সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার থাকতে হবে

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : মানতেই হবে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের আমলে নানা ক্ষেত্রে উন্নয়ন হয়েছে। জীবনযাত্রার মান বেড়েছে এ দেশের বড়সংখ্যক মানুষের।

কিন্তু ঘুষ, দুর্নীতি, সরকারি ও সরকার সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও অন্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধা প্রদানে ভারসাম্যহীনতা, দলীয় সন্ত্রাস, সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা, উৎকট দলীয়করণ নীতি মানুষের স্বস্তির অনেকটা অংশ কেড়ে নিয়েছে।

এ সবই হয়েছে, হচ্ছে সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি বলে এবং রাজনৈতিক সুবিধা লাভের অভিপ্রায়ে। নির্বাচন সমাগত। এবার সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার রয়েছে সরকারের এবং সরকারি দলের।

নিরপেক্ষ একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বিশ্বের নানা গণতান্ত্রিক দেশের চাপও আছে সরকারের ওপর। সরকার তাই নির্বাচন নিয়ে একটু বেশি তৎপর।

এর মধ্যে আমাদের জটিল রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে সরকার পক্ষ সহজেই বিরোধী দল ও জোটের সংলাপের প্রস্তাব মেনে নিয়েছে। সংলাপও চলছে। সংলাপ শেষ পর্যন্ত কী ফলাফল আনবে এক্ষুনি বলা যাচ্ছে না। তবে রাজনৈতিক অচলায়তন যে কিছুটা হলেও ভেঙেছে এটি বড় কথা।

সরকারের বাইরে যে দলগুলো আছে এদের অনেকেই ঐক্যফ্রন্ট, যুক্তফ্রন্ট নানা নামে নির্বাচনী জোট তৈরি করছে। স্বাভাবিকভাবেই সরকারপক্ষও এখানে নানা কৌশল ব্যবহার করে নির্বাচনী পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে আনার চেষ্টা করবে।

তবে আমরা মনে করি সরকারি দলের এ নির্বাচনে সবচেয়ে নির্ভার থাকার কথা। এরপরও তাদের যেন দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। ২০১৪-এর নির্বাচনের পর থেকে প্রধান বিরোধী পক্ষ বিএনপির ছন্নছাড়া দশা। এর মধ্যে দুর্নীতির দায়ে বেগম জিয়ার জেল হয়ে গেছে।

দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ফেরারি। এখন বিএনপির সংবিধান অনুযায়ী মা-ছেলের দলের সাধারণ সদস্যপদও নেই। এদের পদ রাখার জন্য বিএনপি নেতারা পেছনের তারিখে দলীয় গঠনতন্ত্র সংশোধনের কথা জানিয়ে হাইকোর্টে আর্জি পেশ করেছিলেন।

হাইকোর্ট তা গ্রহণ করেননি। ফলে দৃশ্যত বিএনপির প্রধান এ দুই নেতার সদস্যপদটুকু নেই। এ দেশের পারিবারিক রাজনীতির বলয়বৃত্তে বিএনপি নেতারা সাবালক হয়ে কতক্ষণ দল চালাতে পারবেন সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি তো সরকারের সংস্পর্শেই আছে। এখান থেকেও সংকট তৈরির আশঙ্কা নেই। ইসলামী দলগুলোর শক্তিও এখন আর সরকারের প্রতি বৈরী নয়। যৌক্তিক-কম যৌক্তিক হলেও বিশাল একাডেমিক সুবিধা দিয়ে কওমি মাদ্রাসার বড় ভোটশক্তিকে দৃশ্যত হাতে আনতে পেরেছে সরকারপক্ষ।

তারপরও সরকারি দল আওয়ামী লীগ তেমন নিশ্চিন্ত থাকতে পারছে না। অথচ সরকার দৃশ্যমান অনেক উন্নয়ন করেছে। মানুষ অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বাচ্ছন্দ্যে আছে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

তবুও অস্বস্তি কাটছে না। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে এতগুলো বছরেও সরকার তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। সুশাসনের অভাব মানুষের মধ্যে তীব্র কশাঘাত করছে। এ চ্যালেঞ্জটিই সরকারকে নির্বাচনের আগে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।

অতীতেও দেখা গেছে, উন্নয়ন দেখিয়ে ভোটারের মনোরঞ্জন যতটা করা যায়- দুর্নীতিবাজ-সন্ত্রাসীদের দাপটে বিপর্যস্ত মানুষ তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষুব্ধ হয়।

স্বাধীনতার পর প্রায় পাঁচটি দশক এর মধ্যে অতিক্রম করে ফেলেছি। অথচ আমাদের ক্ষমতার রাজনীতি কোনো পর্বেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতে পারেনি। ফলে সব দলই গণতন্ত্র চর্চার বদলে দলবৃত্তে আটকে পড়েছে।

তাই দুর্নীতিগ্রস্ততা থেকে দল, সরকার, প্রশাসন কোনো কিছুকে মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এসবের কারণে সম্ভব হয়নি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। অথচ এ দেশের হাজার বছরের ইতিহাস বলে প্রাচীন ও মধ্যযুগ পর্বের অধিকাংশ রাজবংশের শাসকরা জনগণের কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন। সে কারণে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়েছিল।

গুপ্ত শাসনামল থেকে এ দেশে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইতিহাসের শুরু। পরে পাল রাজাদের ৪০০ বছরের শাসন এনে দেয় জনজীবনে স্থিতিশীলতা। এ সময়কালে বাংলার রাজারা বিভিন্ন সময়ে তাদের বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ জারি করতেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জমি দান করতে রাজাজ্ঞা তামার পাতে লিখে প্রচার করতেন।

এসব তাম্রশাসন অধ্যয়ন করে সমকালের রাজ্য শাসনপদ্ধতি ও জনজীবনের সঙ্গে রাজাদের সম্পর্ক আঁচ করা সহজ। ধর্মবাণী প্রচার, বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের সময় শিলালিপি খোদাই করা হতো।

এসব লিপি উত্তরকালে ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। প্রাচীনকালের বাংলায় যৎসামান্য যা মুদ্রা পাওয়া গেছে তার ভেতর খোদিত সংকেত, লিপি, চিত্র থেকে সমকালীন ধর্ম ও সংস্কৃতিবোধের কিছুটা ধারণা লাভ করা যায়।

নগর সভ্যতা বিকাশের সূত্রে বাংলাদেশের প্রাচীন কালপর্বের সূচনা খ্রিস্টপূর্ব তিন শতকের দিকে। এ সময় উত্তর বাংলা ভারতের মৌর্য সম্রাট অশোকের ‘ভুক্তি’ বা প্রদেশে পরিণত হয়। এ প্রদেশের নাম হয় পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তি।

এ ভুক্তির রাজধানী পুণ্ড্রনগরের অবস্থান ছিল বর্তমান বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়ে। প্রত্নস্থলটির সর্ব নিুস্তরে পাওয়া প্রাচীনতম ব্রাহ্মী লিপি থেকে জানা যায় সে সময় ভারতীর মৌর্য সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ বা ভুক্তি ছিল উত্তর বাংলা। এ প্রদেশের নাম ছিল পুণ্ড্রবর্ধন। এ ভুক্তির রাজধানী ছিল আজকের মহাস্থানগড় আর তখনকার পুণ্ড্রনগর।

প্রাপ্ত ব্রাহ্মী লিপি থেকে জানা যায় এর কিছুকাল আগে জনসাধারণের ওপর প্রাকৃতিক বা অন্য কোনো দুর্যোগ নেমে এসেছিল। তাই মৌর্য সম্রাট অশোক পুণ্ড্রনগরের প্রশাসককে আদেশ দিয়েছিলেন তিনি যাতে দ্রুত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। তাদের মধ্যে খাদ্যশস্য ও কড়ি বিতরণ করেন। এতে বোঝা যায় রাষ্ট্রব্যবস্থা সুশাসনকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল।

৮ শতকের মাঝপর্ব থেকে প্রায় ৪০০ বছর বৌদ্ধ পাল রাজাদের অধীনে ছিল বাংলা। এ পর্বে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বাংলার সমৃদ্ধি ছিল চোখে পড়ার মতো। পাল রাজারা ধর্ম নির্বিশেষে সবার প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করেছিলেন। এ যুগপর্বে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে শিক্ষা, শিল্পকলা, সাহিত্য সব ক্ষেত্রে বাংলা উচ্চতায় পৌঁছতে পেরেছিল।

কিন্তু ছন্দপতন ঘটে এগারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে। পালদের কাছ থেকে সিংহাসন কেড়ে নেয় দক্ষিণ ভারত থেকে আসা ব্রাহ্মণ সেন রাজারা। বর্ণবৈষম্য ছড়িয়ে দিয়ে এ দেশের সাধারণ মানুষকে কোণঠাসা করে রাখতে চায়।

এ কারণে সেন শাসন যুগে সুশাসন সুদূর পরাহত ছিল। ফলে সমাজ বিক্ষোভ অশান্ত করে তোলে বাংলাকে। আর এর সুযোগ নিয়ে বহিরাগত মুসলমান শাসকরা বাংলার ক্ষমতা দখল করে।

তোরো শতকের শুরুতে মুসলমানরা রাজদণ্ডই শুধু গ্রহণ করেনি- এ দেশে ছড়িয়ে দিয়েছিল নতুন ধর্ম-সংস্কৃতি আর সমাজ জীবনের ধারণা। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত দেশীয় সংস্কৃতি এবং সামাজিক কাঠামোও অব্যাহত ছিল। মুসলমান শাসকরা মধ্যযুগব্যাপী বাংলার শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।

একই ধর্মগোষ্ঠী অথবা বলা চলে অভিন্ন সংস্কৃতির ধারক শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে রাজনৈতিক অবস্থার সঙ্গে এ দেশের সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক পরিবর্তনের ধারা সংযোজিত হয়।

এ সময় মুসলমান সুলতানদের সহযোগিতায় একদিকে তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অনুষঙ্গ হয়ে সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি নতুন ধারার বিকাশ ঘটে।

অপরদিকে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অমুসলিমদের প্রতি সহনশীল মনোভাব প্রকাশ করেন এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। এরই পথ ধরে বাংলায় সমাজ ও সংস্কৃতির অঙ্গনে আসে রূপান্তর।

মধ্যযুগে বাঙালির নতুনতর আত্মপরিচয় বাংলার সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রকে বিশেষায়িত করেছে। বাংলার স্বাধীন সুলতানি যুগের গুরুত্ব এ জন্য যে, এ পর্বের কর্মপ্রবাহ ও প্রতিভার পথ ধরে সেই সমকাল ও পরবর্তী যুগের রাজনৈতিক সংহতি, সমাজ সংগঠন, সাংস্কৃতিক কাঠামোর স্বকীয় চিত্রায়ন ও এর ক্রমউৎকর্ষ সাধন, অর্থনৈতিক বিকাশ সবকিছুই সম্ভব হয়েছিল।

মোগল যুগে বাংলা স্বাধীনতা হারালেও সুবেদাররা সুশাসনের নীতি পরিহার করেননি।

আধুনিক গণতন্ত্রের ধারণা না থাকলেও এসব যুগপর্বে শাসকদের আচরণ প্রায়োগিকভাবে গণতান্ত্রিক ছিল। এ যুগের মতো দলবাজ দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি না থাকায় রাজাদর্শেই ছিল সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। অথচ এ আধুনিক সময়ে এসে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অধরা হয়ে গেল সুশাসন।

আমাদের ধারণা এখনকার ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে যারা যুক্ত আছেন তারা মোটেও ক্ষমতার বাইরে থাকতে চান না। ফলে শক্তি ও কৌশল প্রয়োগ করে টিকে থাকতে চান বলে নিজেদের আত্মবিশ্বাস তলানিতে চলে যায়। সেই সঙ্গে গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় গণশক্তি নয়, পেশিশক্তির ওপর ভরসা বেড়ে যায়। এ বাস্তবতায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকে না।

সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে না বলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় দুর্নীতি। এভাবে দুর্নীতি আর অপশাসন শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে। বর্তমান রাজনীতির কাঠামোতে দলবৃত্তের বাইরে গিয়ে জনগণের দলে পরিণত হওয়া কঠিন।

এ কারণে বিএনপি শাসন আমলে বিভিন্ন নামের ‘দল’-এর অন্যায়কে যেমন ছাড় দিতে হয়েছিল, তেমনি এখন বিভিন্ন নামের ‘লীগ’-এর অন্যায় আর সন্ত্রাসকেও ছাড় দিতে হয়। দুর্নীতিবাজ নেতানেত্রীদের প্রশ্রয় দিতে হয়। প্রশাসনিক দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয় না।

দৃশ্যত প্রতিপক্ষ না থাকায় লাগাম ছাড়া হয়ে গেলে পরিণতি কী হতে পারে তা হয়তো নির্বাচন-পূর্ব আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাবিয়ে তুলছে। আমরা মনে করি, আওয়ামী লীগ নেতারা উন্নয়নের ফিরিস্তি প্রচারের পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে মাঠে নামলে তা বেশি ফলদায়ক হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক ক্ষেত্রে দৃঢ় থাকার মতো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করেন। এবার যদি তিনি দলীয় সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হতে পারেন তবে তার পক্ষে সহজ হবে প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হওয়া।

এসব ক্ষেত্রে সাফল্য পেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হবে। আমরা প্রতিদিন তেমন ক্ষণের প্রতীক্ষা করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *