পাহাড়িয়া বেগুন পরিণত হচ্ছে রফতানি পণ্যে

টাঙ্গাইল সংবাদদাতা :  টাঙ্গাইলের পাহাড়িয়া এলাকায় দিন দিন বাড়ছে বেগুনের আবাদ। এসব এলাকা থেকে প্রতিদিন ট্রাক ভরে বেগুন চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। শুধু তাই নয়, বড় বড় পাইকারদের হাত ধরে এখানকার বেগুন এখন বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের পাহাড়িয়া এলাকা মধুপুর, ঘাটাইল ও সখীপুরে এবার ব্যাপক ভিত্তিতে আবাদ হয়েছে বেগুনের। ইসলামপুরী ও নসিমন জাতের বেগুনে সাফল্য এসেছে বেশি। আকারে বড় হওয়ায় বাজারে এ বেগুনের চাহিদা বেশি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিনই পাইকাররা আসছেন বেগুন কিনতে। ক্ষেত থেকেই প্রতি কেজি বেগুন পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা থকে ৫০ টাকা কেজি দরে। এ এলাকার অনেকেই বিদেশ না গিয়ে সে টাকা দিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৃষির প্রকল্প গড়ে তুলছেন। বেগুন চাষিরা বেগুনের দাম ভালো পাওয়ায় তারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। অধিক লাভজনক হওয়ায় ধান ছেড়ে বেগুন চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা।

জানা যায়, মধুপুর উপজেলার কুড়ালিয়া ইউনিয়নের কদিমহাতীল, টিকরী, কোনাবাড়ী, কুড়াগাছা ইউনিয়নের পিরোজপুর, গোলাবাড়ী ইউনিয়নের গোলাবাড়ী গ্রামসহ বিভিন্ন গ্রামে গত কয়েক বছর ধরে বোরো মৌসুমে তাদের জমিতে বোরো ধান চাষ না করে বেগুন চাষ শুরু করেছেন। অধিক লাভজনক হওয়ায় এলাকার প্রত্যেক কৃষকই ২০ শতক থেকে সর্বোচ্চ ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমিতে বেগুনের চাষ করেছেন। এসব এলাকায় মাঠে-মাঠে এখন কেবল বেগুনের ক্ষেত। এই এলাকার কৃষকরা হাইব্রিড ও নসিমন এবং যশোরের ইসলামপুরী ও সাদা গুটি জাতের বেগুন চাষ করেছেন।

উপজেলার মধুপুরের পোদ্দারবাড়ী গ্রামের রুহুল আমীন (৩৫) জানান, তিনি এবার কুড়ালিয়া ইউনিয়নের কদিমহাতীল গ্রামের ২৪ বিঘা জমি লিজ নিয়ে বেগুন চাষ করেছেন। তিনি হাইব্রিড ও নসিমন জাতের বেগুন চাষ করেছেন। তার বেগুন ক্ষেতে এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রতিদিন তিনি গড়ে প্রায় ৭০০ কেজি বেগুন বিক্রি করতে পারছেন। বাজারে বর্তমানে দেড় হাজার থেকে ১৭০০ টাকা মণ দরে বেগুন বিক্রি হচ্ছে। ফলে বেগুন চাষে যা ব্যয় করেছেন তার চেয়ে লাভ হচ্ছে বহুগুণ বেশি। শুধু রুহুল আমীন নন, মধুপুরে এ রকম প্রায় ৪০ জন বেগুন চাষি রয়েছেন। তারাও অনুরূপভাবে ৬০০ থেকে ৮০০ কেজি বেগুন বিক্রি করে থাকেন। বেগুন চাষিদের হিসাব মতে, শুধু মধুপুরেই প্রতিদিন ২০ লাখ টাকার বেগুন উৎপাদন হচ্ছে। এখানকার বেগুনসহ মধুপুরের সবজি রফতানি হচ্ছে বিদেশের মাটিতেও।

বেগুন বিক্রি করে রুহুল আমীনের মতো অনেক চাষি স্বাবলম্বী হচ্ছেন। বেগুন চাষে আশপাশের অনেক শ্রমিকেরও কর্মস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। হাইব্রিড ও নসিমন জাতের বেগুন রোপণ করে ৫০-৬০ দিনের মাথায় বেগুন পাওয়া যায়। এক বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করতে সর্বোচ্চ খরচ পড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। সেখানে পুরো মৌসুমে বেগুন পাচ্ছেন প্রায় দেড়শ’ মণ। দাম ভালো থাকায় এবার ব্যবসায়ীরা সরাসরি ক্ষেত থেকে নগদ টাকায় এসব বেগুন কিনে নিয়ে যান। পাইকারি বেগুন ক্রেতারা জানিয়েছেন, মধুপুর থেকে প্রতিদিন ৮-১০ ট্রাক বেগুন কিনে ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম ও বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে থাকেন।

মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাহমুদুল হাসান জানান, মধুপুরে এ বছর ১২০ হেক্টর জমিতে বেগুন চাষ হয়েছে। আমন ধানের ফসল তোলার পর অগ্রহায়ণ মাসে জমিতে বেগুনের চারা রোপণ করতে হয়। চৈত্র মাসের শেষ দিকে গাছে বেগুন ধরা শুরু হয়। বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় এই ৩ মাস বেগুন তোলা এবং বিক্রি করা হয়। বেগুন চাষে একদিকে উৎপাদন খরচ কম। অন্যদিকে ভালো মূল্য পাওয়ায় কৃষকরা বেগুন চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন।

বেগুন চাষিরা জানান, বাজারে ভেজাল কীটনাশকের কারণে কৃষকের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। তাদের দাবি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যদি কীটনাশক কোম্পানিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে ভেজালমুক্ত কীটনাশকের ব্যবস্থা করেন তবে বাংলাদেশ থেকে আরো কোটি কোটি টাকার সবজি বিদেশে রফতানি করা যাবে। পাহাড়িয়া এলাকার সম্ভাবনাময় একটি ফসল বেগুন। সরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে এখানকার বেগুন ব্যাপকভিত্তিতে দেশের বাইরে পাঠানো সম্ভব বলে মনে করছেন কৃষকরা।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ টাঙ্গাইলের উপপরিচালক আবদুর রাজ্জাক জানান, বেগুন আবাদে কৃষকদের প্রশিক্ষণসহ নানা ধরনের প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *