আর গ্রীষ্মে হবে না, হবে বর্ষায় অর্থাৎ জুন মাসে। তাই বাংলা পঞ্জিকায় নিরয়ণ বর্ষমানের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক সৌর বর্ষমানের ব্যবহার আশু প্রয়োজন।

কারণ ওই নিরয়ণ পদ্ধতি যখন গ্রহণ করা হয়েছিল তখন ধারণা ছিল পৃথিবী নয় সূর্যই পৃথিবীর চারদিকে প্রদক্ষিণ করে- এ অবৈজ্ঞানিক মত। অতএব বিজ্ঞানের অগ্রগতির এই যুগে মান্ধাতা আমলের গণনা পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *