জলবায়ু পরিবর্তন, উপকূলে বাড়ছে গর্ভপাত

বৈচিত্র ডেস্ক :  দেশের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূল বরাবর ছোট ছোট গ্রামে অপ্রত্যাশিতভাবে গর্ভপাতের হার বেড়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনই এ জন্য দায়ী।

বিষয়টি সরেজমিন দেখতে সাংবাদিক সুসান্নাহ স্যাভেজ গিয়েছিলেন এসব গ্রামে। পরে তিনি বিবিসিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।

স্যাভেজকে ৩০ বছর বয়সী নারী আল মুননাহার বলেন, ছেলেদের চেয়ে মেয়েরাই ভালো। ছেলেরা কোনো কথাই শুনতে চায় না। তারা ঘাড়তেড়া। কিন্তু মেয়েরা নম্র ও ভদ্র।

পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলের একটি গ্রামে আল মুননাহারের বাস। তার তিন ছেলে, কিন্তু মেয়ে নেই। আশা করে আছেন, তার একটি মেয়ে হবে। একবার ভেবেছিলেন, এবার বুঝি তার মেয়ে হতে যাচ্ছে। কিন্তু সেবার তার সন্তানের গর্ভপাত ঘটে।

গ্রামটিতে তার মতো গর্ভপাতের কারণে আরও অনেকের সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে।

যখন সেখানে গর্ভপাত অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না, তখন এসব গ্রামের বাসিন্দাকে পর্যবেক্ষণ করা বিজ্ঞানীরা খেয়াল করলেন, অন্যান্য এলাকার চেয়ে সংখ্যাটা এখানে একটু বেশিই বাড়ছে।

এর পর কারণ খুঁজতে গিয়ে তারা দেখলেন-জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এমনটি ঘটছে।

আল মুননাহারের গ্রামের নাম ফাইল্লাপাড়া। যেখানে হেঁটে চলা খুবই কষ্টকর। শুকনার সময় জলাভূমির ভেতর দিয়ে ছোট্ট অপরিসর একটি রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করা যায়। তবে বর্ষাকালে তা সাগরে রূপ নেয়।

গ্রামটি স্বয়ং একটি মাটির টিলা ছাড়া কিছু নয়। কয়েকটি চালাঘর ও মুরগির খোয়াড় পিচ্ছিল মাটির ওপর পড়ো পড়ো অবস্থায় রয়েছে।

আল মুননাহার বলেন, এখানে কোনো ফসল চাষ হচ্ছে না। খুব বেশি আগের কথা না, নব্বইয়ের দশকেও এই জলাভূমিতে ধানক্ষেত ছিল।

‘ধান চাষ সেই সময় লাভজনক না হলে মানুষের খাবারের জোগান দিতে পারত। কিন্তু পানি ও লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় গ্রামের ধনী লোকজন চিংড়ি খামার করতে বাধ্য হয়। কেউ কেউ জড়িয়ে পড়েন লবণ চাষে।

তবে এখনও কিছু ধানক্ষেত রয়েছে বলে জানান আল মুননাহার।

আন্তর্জাতিক সেন্টার ফর ডায়ারিয়াল ডিজিজ রিসার্চ বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানী ড. মানজুর হানিফি বলেন, এটি কার্যত জলবায়ু পরিবর্তন। মাটিতে এর প্রভাব দৃশ্যমান। কিন্তু মানুষের শরীরের ওপর তৈরি হওয়া ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায় না। অদৃশ্য থেকে যায়।

লোনা পানি এবং উৎকোচ

কক্সবাজারের চকরিয়ার ভেতরে ও বাইরে একটি স্বাস্থ্য এবং জনসংখ্যাগত নজরদারি চালিয়েছে আইসিডিডিআরবি। গত তিন বছর তাদের এই জরিপ চলে। এতে সেখানকার লোকজনের ওপর স্বাস্থ্যগত সামান্য পরিবর্তন ঘটলেও তারা তা ধরতে সক্ষম হয়েছেন।

গত কয়েক বছরে সেখানকার বহু পরিবার সমতলভূমি ছেড়ে দুর্গম অঞ্চলে গিয়ে বসতি গড়েছে। পাহাড়ি বনাঞ্চলে গিয়ে তারা আশ্রয় নেন। এসব পরিবারে যাদের কাছে যথেষ্ট অর্থ আছে, তারা বনরক্ষীদের উৎকোচ দেন। কারণ উৎকোচ ছাড়া বাড়ি করা যায় না।

কাজল রেখা নামে এক নারী বলেন, একটি বাড়ি নির্মাণ করতে আমরা দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দিই।

বছর তিনেক আগে সমতলভূমি ছেড়ে তিন সন্তান ও স্বামীসহ তিনি পাহাড়ে গিয়ে বসতি গড়েন।

কাজল রেখা বলেন, পানির কারণে আমাদের সন্তানরা সবসময় জ্বরে ভুগত। বিশেষ করে বন্যার পর যখন আমাদের বাড়ি পানিতে ডুবে যেত বা ভেজা অবস্থায় থাকত, তখন তাদের অসুখ বেশি হতো। কিন্তু এখানে সব কিছুই সহজ।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অন্যত্র চলে যাওয়া লোকজন তুলনামূলকভাবে একটু ভালো আছেন। তারা ফসল চাষ করছেন, পরিবহন সুবিধার কারণে চাকরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগগুলো পাচ্ছেন।

যাদের উপকূলীয় গ্রামে রেখে আসছেন, তাদের তুলনায় স্বাস্থ্যগতভাবেও তারা ভালো আছেন।

বিশেষভাবে বসতবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয়া এসব নারীর গর্ভপাতও তুলনামূলক কম হচ্ছে।

২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীরা সমভূমি ও পাহাড়ে ঘেরা অঞ্চলটিতে ১২ হাজার ৮৬৭ অন্তঃসত্ত্বার ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন।

সন্তান ভূমিষ্ঠ না হওয়া পর্যন্ত তারা গর্ভবতী নারীদের পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। গবেষণায় তারা দেখেছেন, উপকূল রেখা থেকে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাত মিটার উঁচুতে বসবাস করা নারীরা অন্যত্র চলে যাওয়াদের তুলনায় এক দশমিক তিনগুণ বেশি গর্ভপাত করছে।

ড. হানিফি বলেন, পার্থক্যটা দেখতে সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু সমতলভূমিতে গর্ভপাতের সংখ্যা বাড়ছে।

সেখান মতলব অঞ্চলটিও পর্যবেক্ষণে রেখেছেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীরা। চকরিয়ার সঙ্গে আরও দূরবর্তী অঞ্চল মতলবের তুলনা করে বিজ্ঞানীরা এ পার্থক্যটা চোখে পড়ার মতো দেখতে পেয়েছেন।

চকরিয়ায় ১১ শতাংশ গর্ভাবস্থায় গর্ভপাতের মধ্য দিয়ে ইতি ঘটেছে। কিন্তু মতলবে সেটি মাত্র আট শতাংশ।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এ পার্থক্যটা নির্ভর করছে নারীরা যে পানি পান করছেন, তাতে কী পরিমাণ লবণ আছে তার ওপর। আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এটি বাড়ছে।

যেখানে কোনো বিকল্প নেই

হিমমুকুটের গলনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে বায়ুমণ্ডলীয় চাপেও খারাপ প্রভাব ফেলছে। এমনকি এ কারণে সামান্য পরিবর্তনও সমুদ্রপৃষ্ঠে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

ড. হানিফি বলেন, এক মিলিবার বায়ুমণ্ডলীয় চাপ কমে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১০ মিলিমিটার বেড়ে যায়। বায়ুমণ্ডলীয় চাপে ধারাবাহিক নিম্নচাপে অগভীর সমুদ্র অববাহিকায় পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

যখন সমুদ্রস্তরগুলো বাড়ে, তখন সাগরের লবণাক্ত পানির স্রোত গিয়ে নদীর মিঠাপানি ও জলপ্রবাহের দিকে প্রবাহিত হয়। কার্যত শেষ পর্যন্ত তা মাটিতে গিয়ে মেশে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল- এই স্রোত গিয়ে ভূগর্ভস্থ বিশুদ্ধ পানির উৎসে মিশে তা দূষিত করে ফেলে। আর নলকূপের মাধ্যমে এসব গ্রামের লোকজন সেই পানি পান করেন।

ফাইল্লা গ্রামের নলকূপ থেকে যে পানি বের হয়ে, তা দেখতে কিছুটা লাল রঙের। সবচেয়ে বড় কথা, এ পানি পুরোটাই লবণাক্ত। কিন্তু এতে গ্রামবাসীকে এ পানি পান করা কিংবা তাতে গোছল করা থেকে কেউ বিরত রাখতে পারে না।

এমনকি তারা এতে থালা-বাসন ধৌত করেন এবং খাবারও রান্না করেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, একব্যক্তি দৈনিক গড়ে পাঁচ গ্রামের বেশি লবণ খেতে পারবেন না। কিন্তু চকরিয়ার সমুদ্র উপকূলে যারা বাস করেন, তারা ১৬ গ্রামের বেশি লবণ খাচ্ছেন। পাহাড়ি অঞ্চলের লোকজনের তুলনায় যেটি তিনগুণ বেশি।

ব্রিটেনের মতো দেশগুলোতে অতিরিক্ত লবণ সেবনের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর প্রচার চালানো হচ্ছে। কারণ এতে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়, স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।

আর অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মধ্যে গর্ভপাত ও প্রিএকলাম্পসিয়াও বাড়তে থাকে। প্রিএকলাম্পসিয়া হল, গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ ও প্রসাবে প্রোটিনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া।

বাংলাদেশের পরিবারগুলো যে পানি পান করছেন, তাতে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে তাদের একেবারেই ধারণা নেই। কিন্তু তারা যদি সচেতনও হন, তবে এর বাইরে তাদের কাছে কোনো বিকল্প উৎসও নেই।

৫০ বছর বয়সী প্রৌঢ় নারী জান্নাত আরা বলেন, ক্ষেতের ফসলের জন্যও লবণ ক্ষতিকর। জান্নাত আরা এ গ্রামেই জন্ম নিয়েছেন এবং এখানেই বেড়ে উঠেছেন। তার আর কোথাও যাওয়া হয়নি।

তিনি এবং তার পরিবার কি ফাইল্লাপাড়া গ্রাম ছাড়তে চান- এ প্রশ্নে তিনি হেসে ওঠেন। বলেন, নাহ, কখনই না। আমি সারাজীবন এখানে ছিলাম। থাকবও এখানে।

তিনি বলেন, আমরা কোথায় যাব, আমরা যে খুবই দরিদ্র।

কঠিন জীবন

তার প্রতিবেশী ২৩ বছর বয়সী শারমীন এ গ্রাম ছাড়তে চান। তিনি তার দুই সন্তানে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ য়ে উদ্বিগ্ন।

শারমীন বলেন, এখানকার জীবন খুবই কঠিন। এসব সত্ত্বেও দ্রুতই তার আরেকটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে।

এ মুহূর্তে শারমীন ও আল মুননাহারের মতো নারীদের গর্ভপাতের আশঙ্কা সামান্যই কমতে পারে। ড. হানিফি বলেন, এখন কিছু না করা হলে এটি আরও খারাপের দিকে যাবে। কারণ বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির প্রভাবের আশঙ্কা দিনকে দিন বাড়ছে।

বৈশিক উষ্ণতার কারণে ঘটা পরিবর্তনে নিম্নভূমি ও বন্যাপ্রবণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য দেশের সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়ার কারণে একই ধরনের বিরূপ প্রভাবের মুখোমুখি হয়েছে।

ভারত মহাসাগরে ২০০৫ সালের সুনামিতে যে ধ্বংসলীলা চালিয়েছে, তাতে লবণাক্ত পানিতে কৃষিভূমি ও বিশুদ্ধ পানির উৎসগুলোও দূষিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির উৎসে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়েছে। এ রকম অনেক অঞ্চলের মধ্যে একটি হচ্ছে চকরিয়া।

ড. হানাফি বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাতে বহু অর্থ ক্ষয় করা হয়েছে। কিন্তু এসবের কোনো কিছু গবেষণার মধ্যে যায়নি। এমনকি জনস্বাস্থের ওপর প্রভাবের ওপরও গবেষণা হয়নি। সবাই ভাবছেন পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে। কিন্তু মানব স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে কেউ চিন্তা করছেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *