বাংলার আদি চিত্রকলা

ফকরুল চৌধুরী :  পৃথিবীর সব দেশেরই নিজস্ব একটি শিল্প-ধাঁচ থাকে, যা শিল্পের বৈচিত্র্য ও উৎকর্ষের জন্য জরুরি। আমাদের শিল্প-ঐতিহ্যের অহংকার হলো পট। জাতিকেন্দ্রিক ও ভূমিজ সমাজব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট শিল্পনিদর্শন পটচিত্র। পটচিত্র কেবল চিত্রশিল্পের নান্দনিক ও শৈল্পিক উৎকর্ষের জন্য আদরণীয় নয়, এর মধ্যে সামাজিক,
ধর্মীয়, অর্থনৈতিক এমনকি রাজনীতিক পরিম-লের মিথস্ক্রিয়া ঘটেছে
ওরে পাষাণ মন আমার
হরদম গাজীর নাম লও।
আর হরদমে হরদমে গাজীর দমে করি সায়
মাঙ্গিলে মিলাইতে পারে মহিমা তাহার।

এটা গাজীর পট পরিবেশনার বন্দনাগীতের অংশবিশেষ। বন্দনাগীত শেষ হওয়ার পর বাঁ হাতে পটটি ধরে ডান হাতে একটি বাঁশের কাঠি দিয়ে পটের ছবিগুলো বর্ণনা করা হয়। ধারাবাহিকভাবে বর্ণনার সঙ্গে নৃত্যও হয়। জারিগানের তালও লক্ষণীয়। গাজী পটের মূল কথাÑ গাজীকে ভক্তি করা এবং নিয়মনীতি মেনে চলা। তা না হলে ভয়াবহ পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকা। চিত্র, গান ও নৃত্যের তাল-লয় সমন্বয়ে ভিজ্যুয়াল ধাঁচ উঠে আসে। ভাসমান শিল্প মাধ্যমের মতো তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। তবে বর্তমানে আর পটের পরিবেশনা তেমন লক্ষ করা যায় না। তাই পটুয়াদের দেখা মেলে না। তার পরও বিলুপ্তপ্রায় এ শিল্পের কিছু ছিটেফোঁটা রয়ে গেছে। নরসিংদী জেলার দুই পটকুশীলব হলেন দুর্জন আলী ও কোনাই মিয়া। দুর্জন আলী সবজি বেচেন আর কোনাই মিয়া বেদে। এদের পেশা থেকেই বোঝা যায়, পট পরিবেশনা সমাজের নিম্নবর্গীয়দের মধ্যেই বিদ্যমান। লোকজ অন্যান্য শিল্পের মতো এটাও ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় চলে এসেছে। সামাজিক পরিবর্তনে পটশিল্পের রূপান্তরও ঘটেছে। তবে এ শিল্পে তা ঘটেছে স্বাভাবিকভাবেই। ভূমিবর্তী এ শিল্পের সারল্য একে মহীয়ান করেছে। খুবই কম রেখায়, কম রঙে বেশি কিছু বোঝানোর ক্ষমতা রয়েছে পটচিত্রের। তাই গ্রামবাংলার কৃষক যে হাতে লাঙল চালায়, সে হাতে পট অঙ্কন করতে তাদের কোনো সমস্যা হয় না। এর জন্য কোনো বিদ্যায়তনিক শিক্ষার প্রয়োজন নেই। স্বতঃস্ফূর্ত শিল্পচৈতন্য থেকে রেখা ও রঙের সহজ ব্যবহারে শিল্পী হয়ে যান যে-কেউ। যেমন আমরা দেখতে পাই আদিম গুহাচিত্রে। লেখার আগেই মানুষ আঁকিবুকি শিখে ফেলে। কিংবা এভাবেও তো বলা যেতে পারে, গুহাচিত্রগুলোই ছিল লিপির আদি সংস্করণ। চিত্রভাষা বলে তো একটা ব্যাপার রয়েই গেছে। পটচিত্র আমাদের আদি শিল্পনিদর্শন। হিন্দু, মুসলিম কিংবা আদিবাসীদের কাছে এ শিল্প যূথবদ্ধতার প্রতীক। সবাই একে নিজেদের করে নিতে পেরেছে। বাঙালির আপন কলা। বাংলাদেশের কথিত আধুনিক চিত্রকলা আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। তবে প্রশ্নÑ পটশিল্প কি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যাবে? আমরা যদি আধুনিক শিল্পীদের ছবিগুলো দেখিÑ জয়নুল আবেদিন, এসএম সুলতান, কামরুল হাসান, সাফিউদ্দীন আহমেদের, তবে আমরা বিস্মিত হই। তারা কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় শিক্ষায় দীক্ষিত হয়েও পটচিত্রের গুণগ্রাহী হয়েছেন। বলিষ্ঠ ও জোরালো রেখার এমন সরসতা আর কোথায় আছে, পটচিত্র ছাড়া?

২.
মানবসভ্যতার আদি শিল্পনিদর্শন হলো অঙ্কন। প্রাগৈতিহাসিক শিল্পী ছিলেন মূলত শ্রমজীবীদেরই একজন। অন্যান্য মানুষের মতো তারও নিত্যদিনের জীবনযাত্রা ছিল শিকার ও সংগ্রহভিত্তিক। প্রাকৃতিক গুহাগুলোকে আদি মানুষ বাসস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিল। শুধু ঘুম ও বিশ্রামই নয়, গুহাকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। এর ফলে মানুষের মধ্যে একদিকে যেমন নৈকট্য বাড়ে, তেমনি কিছু রীতিনীতি দৃঢ় হতে থাকে। মানুষ ধীরে ধীরে কুশলী হয়ে ওঠে। বিভিন্ন উদ্ভাবনীর স্ফুরণ ঘটে। সৃজনকর্মেরও বিকাশ ঘটতে থাকে। তার প্রকাশরূপ আমরা দেখি আদিম গুহাচিত্রে। গুহার দেয়ালের গায়ের চিত্রাবলি থেকে আমরা প্রাগৈতিহাসিক শিল্পীগোষ্ঠীর মনোভঙ্গিটি বুঝতে পারি। গুহাচিত্রগুলো শিল্পের গুরুত্ব ও এর উপযোগিতা বুঝতে আমাদের সহায়তা করে। যে-সময় মানুষের মনন পরপূর্ণভাবে গড়ে ওঠেনি, তখন আদিম মানুষের মধ্যে শিল্পের প্রতি যে বোধ জাগ্রত হয়েছিল, নানাভাবে উপনিবেশিত ও আধিপত্য সংস্কৃতি দ্বারা বিপর্যস্ত দেশগুলো অর্থাৎ এর অন্তর্গত আমাদের বাংলাদেশের শিল্পের ধরনটি বুঝতে হলে অবশ্যই তা বুঝতে হবে।
আর এ শিল্পের গোড়ায়ই রয়েছে লোকশিল্প। প্রাচীনকালেই মানুষ তার প্রয়োজনের তাগিদে ও দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে উপলব্ধি করেছে সত্য ও সুন্দরের ইশারা। আর এ সত্য ও সুন্দরকে স্থায়ীরূপ দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের হাতে সাধারণ মানুষের জন্য সৃষ্টি হয় লোকশিল্প। অনায়াসে বিকাশ লাভ করেছে এ লোকশিল্প। পরে এ অনায়াসলভ্য ও স্বতঃস্ফূর্ত শিল্পধারা সমাজ, নিয়মরীতি, জোতদার, সামন্ত, রাজা, সামাজিক ও প্রাত্যহিক প্রয়োজনে লোকধারাও বিভক্ত হয়। জীবন-উদ্ভূত শিল্পের এ পরম্পরাগত ধারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েÑ ১. লোকশিল্প ও ২. মার্গশিল্প।
লোকশিল্প ধারায় অন্তর্গত হলো আলপনা, পটচিত্র, পুঁথিচিত্র, দশাবতার তাস, গ্রামবাংলার কাঁথার অলংকরণ, পোড়ামাটির পুতুল, মাটির হাঁড়ি, কাঠের পুতুল, ঘট, লক্ষ্মীর সরা, নকশা করা শীতলপাটি। অন্যদিকে মার্গীয় ধারায় রয়েছে পালশৈলী, মন্দির-মঠের গায়ে পোড়ামাটির অলংকরণ, মধ্যযুগের মুঘল ও রাজস্থানি চিত্রশৈলী এবং আধুনিককালে ইউরোপীয় চিত্রকলার অনুকরণে রচিত শিল্পকর্ম। আমাদের লোকশিল্পের অন্যতম প্রকাশ হলো আমাদের পটচিত্র। প্রসঙ্গক্রমে যামিনী রায় বাংলার চলিত চিত্রকলার যে সাধারণ বর্ণনা দিয়েছেন, সেখানে তিনি বলেছেনÑ ‘চিত্রকলা বাংলাদেশে চলিত ছিল দু’ভাবে; এক হলো ঘরোয়া বা আটপৌরে শিল্প, আর এক হলো পালাপার্বণের শিল্প যাকে পোশাকী-শিল্প বলা যায়। বাংলা দেশের আটপৌরে ছবি তার পটের ছবি আর তার পালাপার্বণের শিল্প দেবমূর্তি, প্রতিমা ইত্যাদি। এ দু-এর পার্থক্য স্পষ্ট : প্রথমটিতে প্রসাধনের প্রচেষ্টা নেই, সংস্কারের উৎসাহ নেই। দ্বিতীয় ছবি সংস্কৃত, আভিজাতিক। বেদাদির ঐতিহ্য তার নির্ভর। গঠনের দিক থেকে এ দু’জাতের ছবির বহু প্রভেদ।” যামিনী রায়ের এই উদ্ধৃতিটি উপলব্ধি করতে পারলে পটের বহু বিস্তৃত মাধুর্য ও আমাদের যাপিত জীবনের সঙ্গে এর আত্মিক যোগসূত্রটি সহজেই আবিষ্কার সম্ভব হবে।

৩.
পট শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘পট্ট’ থেকে। এর অর্থ কাপড়। পটচিত্র কাপড়ের ফালি বা টুকরার ওপর আঁকা হতো। এখন মাধ্যম বদলেছে। আগে হতো কাপড়ের ওপর খড়িমাটির জমি তৈরি করে; আর বর্তমানে জমির বদলে কাগজ সেঁটে। বাংলার পটচিত্রের বিবরণ ভারতীয় প্রাচীন পুরাণে উল্লেখ রয়েছে। তবে সেসবের নিদর্শন আমাদের সামনে নেই। আমরা আমাদের আদি পটচিত্রের নমুনা পাই ষোলো শতকে।
মানবজাতির প্রাথমিক পর্বেও শিল্পচর্চায় নান্দনিকতার বড় বেশি আবশ্যকতা ছিল না। তখন শিল্প সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। আদিম জনগোষ্ঠীর জাদুধর্মীয় ভাবধারা এতে কাজ করে। শিকারজীবী মানুষের কাছে পশু ছিল বেঁচে থাকার উপায়। ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে পারত এসব পশু। তাই প্রাচীন গুহার গাত্রে আঁকা প্রাণীগুলো শিকারজীবী মানবগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিই বিধৃত করে। আঁকা ছবিগুলোর মাধ্যমে মানুষ জীবজন্তুগুলোকে নৈকট্যে রাখতে চেয়েছে। চিত্রগুলো মানবগোষ্ঠীর সঙ্গে জীবজন্তুগুলোর একটি আত্মিক বন্ধনের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়। পটচিত্রের রকমফেরের দিকে নজর দিলেই বুঝতে পারা যায়, এতে আদিম মানুষের বাসনারই প্রতিফলন ঘটেছে।
জানা যায়, ভারতের প্রথম জাত-পটুয়া হলেন গোসাল। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় পাঁচশ বছর আগে তার জন্ম। বাবা নাম মঙ্খলী আর মায়ের নাম ভদ্দা। মঙ্খ শব্দের অর্থ পটুয়া বা চিত্রকর। গোশালায় জন্ম নেওয়া গোসালের বাবাও ছিলেন পটুয়া। তারা দেবদেবীর ছবি এঁকে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন। পট দেখিয়ে রোজগার করতেন। পট দেখানোর সময় ছবির সঙ্গে সংগতি রেখে গান গাইতেন। এসব প্রাচীন পটের কাগুজে নিদর্শন এখন আর নেই। তবে ভারহুত, সাঁচী, অমরাবতীর স্থাপত্যশিল্পে পটের পাথুরে প্রমাণ মেলে।
প্রাচীন কিছু গ্রন্থে পটের নিদর্শন মেলে। সপ্তদশ ও অষ্টদশ শতকের দুইটি গ্রন্থ বিশাখদত্তের ‘মুদ্রারাক্ষস’ নাটকে এবং বানবট্টের ‘হর্ষচরিত’ বর্তমান কালের যমপটের পটুয়া কিংবা জাদুপটুয়ার মতো যমপট্টিকারদের দেখা মিলত। এরা ঘরে ঘরে গিয়ে নিজেদের পটের কারিশমা প্রদর্শন করত। চর্যাপদের সময়কাল দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী। সর্বমোট চুরাশি জন সিদ্ধাচার্য ছিলেন। এদের মধ্যে অন্তত দুইজন সিদ্ধাচার্য ছিলেন যারা পট আঁকতেন। একাদশ শতক থেকে ভারত সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাল পর্যন্ত অভিনব এক জড়ানো পটের প্রচলন হলো। এর বিষয়বস্তু চিত্রপত্র। এগুলো মূলত জৈনদের ‘বিজ্ঞপ্তিপত্র’ বা ‘ক্ষমাপনাপত্র’। এগুলো অনেক সময় দেড়শ ফুটেরও বড় হতো। আঁকা হতো শতাধিক ছবি। আসলে পটচিত্র এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এমন নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল যে, তা ছিল এক তুলনারহিত ব্যাপার।

৪.
পট দুই রকম হয়Ñ ১. আয়তাকার ‘চৌকস পট’ ও ২. দুই হাত চওড়া ও বারো থেকে পঁচিশ হাত লম্বা ‘জড়ানো পট’। কাঠের এক দ-ে গোটানো এ ‘জড়ানো পট’কে মনে করা হয় প্রাচীনকাল থেকে সাধারণে পরিচিত ‘যমপট’। পটচিত্রে এ জড়ানো পটের গুরুত্বই বেশি। এ ধরনের পটে সহজেই আখ্যান বা নীতিকথা বর্ণনা করা সম্ভব। পটুয়ারা এ রকম পটচিত্র দেখিয়ে চিত্রের পরম্পরায় গান গেয়ে একই সঙ্গে ‘লোকশিক্ষক’ ও ‘লোকরঞ্জক’ এর ভূমিকা পালন করে আসছে। এখানে বলা দরকার, পটচিত্র হলো একটি সমন্বিত শিল্পধারা। সেই অর্থে একজন পটুয়া শুধু একজন চিত্রকরই ছিলেন না, একসঙ্গে তিনি ছিলেন একজন কবি, গীতিকার ও সুরকারও। পটুয়ারা ছিলেন ধর্মজ্ঞান ও সামাজিক নীতিজ্ঞানে পারদর্শী। তাদের ছবি যেমন সমৃদ্ধ ছিল, তেমনি তাদের গানেও রক্ষিত হয় মেধা। চিত্রের মাধ্যমে নিম্নবর্গ কিংবা দলিত মানুষের নৈতিক শিক্ষাদানের দায়িত্ব তাদের পালন করতে হয়েছে। রামায়ণ-মহাভারত, ভগবত পুরাণ, মঙ্গলকাব্য ও চৈতন্য জীবন অবলম্বনে অঙ্কিত পট পর্যবেক্ষণ করলেই এর সমর্থন পাওয়া যাবে। একইভাবে পটচিত্রে সমাজের নানা অন্যায়-অবিচার দৃশ্যভাষ্য পেত। দলিত শিল্পীরা কখনও কখনও যে তাদের এই শিল্পমাধ্যমকে দ্রোহের হাতিয়ার হিসেবে চর্চা করেছেন এ রকম নানা আলামত রয়েছে। সেই সঙ্গে পটচিত্রগুলো সামাজিক ও ব্যক্তিক মননের প্রতিচ্ছবি ব্যক্ত করে। সোজা কথা, মানুষকেন্দ্রিকতাই ছিল পটচিত্রের পটভাষা।

৫.
পটচিত্রগুলো ভৌগোলিক অবস্থান, সমাজ ও ধর্মভেদে বিভিন্ন রকম। অবস্থান ও পরিবেশ অনুযায়ী পটের বিষয় ও শৈলী বদল হয়েছে। বিষয় বিচারে বাংলা পটচিত্রকে চার ভাগে ভাগ করা যেতে পারেÑ ১. সাঁওতাল উপজাতির জন্মকথা ও তাদের মধ্যে প্রচলিত ‘চক্ষুধান পট’, ২. যমপট, ৩. গাজীপট এবং ৪. হিন্দুপুরাণÑ রামায়ণ, মহাভারত, মঙ্গলকাব্য, কৃষ্ণলীলা ও চৈতন্যলীলা পট।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাঁওতালপ্রধান পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে প্রথম ধরনের পটের প্রচলন দেখা যায়। শিল্পীরা সাঁওতাল উপকথা অনুযায়ী তাদের জন্মকথা চিত্রিত করতেন। এ উপকথা ‘কো রিয়াক কথা’ নামে পরিচিত। এ কাহিনি পটের ওপর থেকে নিচে পাঁচটি অংশে আঁকা হতো। অর্থাৎ পাঁচটি ধাপে সাঁওতাল পটুয়ারা তাদের জন্মকথা বর্ণনা করতেন। তাদের আরেক ধাঁচের পটচিত্র রয়েছে, যার নাম ‘চক্ষুদান পট’। এর বিষয়ভাষ্য এ রকমÑ যখন কোনো মানুষ মারা যায় জাদুটুয়ারা মৃত ব্যক্তির একটি কল্পিত ছবি এঁকে শোকসন্তপ্ত সাঁওতালগৃহে হাজির হয়। আঁকা ছবির সঙ্গে মৃত ব্যক্তির কোনো রূপসাদৃশ্য থাকে না, কেবল লিঙ্গভেদে নারী বা পুরুষ কিংবা বয়সভেদে বয়স্ক কিংবা শিশু হিসেবে চিত্রিত করা হয়। রং ও রেখায় ছবিটি সম্পূর্ণ করলেও পটুয়া চক্ষুতারকার জায়গাটি খালি রাখে। চক্ষুতারকাবিহীন ছবিটি জাদুপটুয়া মৃতের স্বজনদের দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে টাকাকড়ি কিংবা অন্যান্য জিনিস নিয়ে ছবিটিতে চক্ষু দান করে। এর আগে জাদুপটুয়া মৃতের স্বজনদের জানায়, চক্ষুহীন অবস্থায় মৃত আত্মীয় লোকটি পরলোকে ঘুরে ঘুরে কষ্ট পাচ্ছে, তাদের কাছ থেকে ভুজ্জি পেয়ে পটুয়া চিত্রে চক্ষু এঁকে দিলেই মৃত আত্মীয়টি পরিত্রাণ পেতে পারে।
যমপটও চক্ষুদান পটের মতো পারলৌকিক মানসিকতার বিষয়বস্তু নিয়ে আঁকা। সমতল বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই এ ধরনের পট প্রচারিত হয়ে আসছে। এতে যম বা ধর্মরাজের বিচারে দ-িত ব্যক্তির নরকযন্ত্রণা আর পুরস্কৃত ব্যক্তির স্বর্গসুখের দৃশ্যাবলি আঁকা হয়েছে। এভাবে সবাইকে সৎপথে থাকার শিক্ষা দিতেন পটুয়ারা। গাজীপট হলো আদতে মুসলমানি পট। পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলার চলিত মুসলিম ধর্মযোদ্ধা, গাজী ও মহাত্মা পিরদের বীরত্ব ও অলৌকিক কর্মকা- বর্ণিত হয়েছে এ শ্রেণির পটে। তবে এ গাজীর পট কঠোরভাবে ধর্মভাবাপন্ন নয়। এর মধ্যেও লৌকিক ব্যাঘ্রদেবতা, বনবিবি প্রমুখের ছবি দেখতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের কুমিল্লা, ফরিদপুর ও বরিশাল জেলায় কালুগাজীর পট বিশেষভাবে জনপ্রিয়।
হিন্দু পুরাণ নিয়ে আঁকা পটগুলো বিষয়বৈচিত্র্য ও রচনাগুণে বিশেষ আকর্ষণীয়। এ পটগুলোর আখ্যান হিন্দু পুরাণÑ রামায়ণ, মহাভারত, ভগবত, মঙ্গলকাব্য ও চৈতন্যজীবন থেকে সংকলিত। সমতল বাংলার বিস্তৃত কৃষিজীবী মানুষের মধ্যে এদের বিশেষ আদর ছিল। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব জেলায়ই এ পট আঁকা হয়েছে। তবে মেদিনীপুরে কৃষ্ণলীলা, মঙ্গলকাব্যের, বর্ধমান ও নদীয়ায় চৈতন্যলীলার এবং বীরভূম, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার শাক্ত ও বৈষ্ণব বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে মনসা মঙ্গলকাব্যেও জনপ্রিয়তা দেখা যায়। এসব পটের রচনাশৈলী উন্নত।

৬.
কালীঘাটের পট বাঙালির নিজস্ব শিল্প-অভিব্যক্তির এক ভিন্নতর প্রকাশ। মানবগোষ্ঠীর সঙ্গে পটের যে অন্তরঙ্গ বিষয় ছিল, কালিঘাটের পটে তার শৈথল্য লক্ষণীয়। আর্থিক উপার্জনের উপায় হয়ে দাঁড়ায় পট। রুচি ও শৈলী ঔপনিবেশিক সাহেবদের ছুঁতে চেষ্টা করে। তার পরও সমাজের নানা অসংগতি, ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ, বাবুদের রঙ্গলীলা কালীঘাটের এসব নিম্নবর্গীয় পটুয়া বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মনোভঙ্গিটি তুলে ধরেন। অনেকেই কালীঘাটের পটকে বিশুদ্ধ পট হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন।
কালীঘাটের সূচনা কখন ও কীভাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ইতিহাস নেই। তবে মোটামুটি উনিশ শতকের গোড়ার দিকে এ পটশৈলীর উদ্ভব ঘটেছিল এবং এর বিকাশ অব্যাহত এ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত। বিশ শতকের প্রথম দিকেও এই চিত্রধারা প্রবাহিত ছিল। এর অবলুপ্তি ঘটে বিশ শতকের বিশ ও তিরিশের দশকের মধ্যে।
মূলত গ্রামবাংলার পরম্পরাগত শিল্পীরা রুজিরোজগারের আশায়ই জড়ো হয়েছিলেন ব্যবসা-বাণিজ্যের শহর কলকাতায়। এরা ঘাঁটি গেড়েছিলেন এ শহর কলকাতার কালীঘাটের আশপাশে। এদের বেশিরভাগই এসেছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলা থেকে। ‘পটুয়া’ ও ‘চিত্রকর’ এ দুই পদবি থেকে অনুমান করা হয়, কালীঘাটের পটুয়াদের আদি নিবাস ছিল প্রধানত দক্ষিণ-চব্বিশ পরগনা ও মেদিনীপুরে। তবে শুধু পরম্পরাগত পটুয়ারা নন, জীবিকার জন্য অন্য সম্প্রদায়ের শিল্পীরাও কালীঘাটে জড়ো হয়েছিলেন। শহুরে নাগরিক পরিবেশে, গ্রামের সমাজবন্ধনের বাইরে এসে নানা সম্প্রদায়ের শিল্পীর পারস্পরিক মেলামেশার মাধ্যমেই জন্ম নেয় কালীঘাটের শৈলী, এমনকি ব্রিটিশ কোম্পানি ঘরানার জলরঙে কাজ করা শিল্পীরাও কালীঘাটের শৈলীতে নিজেদের যুক্ত করেছিলেন। এভাবে পর্যায়ক্রমে দেশজ রঙের বদলে বিদেশে তৈরি রাসায়নিক রং, দেশি কাগজের বদলে বিলেতি কাগজ হয়ে উঠেছিল পটুয়াদের শিল্পকর্মের মাধ্যমে। এ মাধ্যমগত পার্থক্যের কারণে পটের পরম্পরা চরিত্র থেকে কালীঘাটের পট আলাদা হয়ে পড়েছিল।
বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে কালীঘাটের পটচিত্রের প্রধান উপজীব্য ছিল ধর্ম। কেবল কালীর পট নয়, দুর্গা, জসধাত্রী, গণেশজননী, শিব, শিবপার্বতী, গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী, যশোধা-কৃষ্ণ, রাধা-কৃষ্ণ, কৃষ্ণের অন্যান্য লীলা, রাম-সীতা, হনুমান, চৈতন্য-ষড়ভুজ ও আরও অনেক দেবদেবীর পট অঙ্কিত হয়েছে। ক্রেতাদের মধ্যে এর চাহিদাও ছিল প্রচুর। ধর্মের বাইরেও নাগরিক জীবনের পরিবেশ ও পরিস্থিতি, নানা সামাজিক চিত্র ধরা পড়েছে পটুয়াদের রং ও তুলিতে। কালীঘাটের চিত্রের অন্য বৈশিষ্ট্য এর আঙ্গিকে নয়, রূপাদর্শে। সবক্ষেত্রেই পটুয়ারা বিশেষ এক আদর্শায়িত সৌন্দর্যবোধ রূপায়ণ করেছেন। তবে পটুয়ারা তাদের স্বভাবজাত ধর্ম থেকে দূরে সরে যাননি। গ্রামবাংলার পটুয়ারা যেমন জ্ঞান, শিক্ষা, আনন্দ আর পুণ্যকে পটচিত্রের বিষয় করেছেন, কালীঘাটের পটুয়ারাও তেমনই তা অনুসরণ করেছেন।
পটচিত্রের আত্মিক যোগসূত্রটি মাটিবর্তী। এতে কোনো কৃত্রিমতা কিংবা শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়ার ছাপ নেই। এখানে পরম্পরায় ধারাটি বিস্তৃত। এবং পটচিত্রের ধর্মজ কাহিনিনির্ভরতা একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলেও স্বভাবে পটুয়ারা ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ। এরা শ্রেণি চরিত্রের দিক দিয়ে ছিল নিম্নবর্গীয়, শাসকশ্রেণি তাদের সবসময় দলন করেছে। এ পেষনের মধ্যেও ধর্মের বাণী ও নীতিশিক্ষার মাধ্যমে ন্যায়ের পক্ষে কথা বলেছেন। এভাবে নীতি ও ন্যায়বোধের মনন তৈরিতে পটুয়ারা ভূমিকা রেখেছেন।

৭.
পৃথিবীর সব দেশেরই নিজস্ব একটি শিল্প-ধাঁচ থাকে, যা শিল্পের বৈচিত্র্য ও উৎকর্ষের জন্য জরুরি। আমাদের শিল্প-ঐতিহ্যের অহংকার হলো পট। জাতিকেন্দ্রিক ও ভূমিজ সমাজব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট শিল্পনিদর্শন পটচিত্র। পটচিত্র কেবল চিত্রশিল্পের নান্দনিক ও শৈল্পিক উৎকর্ষের জন্য আদরণীয় নয়, এর মধ্যে সামাজিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক এমনকি রাজনীতিক পরিম-লের মিথস্ক্রিয়া ঘটেছে। যামিনী রায়ের উদ্ধৃতিÑ ‘শিল্পের মূল রহস্য কি তা জানতে হলে যে কোন দেশের প্রাগৈতিহাসিক ছবি বা বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রাকৃত পটুয়া ছবিকে বিশ্লেষণ করতে হবে। কারণ, ছবির মূল সত্যের সন্ধান এখানে এসেছিল।’ বলাই বাহুল্য, চিত্রশিল্পে আমাদের আপন শিল্পের পথ তৈরিতে, আধুনিক শিল্পের নিজস্ব সোপান তৈরিতে পটশিল্প সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। নিজের বাস্তবতা থেকে উন্মূল থেকে কথিত নান্দনিকতা চর্চা করা যেতে পারে, তা শিল্পের নকলামি হয়েই থাকবে। বাংলাদেশের চিত্র-ঐতিহ্য পটই হলো আমাদের শিল্প সত্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *