সবচেয়ে বড় কৃষিযন্ত্র প্রদর্শনী

শাইখ সিরাজ : পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ গণচীনের মধ্যাঞ্চলের জনবহুল শহর উহান। বিপুল জনগোষ্ঠীর চীনে এখন আর একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের জটলা চোখে পড়ে না। হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানও দৃশ্যত চুপচাপ ও শান্ত একটি শহর। আমার মনে হয়, শুধু অক্টোবরেই এ শহর জমে ওঠে অনন্য এক আয়োজনে। সে আয়োজনটি হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কৃষি যন্ত্রপাতির প্রদর্শনী। গেল সপ্তাহেই ঘুরে এলাম চীনের প্রাচীন শহর উহানে আয়োজিত কৃষি যন্ত্রপাতির প্রদর্শনী থেকে। গত বছরও এ মেলায় যোগ দিয়েছিলাম। এ মেলায় যাওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে কোন প্রযুক্তিগুলো বাংলাদেশের কৃষি খাতে কার্যকর হতে পারে সে সম্পর্কে ধারণা নেওয়া। বিশাল সাড়ম্বরপূর্ণ মেলাটি আয়োজন করা হয়েছে উহানের আন্তর্জাতিক কনভেনশন এক্সপো সেন্টারে। ২ লাখ ২০ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিশাল কৃষিযন্ত্রের প্রদর্শনীতে এবার অংশ নিয়েছে ৩০টি দেশ। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, গতবারের প্রদর্শনী নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার করেছিলাম চ্যানেল আইয়ের ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে। সেবার অংশ নিয়েছিল ৬০টি দেশ। হিসেবে এবার দেশের সংখ্যা কমলেও বেড়েছে প্যাভিলিয়নের সংখ্যা। সেইসঙ্গে বেড়েছে বৈচিত্র্যও।

চায়না এগ্রিকালচার এগ্রো মেশিনারিজ অ্যাসোসিয়েশন, চায়না এগ্রিকালচারাল ম্যাকানাইজেশন অ্যাসোসিয়েশন ও চায়না এগ্রিকালচার মেশিনারিজ ডিস্ট্রিবিউশন অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে ২৬ থেকে ২৮ অক্টোবর তিন দিনের এ মেলার আয়োজন করে। এবারের মেলার থিম ছিল ‘সমন্বিত ও স্বয়ংসম্পন্ন কৃষিযন্ত্রের মাধ্যমে গ্রামীণ কৃষি জীবন ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করা’। উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা অন্যবারের মতোই ছিল সাড়ম্বরপূর্ণ। চীনের কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক সমিতির প্রেসিডেন্ট ড. চেন ঝির পরিচালনায় চীনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধিদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় সারা বিশ্বের গণমাধ্যমের সামনে। সেখানে উপস্থিত চায়না এগ্রিকালচারাল ম্যাকানাইজেশন অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট লিউ জিয়ানের সঙ্গে কথা বলি ব্যক্তিগতভাবে। জানতে চাই বিশাল এ মেলা থেকে তাদের প্রত্যাশাটা কী? লিউ জিয়ান জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে কৃষির প্রকৃতিও। আর বিশাল জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তার তাগিদ থেকেই জোর দিতে হচ্ছে বেশি উৎপাদনের প্রতি। কম সময়ে অধিক উৎপাদন যেমন লক্ষ্য তেমনভাবেই কম লোকবল প্রয়োগ করে সীমিত ভূমি থেকে বেশি উৎপাদন করতে যান্ত্রিক কৃষির বিকল্প নেই। আর বৈশ্বিক কৃষিযন্ত্রের সঙ্গে কৃষক ও কৃষিবাণিজ্যে জড়িতদের পরিচয় করিয়ে দিতেই এ মেলার আয়োজন।

প্রদর্শনী উপলক্ষে গতবারের মতোই এবারও ছিল তিন দিনব্যাপী বিভিন্ন বিষয়ে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম। গণচীনের বিভিন্ন পর্যায়ের গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেন তাদের গবেষণাপত্র। সেমিনারে অংশ নেন বিভিন্ন দেশের কৃষিযন্ত্র ব্যবসায়ী, বিজ্ঞানী, সম্প্রসারণকর্মী, গবেষক, উদ্যোক্তা ও গণমাধ্যমকর্মী। বিশেষ করে ছিল কৃষি যন্ত্রপাতি শিল্পের বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক সমীক্ষা পর্যবেক্ষণ। এ ছাড়া ছিল সাতটি আন্তর্জাতিক সেমিনার, ১০টি থিমেটিক মিটিং, সরেজমিন প্রদর্শনী, কৃষি রোবট প্রতিযোগিতা। এ বিশাল আয়োজনে গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগসূত্রের দায়িত্বে ছিলেন চীনের কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ক্যামডার ডেপুটি সেক্রেটারি রু উই। তিনি বলেন, এ বিশাল আয়োজন করতে গিয়ে চীনের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ করতে হয়েছে। প্রত্যেকের আন্তরিক সহযোগিতার ফসলই এ মেলা। আয়োজক হিসেবে অংশগ্রহণকারী সদস্যদের সবকিছুই তদারকি করার দায়িত্ব আমাদের। আমরা চেষ্টা করেছি সেটাকে সফল করে তুলতে। চেষ্টার কমতি না থাকলেও ত্রুটি যে একেবারে ছিল না, তা বলব না। তবে এ থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েছি। পরবর্তী বছর আরও সফলভাবে এ আয়োজন করতে পারব বলে আমার বিশ্বাস।

মেলাপ্রাঙ্গণের বিশাল ক্ষেত্রে টানা কয়েক মাসের প্রস্তুতি শেষে তিন দিনের প্রদর্শনী। শত শত নয়, বলা ভালো হাজার হাজার কৃষিযন্ত্রের পসরা। এবার অন্যবারের চেয়ে কৃষিযন্ত্রের আকার ও গঠনে এসেছে নতুন বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা। কৃষির যান্ত্রিকীকরণ নিয়ে বিশ্বের সর্বশেষ গবেষণা ও চিন্তাভাবনা আলোচিত হয়েছে এখানে। যার যার উদ্ভাবন ও গবেষণা উপস্থাপনেও আগতরা ছিলেন দারুণ উৎসাহী। কৃষি শিল্পায়নে প্রয়োজনীয় বিশালাকারের যন্ত্রপাতির পাশাপাশি ছিল ক্ষুদ্র আকারে কৃষির জন্য নানা উপকরণ। কথা হয় লিউ জিয়াংলি নামের এক উদ্যোক্তার সঙ্গে। তিনি ক্ষুদ্র কৃষকের কথা চিন্তা করে নির্মাণ করেছেন ছোট্ট ধান বোনার মেশিন।  কৃষিযন্ত্রের বিশাল প্রদর্শনীটিতে ছিল ১৫ ধরনের ট্রাক্টর, একেবারে অত্যাধুনিক আকার ও কার্যক্ষমতাসম্পন্ন ফসল তোলার যন্ত্র, জমি চাষের যন্ত্র, রোপণ ও বপন যন্ত্র, সেচ ও নালা তৈরির যন্ত্রপাতি, উদ্ভিদ ও ফসল সুরক্ষার যন্ত্রপাতি। পৃথিবীর ৩০টি দেশ থেকে এ মেলায় অংশগ্রহণ যেমন ছিল, ছিল ভরপুর দর্শনার্থী। এবারের মেলায় বিশেষভাবে প্রদর্শন করা হয় কৃষিযন্ত্রের অগ্রগতি। জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানাবিধ বিষয় মাথায় রেখে কৃষিকে আরও বেশি দক্ষতাসম্পন্ন, অল্পব্যয়নির্ভর ও ফলনশীল করার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যন্ত্র এবং স্মার্ট প্রযুক্তির সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে পুরোপুরি বৈদ্যুতিক ট্রাক্টর, কোনো চালক ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফলের বাগানে কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় স্প্রে করার জন্য বিভিন্ন আকারের যন্ত্র, ড্রোনের মাধ্যমে পানি, কীটনাশক বা উদ্ভিদের প্রয়োজীয় পুষ্টি ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাসহ এবারের মেলায় এমন কিছু যন্ত্র এসেছে যেগুলো এর আগে দেখা যায়নি। প্রতি বছরই কৃষিযন্ত্রের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য চলছে নানামুখী প্রয়াস। এবার এ মেলায় আনুমানিক পেশাদার দর্শক ছিল ১ লাখ ২০ হাজার। এর মধ্যে বাংলাদেশের স্বমানধন্য কয়েকটি কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছি। তারা এ মেলায় ঘুরে আমাদের দেশের বাস্তবতায় কতটুকু আছে তার কতটুকু প্রয়োজন তা নিরূপণ করেছেন নিখুঁতভাবে। আলিম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের আলিমুস সাদাত বলেন, চীন থেকে পুরো মেশিন আমদানি করে বিক্রি করলে ভ্যাট-ট্যাক্সসহ যে মূল্য হয়, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে গিয়ে তা যদি স্থানীয়ভাবে নির্মাণ করা যেত তবে সে মূল্য নেমে আসত অর্ধেকে। এতে সাধারণ কৃষকের হাতের নাগালে চলে আসত কৃষি যন্ত্রপাতি। কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারক ও পরিবেশক গোষ্ঠী ও সরকারের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি।

মেলায় আমাদের দেশের উপযোগী কৃষিযন্ত্রের দিকেই দৃষ্টি ছিল দেশীয় কোম্পানির প্রতিনিধিদের। মেসার্স কামাল মেশিন টুলসের মহাব্যবস্থাপক মো. শাব্বির আহমেদ দেখালেন আলু তোলার একটি যন্ত্র। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, এ যন্ত্র জটিল কিছু নয়। দেশীয় প্রযুক্তিতেও এটা নির্মাণ করা সম্ভব। সবচেয়ে আশার কথা হচ্ছে, আমাদের দেশেও এখন তৈরি হচ্ছে এসব যন্ত্র। তবে আমাদের দেশের কোম্পানিগুলো অনেক ক্ষেত্রেই চায় সরকারের আন্তরিক সহায়তা। কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এখন অবশ্যম্ভাবী। যারা এ যান্ত্রিকীকরণের সর্বোচ্চ সুফল গ্রহণ করতে পারছে সত্যিকার অর্থেই তারা অনেক বেশি লাভবান। এবার আসা যাক যন্ত্রের উৎকর্ষের দিকে। প্রদর্শনীতে কিছু যন্ত্র এসেছে যেগুলো ড্রোনের মাধ্যমে চালিত হচ্ছে। গতবার আমরা দেখেছি, ড্রোন কীভাবে ফসলের খেতে সার ও কীটনাশক প্রয়োগের উপযোগিতা ও স্থান নির্ণয় করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসছে এবং পরে আবার সার বা কীটনাশক প্রয়োগ করছে। এবার দেখছি ড্রোন আরও স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠেছে। তার মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে বিশাল স্প্রে যন্ত্র। প্রদর্শনীর কোনো কোনো কক্ষে ঢুকে রীতিমতো অবাক হতে হয়েছে শব্দ আর ছবির মহাযজ্ঞ দেখে। কৃষিযন্ত্রকে বিজ্ঞাপিত করার রুচিশীল ও ব্যয়বহুল আয়োজন দেখে বেশ ভালোও লাগে।

প্রতিনিয়তই কৃষিযন্ত্র নিয়ে চলছে নানামুখী গবেষণা। বাড়ছে যন্ত্রের উৎকর্ষ। যন্ত্রের কৃত্রিম বুুদ্ধিমত্তা বাড়ানোর জন্য চলছে নানামুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষা। মানুষ তার বুদ্ধিমত্তার জায়গাটি যেন দান করছে যন্ত্রকে। আর যন্ত্র হয়ে উঠছে দক্ষতাসম্পন্ন। কৃষির বহুমুখী উন্নয়নের জন্য যন্ত্রের এ অভিযান সত্যিই ইতিবাচক। উন্নত দেশগুলো যন্ত্রের ব্যবহার ছাড়া কৃষিকাজের কথা ভাবতেও পারে না। এ ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল কিংবা অনুন্নত দেশগুলো পিছিয়ে আছে নানা কারণে। বিশাল এ প্রদর্শনীর অংশগ্রহণকারীদের কাছে বাংলাদেশ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভোক্তা। আমাদের দেশের বহুমুখী কৃষি-সাফল্য বিশ্ববাসীর কাছে এক বিস্ময়। এ সাফল্যের সঙ্গে নতুন নতুন কৃষিযন্ত্রের যোগসূত্র অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে এশিয়ার বৃহৎ এই কৃষিযন্ত্রের প্রদর্শনী ও আন্তর্জাতিক সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে বাংলাদেশের আরও সরব উপস্থিতি প্রয়োজন। জাপান, ভারত, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কারিগরি ক্ষেত্রগুলোর মতোই আমাদের কৃষি অগ্রগতি, অনুশীলন, সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তাগুলো সামনে আসতে পারে। যান্ত্রিক কৃষির বহুমুখী বিকাশের দৌড়ে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাক, সেই সঙ্গে সাধারণ ও স্বল্প আয়ের কৃষকও যেন একেকটি যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ নিতে পারে সে দিকটিও বিশেষভাবে বিবেচনা করা হোক এই প্রত্যাশা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *