তাজহাট জমিদার বাড়ি, এক অনন্য কীর্তি

বৈচিত্র ডেস্ক :  রংপুর মহানগরীর  দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত তাজহাট জমিদার বাড়ি। রংপুর মূল শহর থেকে তাজহাটের দুরত্ব তিন কিলোমিটার। ইতিহাস আর ঐতিহ্যে ঘেরা তাজহাটে রয়েছে প্রাচীন সব নিদর্শন আর পোড়ামাটির ফলক। রয়েছে জাদুঘরও।

রংপুর মেডিকেল মোড় কিংবা মডার্ণ মোড়সহ রংপুরের যেকোনো জায়গা থেকেই ছোট কিংবা বড় সবধরনের যানবাহন নিয়ে যাওয়া যাবে তাজহাটে।রংপুর জেলার তাজহাট, ডিমলা, কাকিনা, মহুনা, বর্ধনকাট, পীরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বেশ বিছু বিখ্যাত জমিদার বংশ ছিল। তৎকালীন জমিদারদের নির্মিত প্রসাদগুলোর মধ্যে জমিদার বাড়ি একটি। জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা মান্না লাল রায় পাঞ্জাব থেকে রংপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। রংপুরের মাহিগঞ্জে তিনিই প্রথম স্বর্ণের তৈরী আকষর্ণীয় তাজ বা রত্ন খচিত মুকুট তৈরী ও ক্রয়-বিক্রয়ের প্রচলন শুরু করেন।

ধারণা করা হয় এ ঘটনা থেকেই এ অঞ্চলের নাম রাখা হয় তাজহাট। মতান্তরে ১৯০৮ সালে জমিদার বংশের রাজা মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করেন।জমিদার বাড়ির বাহ্যিক আকর্ষণ সাদা মার্বেল পাথরে নির্মিত প্রাসাদটি।

পূর্বমুখী দোতলা প্রাসাদটির দৈঘ্য ৭৬.২০ মিটার। সাদা মার্বেল পাথরের তৈরী প্রাসাদটি ১৫.২৪ মিটার প্রশন্ত। প্রাসাদের কেন্দ্রীয়সিড়িটি উপরের তলা পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রাসাদের মাঝামাঝি আছে একটি বড় গম্বুজ। পূর্বে প্রাসাদের সিড়ির উভয় পাশে দোতলা পর্যন্ত ইটালীয় মার্বেল পাথরের দ্রুপদী রোমান দেবদেবীর মূর্তি দ্বারা সজ্জিত ছিল।

বর্তমানে সেসব দ্রুপদী মূর্তি প্রাসাদের ভেতরের জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে এবং সিড়ির উভয় পাশে নতুনভাবে সংস্কার করা হয়েছে। প্রাসাদের সম্মুখভাগে দুপ্রান্ত বিশিষ্ট আটকানো বারান্দা এবং মধ্যভাগে ৯.১৪ মিটারের একটি বারান্দা আছে। বারান্দাগুলো থেকে প্রাসাদের সম্মুখ অংশের সৌন্দর্য খুব ভালোভাবে উপভোগ করা যায়।বারান্দাগুলোর উপরে আছে চারটি স্তম্ভ, যার উপরে রয়েছে দুটি ত্রিকোনাকৃতি কক্ষ। উপর থেকে দেখলে প্রাসাদটিকে অনেকটা ইংরেজি বর্ণ ইউ এর মত দেখায়।

প্রাসাদটির নিচ তলায় রয়েছে হলঘর। প্রাসাদের ভেতরের পুরো ভাগ জুড়েই আছে ৩ মিটার প্রশস্ত বারান্দা। এছাড়াও উপরের তলায় ওঠার জন্য দুটি কাঠের তৈরী সিড়িও আছে। একটি সিড়ি উত্তরে এবং অন্যটি রয়েছে দক্ষিণ কোণে। এ প্রাসাদে ছোট বড় মোট ২২ টি কক্ষ আছে।প্রাসাদের ভেতরে আছে জাদুঘর। জাদুঘরে আছে প্রাচীন দ্রুপদী মূর্তি। এসব মূর্তি পোড়ামাটিরতৈরী।

ধারণা করা হয়, বিংশ শতকের শুরুর দিকে প্রাসাদটির স্থপতি মহারাজা কুমার গোপাল লাল রায় যখন প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন, তখন এসব মূর্তি প্রসাদের গায়েসুসজ্জিতকরণের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। এছাড়াও জাদুঘরে রয়েছে বিংশ শতাব্দির পুরোনো সংস্কৃত ভাষার কিছু পান্ডুলিপি। আছে তৎকালীন সময়ের পিতল ও কাসার তৈরী জিনিসপত্র। আরো আছে জমিদার বংশের রাজা রতন লাল, গিরিধারী লাল, উপেন্দ্রলাল এবং মহারাজা গোপাল রায়ের ঐতিহাসিক কাহিনীর পান্ডুলিপি। জাদুঘরের প্রধান আকর্ষণ তৎকালীন রাজা-রানীর ব্যবহৃত কিছু আসবাব এবং তলোয়ার।

এছাড়াও আছে প্রাচীন নানা নিদর্শন।প্রাসাদের সম্মুখভাগে রয়েছে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। পাহারাদারদের মত দাড়িয়ে থাকা নারকেল গাছ, পুকুর এবং নানা ধরনের ফুলের বাগান প্রাসাদের সৌন্দর্যকে আরো দিগুণ করে তুলেছে। পুকুরের পাশে আছে বিশ্রাম নেবার জন্য বেশ কিছু ছোট বড় বসার স্থান।

পুকুরে রয়েছে শাপলা ফুলের আবাস। সবমিলিয়ে জমিদার বাড়িতে গেলে মনে হবে রাজা-রানীর আবাসস্থলের প্রাচীন আবহ। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত প্রাসাদটি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বেঞ্চ হিসেবেব্যবহার করা হয়। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ প্রতত্ত¡ অধিদপ্তর প্রাসাদটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তিহিসেবে ঘোষণা করলে সেসময় থেকে প্রাসাদটি রক্ষণের কাজ শুরু হয়।

এরপর ২০০২ সালে প্রাসাদের কিছু অংশে জাদুঘর তৈরীর প্রস্তাবনা পাশ হয় এবং ২০০৫ সালে তা বাস্তবায়ন করা হয়। তবে সংস্কার এবং সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে রংপুর তাজহাট জমিদার বাড়ি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দর্শণীয় স্থান বলে মনে করেন জাদুঘর কর্তৃপক্ষ।

কারমাইকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্র কবি ,ইতিহাসবিদ জাকির হোসেন বলেন, তাজহাট জমিদার বাড়ি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। বর্তমান প্রজন্ম ইতিহাস বিমুখ এবং প্রযুক্তি নির্ভর।

লেখক ও ইতিহাসবিদ ডাক্তার মতিউর রহমান বসনিয়া বলেন, সরকার যদি জমিদার বাড়িকে আকর্ষণীয় ও ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান করবার উদ্যোগ গ্রহণ করেন তাহলে একদিকে যেমন সরকারের পর্যটন খাত লাভবান হবে তেমনি বর্তমান প্রজন্ম ঘোরাঘুরিকিংবা অবসর উদযাপনের ছলে এখানে এসে অতীত ইতিহাস সম্পর্কে জানবে এবং নিজেকে সমৃদ্ধ করবার সুযোগ পাবে।প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে পুকুর, বাগান, প্রাসাদ পর্যন্ত জমিদার বাড়ির প্রত্যেক পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন আবহ আর ইতিহাসের ছোঁয়া।
তাজহাট জমিদার বাড়ির কাষ্টডিয়ন হাসিবুল হাসান সুমি বলেন, প্রত্নঅধিদপ্তরের অধিনে।

বর্তমানে ১৩ জন কর্মকর্তা রয়েছে। রোববার সাপ্তাহিক ছুটি। সোমবার আধাবেলা খোলা থাকে । মাধ্যমিকের উর্ধ্বে ছেলে মেয়ে সকলের  জন্য প্রবেশ মূল্য ২০টাকা । এর নিচে প্রত্যেকের ৫টাকা প্রবেশ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ছুটির দিনে অবসর উদযাপন করতে তাই নিজের সঙ্গী, বন্ধু এমনকি শিশু-কিশোর ও তরুণদের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে পারেন। তাদের নিয়ে একবার ঘুরেই আসতে পারেন মহারাজা গোপাল রায়ের প্রাসাদে যা আজকে তাজহাট জমিদার বাড়ি নামে পরিচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *