গাজীপুরে লাখপতি কোটিপতি লড়াই

গাজীপুর সংবাদদাতা : আসন্ন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বৈধ ৯ জন মেয়র প্রার্থী রয়েছে। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম সব থেকে বেশি সম্পদশালী। সম্পদের বিবেচনায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন বিএনপি প্রার্থী মো. হাসান উদ্দিন সরকার (হাসান সরকার)। এরা দু’জনই ব্যবসায়ী। এছাড়াও এই সিটিতে শিক্ষক ও চাকরিজীবীদের নাম রয়েছে প্রার্থীদের নামের তালিকায়। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দাখিল করা হলফনামা পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে।

হলফনামার বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মন্ডল বলেন, প্রার্থীদের হলফনামা প্রচার ও প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে সাধারণ ভোটাররা প্রার্থীদের তথ্য জেনে ভোট দিতে পারবেন।

তিনি বলেন, কেউ হলফনামায় তথ্য গোপন করলে এবং তা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের বার্ষিক আয় ২ কোটি ১৬ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৮ কোটি ৮৩ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। এর বাইরে রয়েছে ১ হাজার ৫৩৬ শতাংশ কৃষি ও অকৃষি জমি। অপরদিকে দেনা রয়েছে ৮ কোটি টাকা। রয়েছে দুটি অস্ত্র, গাড়িসহ আসবাবপত্র। নির্বাচনী প্রচার ও অন্য কার্যক্রমে তিনি ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করবেন বলে ইসিকে জানিয়েছেন। এর মধ্যে কর্মীদের পেছনে ব্যয় করবেন ১০ লাখ টাকা। আইন অনুযায়ী, গাজীপুর সিটি নির্বাচনে সর্বোচ্চ ব্যয় ৩০ লাখ টাকা ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত ব্যয় দেড় লাখ টাকা। তার ওপর নির্ভরশীল কোনো ব্যক্তির আয় দেখানো হয়নি হলফনামায়।

আরো দেখা গেছে, জাহাঙ্গীর আলমের শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএ পাশ। তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনবিদ্যালয় এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। অতীতে দ্রুত বিচার আইনে দুটি মামলা দায়ের হয়েছিল তার বিরুদ্ধে; যার মধ্যে একটিতে খালাস ও অপরটি থেকে অব্যহতি পেয়েছেন।

হলফনামায় জাহাঙ্গীর আলম বার্ষিক আয়ের মধ্যে ১ কোটি ১৬ লাখ ৩৮ হাজার টাকা আয়কর অধ্যাদেশের ১৯ই ধারায় অর্জিত দেখিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ ধারায় অপ্রদর্শিত টাকা সাদা করার বিধান রয়েছে। এছাড়া কৃষিখাত থেকে তার বার্ষিক আয় দেড় লাখ টাকা। বাড়ি ও দোকান ভাড়া পান ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ব্যবসা থেকে আয় ৯৪ লাখ ২০ হাজার টাকা।

হলফনামায় জাহাঙ্গীর আলম তার পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ব্যবসা। তিনি অনারেবল টেক্সটাইলস কম্পোজিট এবং জেডআলম এপারেলস লিমিটেড নামক দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। যদিও অনারেবল টেক্সটাইলস কম্পোজিটে তার শেয়ার রয়েছে ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও জেডআলম এপারেলস এ শেয়ার মাত্র ২০ হাজার টাকা।

তার সম্পদের মধ্যে নগদ টাকার পরিমান ৭ কোটি ৪৮ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। ব্যাংকে তার জমা রয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৭১ টাকা এবং ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন ৭৫ লাখ ২৩ হাজার ৭৮৭ টাকা। আর সঞ্চয়পত্র আছে ১০ লাখ টাকার। এছাড়া জাহাঙ্গীর আলমের দুটি গাড়ি, একটি বন্দুক ও একটি পিস্তল, ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং আসবাবপত্র রয়েছে।

স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৫৩৬ শতাংশ জমি। এর মধ্যে কৃষি জমি ১ হাজার ৪৯৫.১৫ শতাংশ, অকৃষি জমি ৩৩ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং আবাসিক/বাণিজ্যিক জমি ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। জমি বিক্রয়ের জন্য বায়না বাবদ ৮ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে তার।

এছাড়া নির্বাচনী পরিকল্পার বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলম রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন, নির্বাচনী প্রচারে ১ লাখ ১৪ হাজার পিস পোস্টার ছাপাবেন। ১০টি নির্বাচনী ও একটি কেন্দ্রীয় ক্যাম্প স্থাপন, ১০ লাখ লিফলেট বিতরন ও ৫৭টি পথসভা করবেন। এতে সর্বমোট ব্যয় হবে ৩০ লাখ টাকা।

অপর দিকে বিএনপির মনোনীত মেয়র প্রার্থী মো. হাসান উদ্দিন সরকার ও তার স্ত্রী সুলতানা রাজিয়া দু’জনই সম্পদশালী। তবে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর চেয়ে বিএনপি প্রার্থীর সম্পদের পরিমাণ অনেক কম।

হলফনামায় হাসান উদ্দিন সরকারের বার্ষিক আয় ১০ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ও তার উপর যারা নির্ভরশীল, তাদের বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৯১ হাজার টাকা দেখিয়েছেন। নিজের অস্থাবর সম্পদের পরিমান ৬৪ লাখ টাকা ও স্ত্রীর সম্পদের পরিমান ১৯ লাখ টাকা। এর বাইরে দুজনের ৫৩ তোলা স্বর্ণ, ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও আসবাবপত্র রয়েছে।

এছাড়া হাসান সরকার তার নিজের নামে একটি পিস্তল ও একটি শর্টগান এবং স্ত্রীর নামে এক নালা বন্দুক রয়েছে বলে উল্লেখ করেন হলফনামায়। স্থাবর সম্পদের মধ্যে হাসান সরকারের নামে ৫৯৮ শতাংশ ও তার স্ত্রীর নামে ৩০৫ শতাংশ জমি রয়েছে। আর স্ত্রীর নামে রয়েছে একটি ৪তলা বাড়ি। হাসান সরকারের ঋণ রয়েছে ২৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকা।

হলফনামায় আরো দেখা গেছে, হাসান উদ্দিন সরকার একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করেছেন। তার বিরুদ্ধে ঢাকার তেজগাঁও থানায় সন্ত্রাসী বিরোধী আইনে একটি ও টঙ্গী থানায় ১৯৭৪ সনের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা চলমান রয়েছে। দুটি মামলার একটি বিচারাধীন ও আরেকটি তদন্তাধীন রয়েছে। এ দুটি মামলা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ ও ২০১৮ সালে দায়ের করা হয়েছে। এর আগে ১৯৯৩ ও ১৯৯৯ সালে তার নামে তিনটি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে দুটিতে বেকসুর খালাস ও একটি খারিজ হয়েছে।

হাসান সরকারের বার্ষিক আয়ের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা পান ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া কৃষিখাত থেকে ৬৩ হাজার, বাড়ি/দোকান/অন্যান্য ভাড়া ৫ লাখ ২২ হাজার ৯০০ টাকা, ব্যবসা থেকে ৩ লাখ ৭৩ হাজার ও ব্যাংক সুদ বাবদ ১১ হাজার ৫২৬ টাকা আয় রয়েছে তার।

হাসান সরকারের অস্থাবর সম্পদ রয়েছে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে তার নগদ টাকা সাড়ে ৩ লাখ ও ব্যাংকে জমা ৬০ লাখ ৪৯ হাজার ৬০১ টাকা। রয়েছে ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গাড়ি। এছাড়া তার ২১ তোলা স্বর্ণ, ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও আসবাবপত্র রয়েছে। স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে- ৫০০ দশমিক ৫৩১ শতাংশ কৃষি জমি, যার দাম দেখিয়েছেন ৯৪ হাজার ৪৬৪ টাকা। এছাড়া রয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতক জমিসহ ৫টি দোকান, ৯০ শতাংশ জমি ও স্থাপনা, টঙ্গীতে সেমিপাকা ৩২টি রুমের ঘর এবং একচালা টিনসেড। অপরদিকে হাসান উদ্দিন সরকারের স্ত্রীর সম্পদের মধ্যে নগদ ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ব্যাংকে জমা ৫৮ হাজার ৫৪২ টাকা রয়েছে। এছাড়া তার (স্ত্রী) নামে ২৯০০ বর্গফুটের ৪তলা বাড়ি রয়েছে; যার দাম ৭৭ লাখ ৮৪ হাজার ১৮৮ টাকা। এছাড়া ৩২ তোলা স্বর্ণ, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, আসবাবপত্র ও একনালা বন্দুক রয়েছে।

হাসান সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য ব্যয় ২০ লাখ টাকা করবেন বলে ইসিকে জানিয়েছেন। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা তার স্ত্রীর কাছ থেকে নেবেন। নির্বাচনী প্রচারে তার পরিকল্পনায় রয়েছে- ৩ লাখ পোস্টার ছাপানো, দুটি নির্বাচনী ক্যাম্প, একটি কেন্দ্রীয় ক্যাম্প, ৫ লাখ করে লিফলেট ও হ্যান্ডবিল বিতরন, ঘরোয়া বৈঠক ও সভা, ৩৪২টি ডিজিটাল ব্যানার, ১৭১টি পথসভা এবং টেলিভিশন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *