কাঠগড়ায় সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা, এ লজ্জা রাখি কোথায়?

বৈচিত্র ডেস্ক :  একসময় সংবাদপত্রকে বলা হতো অ্যান এনসাইক্লোপিডিয়া অব নলেজ অর্থাৎ জ্ঞানের বিশ্বকোষ। দিনে দিনে বিশ্বব্যাপী শিক্ষার হার বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংবাদপত্রের ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তার আকাঙ্ক্ষাও ডানা মেলতে থাকে।

পার্লামেন্ট, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের পাশাপাশি ফোর্থ এস্টেটের মর্যাদায় উন্নীত হয় সংবাদপত্র। সভ্য নাগরিক সমাজে এ আকাঙ্ক্ষা এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে, প্রিন্ট মিডিয়ার যাত্রাপথে যোগ হয় ইলেকট্রনিক মিডিয়া।

আর তখন থেকেই পৃথিবীকে গ্লোবাল ভিলেজ হিসেবে দেখার স্বপ্ন জাগে মানুষের। আজ মিডিয়ার কল্যাণে পৃথিবী গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে।

ক্রমবর্ধমান অস্থির পৃথিবীতে সব অনিয়ম-দুর্নীতি, ব্যভিচার-বিভৎতার স্বরূপ এবং সত্য ও সুন্দর প্রকাশে নির্ভীক ভূমিকার মাধ্যমে মিডিয়া ও সাংবাদিকতা এখন সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী হিসেবে কার্যকর ভূমিকায় অবতীর্ণ। কোনো নিরীহ মানুষ এমনকি রাষ্ট্র যখন প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা পরাশক্তি দ্বারা নিষ্পেষিত-নির্যাতিত হয়, তখনও সোচ্চার হয়ে ওঠে এ মাধ্যমটি।

বলা চলে- নিরীহ ও নির্যাতিত মানুষ এবং রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও শেষ রক্ষাকবচ হিসেবে বিশ্বাস এবং আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে মিডিয়া।

এ কারণে মিডিয়ার অধিকার বেডরুম পর্যন্ত বিস্তৃত এমন কথাও চাওর আছে। সে বিবেচনায়ই পৃথিবীর দেশে দেশে ‘প্রেস ফ্রিডম অ্যাক্ট’ প্রণীত হয়েছে। অধুনা পৃথিবীর সভ্য দেশগুলো মর্যাদার দিক থেকে এখন মিডিয়াকে ‘পার্লামেন্ট অলওয়েজ ইন সেশন’ অর্থাৎ মিডিয়াকে চলমান সংসদ হিসেবে গণ্য করছে।

বিশেষ করে পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যখন অনিয়ম-দুর্নীতি, ব্যভিচার-বিভৎসতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন অন্তত এসবের সত্য ও স্বরূপ তুলে ধরে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভারসাম্য রক্ষায়ও মিডিয়ার অবদান অপরিসীম। আমাদের সামনে এমন অসংখ্য ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি সৃষ্টি, সামরিক ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন- এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের দুঃসহ দিনগুলোতে মিডিয়া এবং সাংবাদিক সমাজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকারই ফসল আজকের এ সরকার। আর সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনী হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা বলতে গেলে বেশিদূর যাওয়ার প্রয়োজন হয় না।

সম্প্রতি অর্থের লিপ্সায় নারায়ণগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসৎ কর্মকর্তা ও সদস্যদের মানুষ হত্যার নারকীয় তাণ্ডবের পরিণতিতে বিচার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা, এর আগে রাজশাহীর বাঘমারায় বাংলাভাইয়ের বীভৎসতার স্বরূপ তুলে ধরা, ক্লিনহার্ট অপারেশনের সময় কিশোরগঞ্জে জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিপদগামী কর্মকর্তা ও সদস্য কর্তৃক গ্রেফতার-হত্যার ভয় দেখিয়ে নিরীহ যুবকদের পরিবারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা আদায় এবং কোর্ট ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা কর্তৃক বিচারাধীন এক আসামির সুন্দরী স্ত্রী ধর্ষণের ঘটনা এবং এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলা একই কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ফাইলড করা ও পরবর্তী সময়ে জজকোর্টে রিভিশন করার পর ওই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তার সাত বছরের সাজা হওয়ার ঘটনা এসবই মিডিয়ার অনুসন্ধানী ভূমিকায় সম্পন্ন সম্ভব হয়েছে।

অপারেশনে এসে জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনী এবং কোর্টে দায়িত্ব পালনকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরগঞ্জের এ দুটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট করতে গিয়ে আমি বহু হুমকি-ধমকির শিকার হলেও সত্য প্রকাশে পিছপা হইনি।

এসব সত্য উপলব্ধি করে যখন নাগরিক সমাজ মিডিয়ার স্বাধীনতা আরও সুরক্ষিত করার প্রয়োজন অনুভব করছে, তখন নিরাপত্তার অজুহাতে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ এবং ‘সম্প্রচার আইন’ প্রণয়ন মিডিয়া ও সাংবাদিক সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর শামিল বলেই মনে করছে বিদগ্ধ সাংবাদিক সমাজ।

একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের এবং তাদের স্বার্থরক্ষায় আইন প্রণয়ন হচ্ছে। এসব কারণে আজ আমরা উদ্বিগ্ন, নিরাপত্তাহীন ও আতঙ্কগ্রস্ত। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এক রকম শৃঙ্খলিত। তা হলে কী আর কোনো দিন সত্য প্রকাশে সাধারণ-নিরীহ, নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের হয়ে কলম ধরতে পারব না।

আর এ সত্যটি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে শুরু করেছি, যখন আমাদের প্রিয় সর্বজন শ্রদ্ধেয় সম্পাদক সমাজ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদী মানববন্ধনে মিলিত হলেন। এখানে তো ডান-বাম কিংবা কোনো দলমতের বিষয় নেই। বিষয় একটিই, আর সেটি হচ্ছে- নির্ভীকভাবে সত্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।

তবে কেন ওয়ান-ইলেভেন এবং এর পরবর্তী সময়েও মিডিয়ার ‘বেনিফিশিয়ারি’ হয়ে কেন সরকার আজ মিডিয়া, সাংবাদিক সমাজ এবং সত্য প্রকাশের পরিপন্থী এসব কালাকানুন প্রণয়ন করছে তা ভাবলে অবাক লাগে বৈকি।

কার বা কাদের ইশারায় দেশবরেণ্য এবং সমাজের বিবেক হিসেবে সম্পাদক সমাজ ও সাংবাদিকদের তীব্র বিরোধিতা উপেক্ষা করে আজ সরকার এ হেন আত্মঘাতী সব আইন প্রণয়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে তা জানতে খুব ইচ্ছে করে। মাথাব্যথায় মাথা কেটে ফেলার পরামর্শদাতা কে এই ডাক্তার?

আমরা জানি, ইতিহাসের চরম শিক্ষা হল- ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। ক্ষমতার মোহে অন্ধরা ইতিহাসকে দৈত্য ভেবে বোতলবন্দি করে রাখতেই পছন্দ করে। কিন্তু ইতিহাসরূপী দৈত্যরা একদিন বেরিয়ে এসে সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়।

এর জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে- পালাবদলের পথ ধরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর বিচার রোধে প্রণীত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ এবং একুশে আগস্টের ঘৃণীত গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার বর্বরোচিত ঘটনার বিচার বন্ধের নামে প্রহসনের দৈত্যরা বেরিয়ে এসে সেসব দুঃস্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সুতরাং- সাধু সাবধান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *