শব্দদূষণে নষ্ট শিশুর বুদ্ধিমত্তা

বৈচিত্র ডেস্ক : ‘আফ্রিকার জঙ্গলে হিংস্র প্রাণী তাড়াতে যেসব হর্ন বা শব্দ ব্যবহার করা হয়- সেসব হর্ন আমাদের দেশে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে ব্যবহার করা হচ্ছে।

রাজধানীতে যেন চলছে অকারণে হর্ন বাজানোর প্রতিযোগিতা।’ ক্ষীণ গলায় থেমে থেমে এ কথাগুলো বলছিলেন কল্পনা রানি চক্রবর্তী।

রাজধানীর রমনা এলাকার বাসিন্দা কল্পনা চক্রবর্তী বলেন, হর্নের তীব্র শব্দে তার বুক (হৃৎপিণ্ড) থরথর করে কাঁপে। তিনি আরও বলেন, তীব্র শব্দে তার বুক যেমন কাঁপে শিশুদের বুকও তেমনি কাঁপে। নাতি-নাতনিদের স্কুলে আনা-নেয়ার পথে তিনি এসব কথা বলেন।

তীব্র শব্দদূষণের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হল- শব্দদূষণে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা নষ্ট হয় এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। তারা বলেন, হৃদরোগের একটা বড় কারণ হল শব্দদূষণ।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও বিশ্বব্যাংকের একাধিক গবেষণা ও সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৩০টি কঠিন রোগের প্রধান কারণ হল ১২ রকমের পরিবেশ দূষণ। এর মধ্যে শব্দদূষণ অন্যতম। উচ্চশব্দের কারণে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়াসহ সব বয়সী মানুষের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। ক্রমাগত শব্দদূষণে কানের টিস্যু আস্তে আস্তে বিকল হয়ে পড়ছে। ডাক্তারি পরিভাষায় এ রোগের নাম টিনিটাস।

মতিঝিল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহরীন হাসান স্নেহ জানায়, রাস্তায় টানা হর্নের কারণে ঠিকমতো পড়তে পারি না। এতে তার প্রচণ্ড মাথাব্যথা হয়। স্কুলে বসে থাকলেও হর্নের শব্দ কানে আসে। অস্থিরতা বাড়ে, অনেক সময় চোখে ঝাপসা দেখি, বমিও হয়। আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়–য়া শিক্ষার্থী জেরিন আফসানার মা রোকেয়া বেগম জানান, রাস্তা নিরাপদ নয়, তার ওপর বখাটেদের উৎপাত তো আছেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হর্নের প্রচণ্ড শব্দ। তার মেয়ে হর্ন শুনে প্রচণ্ড ভয় পায়, মাঝে মাঝে কেঁপে ওঠে। তিনি বলেন, যানবাহনগুলো বিকট শব্দে হর্ন বাজালেও কোনো প্রতিকার মেলে না। অথচ এ ঘাতক জীবন কুরেকুরে খাচ্ছে। শাহবাগ এলাকায় হর্ন বাজানো নিষেধ এমন সতর্ক বার্তা থাকলেও কেউই তা মানছে না। হাসপাতাল ও কলেজসংলগ্ন রাস্তায় একের পর এক হর্নে রোগী ও শিক্ষার্থীদের অসুবিধা হলেও কেউ কর্ণপাত করে না।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে সড়কে সামান্য শৃঙ্খলা ফিরে এলেও হর্ন বাজানোর তীব্র প্রতিযোগিতা একটুও কমেনি। বরং আরও বেড়েছে। যানবাহনের হর্ন ছাড়াও মহাসড়কের আশপাশে ভবন নির্মাণ কাজে ইট ভাঙার মেশিন, রড কাটার মেশিন, বহুতল ভবনে জেনারেটর, কল-কারখানার ওয়েলডিং মেশিন, গাড়ি মেরামতের ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন স্থানে অহরহ উচ্চ শব্দে মেশিন চলছে।

এতে শব্দদূষণ ঘটছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৬০ ডেসিবেল শব্দে মানুষের সাময়িক শ্রবণশক্তি নষ্ট হতে পারে। ১০০ ডেসিবেল শব্দে চিরতরে শ্রবণশক্তি হারাতে পারে। অথচ রাজধানীতে ১০৭ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ সৃষ্টি হচ্ছে। উচ্চমাত্রার শব্দে মানুষের স্বভাব ও মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। এ নিয়ে অনেক সময় পারিবারিক বিপর্যয়ও নেমে আসে।
বাংলাদেশ শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা অনুযায়ী, আবাসিক এলাকায় ভোর ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ শব্দসীমা হল ৫৫ ডেসিবেল এবং রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ৪৫ ডেসিবেল। এ বিধির আওতায় স্কুল-কলেজসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং অফিস-আদালতকে নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের চতুর্দিকে ১০০ মিটারের ভেতর কোনো ধরনের হর্ন বাজানো যাবে না। এর পাশাপাশি রাত ১০টার পর কোনোভাবেই শব্দদূষণকারী যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। অথচ রাজধানীর অলিগলিতে তীব্র হর্ন লাগাতার বাজানো হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, রাজধানীতে এখনও অনবরত হাই হাইড্রোলিক হর্ন বাজানো হচ্ছে। শুধু হাইড্রোলিক নয়, তার চেয়েও তীব্র শব্দের বিভিন্ন ধরনের হর্ন বাজারে এসেছে।

এগুলো হরহামেশা ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব হর্ন অফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে হিংস্র প্রাণী তাড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। তিনি বলেন, শব্দদূষণ একটি জাতির মেধাকে ধ্বংস করে দেয়। দেশে ভিআইপি গাড়ির নামেও অনবরত নানা ধরনের হর্ন ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে কোনটা ভিআইপি গাড়ি, কোনটি অ্যাম্বুলেন্স, আর কোনটি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি তা নির্ধারণে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছে পুলিশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর ট্রাফিক পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অকারণে হর্ন বাজানোর প্রতিযোগিতা চলছে। কয়জনকে জরিমানা করব। ‘ভিআইপি’ গাড়ির হর্নে অন্য গাড়ির চালকরা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। পেছনের গাড়ির হর্ন শুনে ভিআইপি মনে করে তারা সাইড দেয়। হর্নের শব্দের কারণে দায়িত্ব পালনে সমস্যা হচ্ছে।

তিনি জানান, রাজধানীতে পুলিশ ও র‌্যাব হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছিল। তখন কিছুটা কমেছিল উচ্চ শব্দের হর্নের ব্যবহার। বর্তমানে আবার এ হর্নের ব্যবহার বেড়েছে। আবার হর্নের ব্যবহার নিয়েও জটিলতা রয়েছে। কোন গাড়িতে হর্ন বাজানো হচ্ছে তা নির্ণয় করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, আইন দিয়ে কি কখনও অপরাধ নির্মূল করা যায় না?
পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী ছারওয়ার ইমতিয়াজ যুগান্তরকে জানান, রাজধানীসহ পুরো দেশে অকারণে হর্ন বাজানোয় যে ক্ষতি হচ্ছে তা খুবই ভয়ানক। এতদিন ট্রাফিক পুলিশের কাছে শব্দের মাত্রা পরিমাণের কোনো যন্ত্র ছিল না। সম্প্রতি ট্রাফিক পুলিশকে সাইন্ড মিটার বা শব্দ মাপার যন্ত্র দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২৫০ জনকে প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। এখন তীব্র হর্ন বাজালে যন্ত্রের মাধ্যমে তা মেপে জরিমানা করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, যে কোনো মূল্যে উচ্চ শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। কারণ, এটি ভয়ানক ঘাতক।

জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডা. তৌফিকুর রহমান ফারুক যুগান্তর বলেন, শব্দদূষণ মানুষকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়। তীব্র হর্নে মানুষের শুধু শ্রবণশক্তিই নষ্ট হয় না, মানুষের বুদ্ধিমত্তাও নষ্ট হয়। অতিরিক্ত কিংবা অকারণে হর্ন বাজালে শিশুসহ সব বয়সী মানুষের দেহে হৃদরোগ বাসা বাঁধে। স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে হার্ট ও মস্তিষ্কে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। শুধু আইনের দিকে তাকিয়ে না থেকে সবাই সচেতন হলে এ ঘাতক থেকে আমরা রক্ষা পাব। সবাই দায়িত্বশীল হলে শব্দদূষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *