নদী ভাঙছে ফুঁসছে মানুষ

জয়া ফারহানা : প্রবাদ আছে, চোরের দশ দিন গৃহস্থের একদিন। কিন্তু একে আমরা সেই ‘সুবেহ বাংলার’ আমলের প্রবাদ হিসেবে ছুড়ে ফেলে দিতে পারি। সোনার বাংলার কালে এই প্রবাদ মেয়াদোত্তীর্ণ। এখন কেবল দশ দিন নয়, ত্রিশ দিনই চোরদের। গৃহস্থের জন্য একটি দিনও বরাদ্দ নেই। চোরদের দিনকাল খুবই ভালো যাচ্ছে। নইলে রাষ্ট্রের ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি হতো না। বাংলাদেশে ত্রিশ দিনই চোরদের। ফলে ২০১২ সাল থেকে অতিসম্পদশালী বৃদ্ধির হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এই সোনার বাংলায়। এতই বেশি যে, তা অতিধনীর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। ওয়েলথএক্স নামের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ৩ কোটি ডলার বা ২৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ রয়েছে এমন ধনকুবেরের সংখ্যা গত পাঁচ বছরে বেড়েছে ১৭.৩ শতাংশ। কোনোই প্রশ্ন থাকত না যদি তারা এই সম্পদ উৎপাদনের মাধ্যমে অর্জন করতেন। কিন্তু না। এই সম্পদ তারা অর্জন করেছেন রাষ্ট্রের অন্যায় আনুকূল্যে। রাষ্ট্র তাদের কোনো না কোনোভাবে অনৈতিক সহযোগিতা করেছে। সুবিধা করে দিয়েছে এত অল্প সময়ের মধ্যে ধনী হওয়ার। সুখবরের এখানেই শেষ নয়। আরও বড় সুখবর চুরির মাধ্যমে ধনী হওয়া চোরদের কোনোদিন আর চুরির টাকা ফেরত দিতে হবে না। সম্প্রতি ১০০ শীর্ষ ঋণখেলাপির যে তালিকা প্রকাশ হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, এই তালিকার অনেকেই ব্যবসার সূত্রে ‘পলিটিশিয়ানে’ রূপান্তরিত হয়ে গেছেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের মায়ায় মুগ্ধ হয়ে এনারা পলিটিশিয়ান হয়েছেন তা নয়। হয়েছেন চুরির টাকা যেন আর ফেরত দিতে না হয় তার জন্য। এর জন্য আর কোনো ব্যাখ্যা প্রয়োজন নেই। দেশ উন্নয়নের জোয়ারে প্লাবিত হচ্ছে। তাতে অতিধনীর সংখ্যা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত হারে বাড়ছে বাংলাদেশে। অন্যদিকে পদ্মায়ও জোয়ার বইছে জোর। কিন্তু তাতে দরিদ্র আরও দরিদ্র হচ্ছে। হতদরিদ্রের নিচে যদি দারিদ্র্যের কোনো নাম দেওয়া যেত তবে সে স্তরে নেমে যাচ্ছে তারা। নাসা প্রতিবেদন দিয়েছে, পদ্মা নদীর ভাঙনে ১৯৬৭ সাল থেকে ৬৬ হাজার হেক্টর জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ৬৬ হাজার হেক্টর জমির ভাঙনকবলিত মানুষের সংখ্যা কত? নদীভাঙনের শিকার কত লাখ অথবা কত কোটি মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন, সর্বহারা হচ্ছেন, উদ্বাস্তু হচ্ছেন? সে হিসাব নেই। তথ্য কমিশনের কাছেও নেই। যা আছে তা ভুয়া। সরকারি নথিপত্রের সঙ্গে বাস্তব হিসাব মেলে না কোনোদিন। কোন হিসাব মেলাব? ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। গত দশ বছরে পাচার হয়েছে সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা। সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা টাকার পরিমাণ ৪৮ কোটি ১৩ লাখ ১৭ হাজার সুইস ফ্রাঁ। বাংলাদেশি টাকায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। গরিব বাংলাদেশে এত ধনী! এ অঙ্কের হিসাব স্বয়ং পিথাগোরাসও মেলাতে পারতেন? আমরা ছাপোষা। ছাগলও বলতে পারেন। সংখ্যাগরিষ্ঠরা ছাগল না হলে কী করে দেশে সব চুরিদারি হালাল করে ফেলা হয়? বাংলাদেশে অতিধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির হার ওয়েলথএক্সের কাছে অস্বাভাবিক মনে হলেও আমাদের কাছে মোটেও অস্বাভাবিক নয়। যে দেশে হতদরিদ্রের ১০ টাকার চাল আবার সরকারি গুদামের জন্য বেশি টাকায় বিক্রি হয়, যে দেশে দরিদ্রতমদের জন্য বরাদ্দকৃত প্রকল্পের টাকা লুটেপুটে খাওয়া হয়, যে দেশে ভাঙন রোধে ২৫০ কেজি বালুর বস্তা ফেলার কথা থাকলে ১০০ বস্তা কম ফেলে গ্রামের পর গ্রাম নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয় সেই দেশে অতিধনীর সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাবে এ আর আশ্চর্য কী! নড়াইলের কালিয়ায় হতদরিদ্রদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ‘জমি আছে ঘর নেই’ আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর পাইয়ে দেওয়ার নাম করে প্রত্যেক হতদরিদ্রের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। ১০ টাকা কেজিদরে বরাদ্দকৃত চালের একটি অংশ ফের সরকারের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। এ মাসের ৮ তারিখে তেজগাঁও খাদ্যগুদাম থেকে পাচার হয়েছে ১১৫ টন চাল-গম। যারা অর্ধাহারী-অনাহারীদের চাল-গম মেরে দেন, গৃহহীনদের আশ্রয় মেরে দেন, ভাঙন রোধের জন্য বরাদ্দকৃত বালির বস্তা (জিও ব্যাগ) পর্যন্ত মেরে দেন, তারা সুযোগ থাকলে দেশের আকাশ-বাতাসও বিক্রির ব্যবস্থা করে ফেলবেন। এরই মধ্যে আমরা তার নমুনা দেখে ফেলেছি। বড়পুকুরিয়া থেকে কয়লা, সিলেট থেকে পাথর, দেশের প্রায় সব নদী থেকে বালু বিক্রি তো হচ্ছেই। আর এসব চোরের চুরি আড়াল করার জন্য প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে রয়েছে চোরগোষ্ঠীর মামাতো ভাই। তাদের ক্ষমতার দাপটে চোরদের নিয়ে লেখাও ভারি মুশকিল। লিখতে গেলে সুকুমার রায়ের ‘গল্প বলা’ ছড়ার দশা ‘এক যে রাজা-থাম না দাদা/ রাজা নয় সে সে রাজপেয়াদা/ তার যে মাতুল/ মাতুল কিসে/ সবাই জানে সে তার পিসে/ একদিন তার ছাদের পরে/ ছাদ কোথা হে টিনের ঘরে/ বাগানের এক উড়ে মালি/ মালি নয় তো মেহের আলী/ মনের সাধে গাইছে বেহাগ/ বেহাগ কোথায় বসন্ত রাগ/ থোও না বাপু খোঁচাখুঁচি/ আচ্ছা বাবা, চুপ করেছি।’ চোরদের সেফগার্ড মাসতুতো ভাইদের জন্য শেষ পর্যন্ত চুপই করে যেতে হয় আমাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *