লক্ষ্মীসরা পটের শিল্পী প্রতিমা পাল

  বৈচিত্র ডেস্ক : মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের কুমার পল্লীতে প্রায় চারশ’ বছর ধরে পটের ছবি আঁকা হয়।

এ ধারা চলে আসছে বংশপরম্পরায়। এ গ্রামেরই গৃহবধূ প্রতিমা পাল। একমনে লক্ষ্মীসরায় রং-তুলির আঁচড়ে নকশা করছিলেন।

ভোর ৫টা থেকেই শুরু হয় প্রতিমা পালের লক্ষ্মীসরায় নকশা করার কাজ। রাত ১২টা পর্যন্ত লক্ষ্মীসরায় নকশা আঁকেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে প্রতিমা পাল বলেন, দুর্গাপূজার পরপরই লক্ষ্মীপূজা। ভাদ্র-আশ্বিন দু’মাস লক্ষ্মীসরাচিত্র তৈরি করার সময়। এ সময়টা লক্ষ্মীসরার চাহিদার কারণে এ দুই মাস রাত-দিন পরিবারের সবাইকে লক্ষ্মীসরার পটে ছবি আঁকতে হয়।

এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পট বিক্রেতারা বায়না করেন। কখনও কখনও তিন-চারদিনের মধ্যে লক্ষ্মীসরা তৈরি করে দিতে হয়। মাদারীপুর-গোপালগঞ্জ জেলার আশপাশ এলাকা থেকেই সাধারণত অর্ডারগুলো পাই। বাবা যোগেন্দ্রপাল ক্ষেত থেকে মাটি কেটে আনেন। লক্ষ্মীসরার মাটি তৈরি করার পাশাপাশি সংসারের অন্যান্য কাজ করেন মা পূর্ণিমা পাল।

মাটি তৈরি করে লক্ষ্মীসরার আকার দেন। লক্ষ্মীসরা পোড়ানো কাজটি করেন মা। আমি আর আমার ছোট বোন চম্পা লক্ষ্মীসরা তৈরি করি, বাবা ফাইনাল টাচ দিয়ে দেন। পট রং করার জন্য সাদা অক্সাইড পাউডারের সঙ্গে বিরজা মিশিয়ে গ্রাউন্ড তৈরি করি। তার ওপর একটু কালো ও হালকা নীল রং গ্রাউন্ড করি। এর ওপর হলুদ রং দিয়ে লক্ষ্মীর চরিত্রগুলো তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলি। এরপর বার্নিশ কোট দিই ।

রঙের বৈচিত্র্য সম্পর্কে প্রতিমা পাল জানান, তার দাদাঠাকুর অসীম পাল বিভিন্ন গাছের কষ দিয়ে রং তৈরি করতেন। ইটের গুঁড়া, হলুদ পুঁইশাকের বীজের কষ থেকে রং নিয়ে বাদি গাছের আঠা, তেঁতুলের বীজের কষ মিশিয়ে রং তৈরি করতেন। আমরাও কিছু কিছু ব্যবহার করি।

আমার দাদা ঠাকুর অসীম পাল তাঁতিহাটির সেরা প্রতিমা শিল্পী। তার কাছে খালিয়ার আদি প্রতিমা মিলবে। এ খালিয়ার দুর্গার পট ও লক্ষ্মীর পট একমাত্র তার দাদাই আঁকেন। তিনি এখনও নিজের তৈরি রং ব্যবহার করেন প্রতিমার গায়ে। আমরা ছাগলের পশম দিয়ে তুলি তৈরি করি। ছাগলের পশমের তুলির কাজ খুব সূক্ষ্ম। দেখতে খুব ভালো লাগে।

প্রতিমা পালরা সাত বোন এক ভাই। পাঁচ বোনের বিয়ে হয়েছে। তিনি আর তার ছোট বোন চম্পা অবিবাহিত। দুর্গার পট কম বিক্রি হয়। তার দাদার আঁকা দুর্গার পট ঢাকার শিল্পী-সাহিত্যিকরা কিনে সংগ্রহ করেন।

পূজার সময় কাজের চাপ থাকলেও বাকি সময়টা তাদের বেকার থাকতে হয়। পূজায় ভাইয়ের বউও তাদের সঙ্গে রাত-দিন কাজ করেন। তাদের পাল বাড়িতে তিনটি পরিবার লক্ষ্মীসরা পটে ছবি আঁকেন। আঁকা লক্ষ্মীসরা যত চলে, ডাইসে করা সরা ততটা চলে না। তবু চাহিদার কারণে কিছু কিছু লক্ষ্মীসরা তারা তৈরি করেন।

তাদের তৈরি লক্ষ্মীসরা চিত্র পাওয়া যায় টেকেরহাট, রাজৈর, মাদারীপুর, ভাঙ্গা ফরিদপুর, শিবচর, কবিরাজপুর, কালকিনি, মুকসুদপুর কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী, ঘাঘর, গোপালগঞ্জ প্রভৃতি এলাকার হাট বাজারে। দুর্গাপূজার পরপরই এসব এলাকার হাটে বাজারে পাওয়া যাবে লক্ষ্মীসরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *