গভীর সমুদ্রবন্দরে বদলে যাবে মহেশখালী

বৈচিত্র ডেস্ক :  মহেশখালীর মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা আনার জন্য যে বন্দরটি নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে ৮০ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার জাহাজও ভিড়তে পারবে। ৫৯ ফুট গভীর এই বন্দর যাতে বহুমুখী কাজে ব্যবহার করা যায়, সে লক্ষ্যেই এ বন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ২০২৩ সালের মধ্যে এ সমুদ্রবন্দরের নির্মাণকাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পের অধীনে দুটি টার্মিনালও নির্মাণ করা হবে। টার্মিনাল দুটিতে প্রায় ১৬ মিটার ড্রাফট-সংবলিত ২৫০ মিটারের জাহাজ ভিড়তে পারবে। যেসব মাদার ভেসেল চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে আসতে পারে না, সেসব বড় আকারের জাহাজও এ বন্দরে ভিড়তে পারবে। জাপান সরকারের অর্থায়নে এ বন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি পরিচালনা ও তত্ত্বাবধানে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সেই সঙ্গে বন্দরের অর্থায়নে নির্মাণ করা হবে ১০০ মিটার দীর্ঘ জেটি। জাপানের কাশিমা ও নিগাতা বন্দরের আদলে গড়ে তোলা হবে এ সমুদ্রবন্দর।

বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি ও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে একটি গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রয়োজনীয়তা অনেক দিন ধরেই দেখা দিয়েছে। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আমদানি করা কয়লানির্ভর হওয়ায় কয়লা আনার জন্য এ বন্দর করা হচ্ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। জাপানের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে এই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে কয়লা পরিবহন ছাড়াও এ বন্দরকে বহুমুখী কাজে ব্যবহার করা হবে। মাতারবাড়ী প্রকল্প পরিদর্শনে গিয়ে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘মাতারবাড়ীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের আওতায় নির্মিত বন্দরটি পরবর্তী সময়ে গভীর সমুদ্রবন্দরে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে মহেশখালীর ছয়টি মৌজায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর, এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করে বিশেষ অথনৈতিক অঞ্চল ও নগর গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।’ চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম বলেন, ‘মাতারবাড়ীর এ বন্দর চালু হলে একদিকে দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানি পণ্যের হ্যান্ডলিং বাড়বে, অন্যদিকে চাপ কমবে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর।’ বন্দর বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা ২০১৬ সালে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে, যাতে মাতারবাড়ীতে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দরের সম্ভাবনার কথা বলা হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানি এবং জাহাজ থেকে কয়লা খালাসের জন্য ১৬ মিটার গভীর ও ২৫০ মিটার চওড়া যে চ্যানেল ও টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। একই চ্যানেল ব্যবহার করে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ চ্যানেলের ওপর নির্ভর করেই গড়ে তোলা হবে গভীর সমুদ্রবন্দর। এতে নতুন করে কোনো চ্যানেল করতে হবে না। বর্তমানে বাংলাদেশে যেসব সমুদ্রবন্দর রয়েছে, এর কোনোটাই গভীর সমুদ্রবন্দর নয়। ফলে বেশি গভীরতার জাহাজ এসব বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না। তাই একটি গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ বন্দরে প্রাথমিক অবস্থায় দুটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এতে ৩২০ থেকে ৩৫০ মিটার দীর্ঘ এবং ১৬ মিটার গভীরতার ৮ হাজার টিইইউএস কনটেইনারবাহী জাহাজ ভিড়তে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ১৯০ মিটার দীর্ঘ এবং ৯ দশমিক ৫ মিটার গভীরতার চেয়ে বড় জাহাজ প্রবেশ করতে পারে না। মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরে প্রতিটি জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা যাবে। এ বন্দর সমুদ্রের কিনারায় না হলেও চ্যানেল নির্মাণের মাধ্যমে বন্দরকে সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। চ্যানেলে যাতে পলি জমতে না পারে সে জন্য ব্রেক ওয়াটার নির্মাণের মাধ্যমে পানির প্রবাহ রোধ করা হবে। মাতারবাড়ী থেকে সড়ক ও রেলপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহনের জন্য সড়ক ও রেল অবকাঠামো গড়ে তুলতে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক পরিকল্পনা। বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের সামনে এখন বাস্তবায়নাধীন রয়েছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি), লালদিয়া ও বে-টার্মিনাল প্রকল্প। এগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হলে আমাদের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। তখন ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের (টিইইউএস) ৭০ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে পারব। এ মুহূর্তে আমাদের মাত্র ২০ লাখ কনটেইনারের সামান্য বেশি হ্যান্ডলিং সম্ভব হচ্ছে। প্রবৃদ্ধির মাত্রানুসারে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে আমাদের মাতারবাড়ী ও পায়রা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *