প্রস্তাবটি শিশুসুলভ হঠকারিতা বৈ অন্য কিছু নয়

ড. মাহবুব উল্লাহ্ :  ড. আকবর আলি খান এক সময় বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রাশিয়ার জার ও মোগল সম্রাটদের চেয়েও অধিক ক্ষমতাবান।’ ১৯৯১-এ সংবিধান সংশোধন করে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন করার সময় প্রেসিডেন্ট এরশাদ যেসব ক্ষমতা ভোগ করতেন তার প্রায় পুরোটাই প্রধানমন্ত্রীর স্কন্ধে অর্পণ করা হয়। এ যাবৎকাল ধরে সব প্রধানমন্ত্রীই এ ধরনের ক্ষমতা ভোগ করে আসছেন।

ছোটখাটো সিদ্ধান্তের জন্যও প্রধানমন্ত্রীর মুখপানে তাকিয়ে থাকতে হয়। এ পরিস্থিতি নিশ্চয়ই কাম্য নয়। এর ফলে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে গভীর মনোযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে বিঘ্নের সম্মুখীন হতে হয়। অথচ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যদি অধিকতর মনোনিবেশ করার সময় পেতেন তাহলে জাতির কল্যাণ হতো।

সুধী মহলে বিষয়টি নিয়ে বেশকিছু আলাপ-আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবানুগ কোনো সমাধান আসেনি। বাস্তবানুগ সমাধানের জন্য বিদ্যমান সংবিধানের সংশোধনী প্রয়োজন। এ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম-কানুনের ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেত্রী বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে তার প্রস্তাবিত ‘ভিশন ২০৩০’-এ প্রস্তাব করেছিলেন রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

তিনি আরও প্রস্তাব করেছিলেন, দেশে একটি দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়টিও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর এবং শক্তিশালী করা হবে। তিনি যখন ‘ভিশন ২০৩০’ পেশ করেন তখন দেশের মানুষের মধ্যে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় তার ‘ভিশন ২০৩০’ জনগণের মধ্যে আরও ব্যাপকভাবে প্রচারের তেমন কোনো সক্রিয় উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

ইদানীং আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির পক্ষ থেকে যারা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার টকশোতে অংশগ্রহণ করেন তারা দু-একজন ছিটেফোঁটাভাবে ‘ভিশন ২০৩০’-এর কথা তুলে ধরছেন। তাদের উচিত আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ‘ভিশন ২০৩০’র প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো তুলে ধরা। তারা খুব ভালো করেই জানেন, বিএনপির সমালোচকরা প্রায়ই বলে থাকেন, বিএনপি শুধু নির্বাচনের কথা বলে; কিন্তু জনঘনিষ্ঠ ব্যাপারগুলো সম্পর্কে তাদের কথা বলতে শোনা যায় না। এ সমালোচনার মধ্যে সত্যতা আছে বৈকি।

ভিশন ২০৩০ দফাগুলোর ওপর আলোকপাত করলে দেশবাসী বুঝতে পারত দেশ নিয়ে বিএনপির চিন্তা-ভাবনাগুলো কী? কেন জানি এ ব্যাপারে একটা অনীহা লক্ষ করা যায়। হয়তো তারা ধরে নিয়েছেন, ম্যাডাম তো প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে নিজ কণ্ঠে এই ভিশনের প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করেছেন এবং তা কয়েকটি চ্যানেলে লাইভ প্রচারিত হয়েছে। ভিশন দলিলটি পড়ার সময় খালেদা জিয়া একবারের জন্যও এক চুমুক পানি অথবা চা পান করেননি।

এ থেকেই বোঝা গিয়েছিল এ ব্যাপারে তার আন্তরিকতা কত গভীর। এর পরবর্তীকালে তার দলের নেতাকর্মীরা যদি বারবার জনগণের কাছে ভিশনের দফাগুলো তুলে ধরত তাহলে জনগণ আশ্বস্ত হতে পারত যে, বিএনপি শুধু ক্ষমতা কব্জা করার কথাই ভাবে না, দেশ ও জনগণের জন্য কিছু করার কথাও ভাবে। খালেদা জিয়া একদিনের গণতন্ত্রকে অর্থাৎ ভোটের দিনের গণতন্ত্রকে সব সময়ের গণতন্ত্রের রূপ দেয়ার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছিলেন, এ দলিলের মাধ্যমে।

সাম্প্রতিককালে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর জোট গঠনের একটি তৎপরতা আমরা দেখতে পাই। এই তৎপরতা শাসক দলের মধ্যে যেমন আছে, একইভাবে আছে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে। সমালোচকরা বলেন, ড. কামাল হোসেন এবং অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ভোট নেই। সুতরাং এদের নিয়ে জোট সম্প্রসারণ করলে বা যুগপৎ কর্মসূচি প্রদান করলে বিএনপি ভোটের হিসাবে লাভবান হবে না। কিন্তু বাস্তবতা হল, এ দুই ব্যক্তির সামাজিক সুনাম আছে।

এ ছাড়া এরা অত্যন্ত জ্ঞানী মানুষ। অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিদ। চিকিৎসাশাস্ত্রের বাইরেও তার জ্ঞানের ভাণ্ডার খুবই সমৃদ্ধ। আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে তার একটি একাডেমিক বক্তৃতা শোনার সুযোগ হয়েছিল আমার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামের ইতিহাসের কলেজ শিক্ষকদের জন্য একটি ট্রেনিং কোর্সের আয়োজন করেছিল। সেই কোর্সের উদ্বোধনী সভায় ডাক্তার চৌধুরী ছিলেন প্রধান অতিথি। তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে তার বক্তব্য পেশ করেছিলেন।

এ বক্তৃতায় তিনি পাশ্চাত্যের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান প্রক্রিয়া স্বচক্ষে দেখে যে সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন তাও তিনি প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকদের মধ্যে তুলে ধরেছিলেন। আমি বুঝলাম, তিনি শুধু একজন ভালো চিকিৎসকই নন, তিনি একজন ভালো শিক্ষকও। ড. কামাল হোসেন ও ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরী জনগণের কাছে গেলে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ হবে এ ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই। কোনো কোনো সময় ছোট দলের বড় মাপের নেতারাও শক্তিশালী অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারেন।

দেশবাসী যখন একটি আশার আলো দেখছিল তখন সেই আলোর মধ্যে কিছুটা অন্ধকারের ছায়া ফেলে দিয়েছেন ডাক্তার বদরুদ্দোজা চৌধুরী তনয় মাহী বি চৌধুরী। তিনি আসন ভাগাভাগির একটি ফর্মুলা দিয়েছেন। এ ফর্র্মুলা অনুসারে বিএনপি পাবে ১৫০ আসন এবং জোটের অন্যরা পাবে বাকি ১৫০ আসন। এর ফলে নাকি বিএনপিকে বাগে রাখা যাবে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকার জন্য অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং যাচ্ছেতাইভাবে দেশবাসীর ওপর কর্তৃত্ব চালাতে পারবে না।

বিএনপি ও তার মিত্রদের ক্ষমতায় আসার বিষয়টি এখনও অনেক দূরবর্তী বিষয়। কেননা নির্বাচনের অনুকূলে একটি সুষ্ঠু পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। এই পথ পরিক্রমা অত্যন্ত কঠিন। সেই বন্ধুর পথ অতিক্রম না করে আসন ভাগাভাগির কথা বলা চরম আহাম্মকি ছাড়া আর কী হতে পারে। মাহী চৌধুরী কি জানেন না, জনসমর্থনের দিক থেকে বিএনপি ও তার মিত্রদের অনুপাত কী? সে জন্যই বলছি, এটা এক ধরনের মূঢ়তা। আমাদের মতো দেশে একটি দল এককভাবে সরকার প্রতিষ্ঠা করুক কিংবা জোটবদ্ধ হয়ে করুক, ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর অনেকেই আদর্শবাদিতা ধরে রাখতে পারে না।

আমরা তো একটি অমোঘ সত্যবাণীর সঙ্গে পরিচিত। বাণীটি হল, Power corrupts, absolute power corrupts absolutely. ক্ষমতার প্রলোভনের কাছে খুব কম লোকই প্রলুব্ধ না হয়ে পারে না। মাহী চৌধুরী যদি সত্যি সত্যি বিএনপির মতো বড় দলকে নিয়ন্ত্রণের রশি দিয়ে বাঁধতে চান তাহলে তার প্রস্তাবিত আসন বণ্টনের ফর্মুলা দিয়ে বাঁধতে পারবেন না। এজন্য প্রয়োজন দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। বিএনপি চেয়ারপারসন তার ‘ভিশন ২০৩০’-তে তিনটি সু’র কথা বলেছেন। এগুলো হল- সুনীতি, সুসরকার এবং সুশাসন। মাহী বি চৌধুরী যদি সত্যিকার অর্থে বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান তাহলে আসন সংখ্যার ফর্মুলা দিয়ে সেটি সম্ভব হবে না। এটি সম্ভব করতে হলে প্রয়োজন ব্যাপক সাংবিধানিক সংস্কার। এ সংস্কারের উদ্দেশ্য হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করা।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন খ্যাতনামা অধ্যাপক Daron Acemoglu এবং James A. Robinson যৌথভাবে একটি সাড়া জাগানো গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থটির নাম হল ‘Why Nations Fail’. একটি জাতি কেন ব্যর্থ হয় তার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এই দুই অধ্যাপক বলেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সক্ষমতার অভাবের মধ্যেই খুঁজতে হবে একটি জাতির দুর্বলতার বা ব্যর্থতার উৎস কোথায়। অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান ও রাজনীতির নানা ইতিহাস তুলে ধরে এ অধ্যাপকবৃন্দ যথার্থভাবেই বলতে চেয়েছেন, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার মধ্যেই নিহিত আছে জাতিরাষ্ট্রের ব্যর্থতার বীজ।

সুতরাং বাংলাদেশকে যদি এগিয়ে নিতে হয় তাহলে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো দূর করার দিকেই মনোনিবেশ করতে হবে। এ দেশে বিচার বিভাগ, পুলিশ বিভাগ, বেসামরিক প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, তথ্য অধিকার কমিশন, মানবাধিকার কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত নড়বড়ে। এগুলোর প্রতিটিরই যে ব্যাপক সক্ষমতা অর্জনের প্রয়োজন রয়েছে সে ব্যাপারে গণতন্ত্রমনা কোনো মানুষেরই দ্বিমত নেই।

এগুলোকে যথার্থভাবে শক্তিশালী করতে হলে এসব সংস্থায় নিয়োগ, পদোন্নতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে বিপুল সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারকেও শক্তিশালী ও কর্মক্ষম করে তুলতে হবে। রাষ্ট্রের সমুদয় প্রতিষ্ঠানকে জনবান্ধব করে তোলার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালনা করা যায় কিনা সে ব্যাপারেও গভীর চিন্তাভাবনার প্রয়োজন রয়েছে।

এসব ক্ষেত্রে সংস্কার আনতে পারলে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় আইন-কানুন ও বিধিবিধান চালু করতে পারলে সুশাসনের পথে এক পা হলেও অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে। সম্ভব হবে প্রশাসনকে দলীয়করণ থেকে মুক্ত করা। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তখন নির্মোহভাবে এবং আইন অনুযায়ী কাজ করবেন। আমি এ ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন যে, এই পরিবর্তন আনাটা সহজসাধ্য নয়। তারপরও পরিবর্তনের জন্য অঙ্গীকার করতে হবে। মানুষ পরিবর্তন চায়। এই পরিবর্তন আনতে হবে রাজনৈতিক কালচারে।

শাসক দলের থাকতে হবে বিরোধী দলের কথা শোনার মতো ধৈর্য ও সহনশীলতা। দুর্ভাগ্যের বিষয়, মাহী চৌধুরীর মতো সুকথক ব্যক্তি এসব গভীর বিষয়ের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে শুধু ভাবছেন, সিট বণ্টনের ফর্মুলা দিয়ে বড় দলগুলোর ওপর রাশ টেনে ধরতে পারবেন। একে লেনিনের ভাষায় বলতে হয়, Infantile Disorder. মাহী চৌধুরী বোধহয় এরকম একটি রোগেই ভুগছেন। একজন স্বনামধন্য ব্যক্তির পুত্রের মুখ থেকে আমরা কিছু মূল্যবান কথা শুনতে চেয়েছিলাম। আমাদের কপাল মন্দ, সে কথা শোনা হল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *