নির্বাচনের জটিল পরিস্থিতি

বদরুদ্দীন উমর : প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সরকার তোষণ সম্পর্কিত নানা কার্যকলাপ নিয়ে এবং তার অপসারণের দাবি নিয়ে যেসব কথাবার্তা হচ্ছে তার থেকে বোঝার অসুবিধা নেই যে, তিনি তার সরকারি নিয়োগকর্তাদের প্রতি এমনভাবে নিবেদিত থাকেন, যা সংবিধানবিরোধীও বলা চলে।

প্রকৃতপক্ষে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই এ অভিযোগ নতুনভাবে করা হচ্ছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে কামাল হোসেন তাদের ঐক্য প্রক্রিয়ার পক্ষ থেকে সরাসরি দাবি তুলেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ করে অন্য একজনকে নিয়োগ করার; কারণ তিনি সংবিধানের অনুগত থেকে কাজ করার পরিবর্তে সরকারের প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত থেকে কাজ করছেন।

দেশে সামগ্রিকভাবে নির্বাচন সামনে রেখে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে সরকারি দলে পরাজয়ের আতঙ্ক ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে। এই আতঙ্কের দ্বারা তাড়িত হয়েই তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে নানা ধরনের আন্দোলন এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে অবাস্তব বিষোদ্গারণ। এ অবস্থায় তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছে নির্বাচন কমিশন এবং পুলিশকে তাদের নির্বাচনী স্বার্থে ব্যবহার করতে। এ কাজ ২০১৪ সালের মতো সহজ না হলেও চেষ্টা তারা চালিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়টি লক্ষ করেই এখন বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার ওপর আস্থা রাখতে অসমর্থ হয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ চাইছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিমক হারাম নন। কাজেই তিনি সরকারের স্বার্থেই যথাসাধ্য কাজ করে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তার নিজেরই উক্তি স্তম্ভিত করার মতো ব্যাপার।

বাংলাদেশে এখন বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাজারে হাজারে গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা বা নির্দেশ আড়াল করার জন্য বলছেন, এসব গ্রেফতার ও মামলা তার নির্দেশেই হচ্ছে!

কিন্তু তিনি এভাবে এত বিশালসংখ্যক লোকের গ্রেফতার কিসের ভিত্তিতে করছেন? তার হাতে কী ব্যবস্থা আছে, যাতে করে তিনি এই হাজার হাজার লোকের অপরাধ চিহ্নিত করে তাদেরকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিচ্ছেন?

এ পরিস্থিতিতে আসলে যেখানে নির্বাচন কমিশনের কর্তব্য প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির ব্যবস্থা করা, সেখানে তিনি সরাসরি বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কতগুলো অভিযোগে হাজার হাজার লোককে গ্রেফতার করছেন।

এই গ্রেফতার সম্পর্কে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নিজের স্বীকৃতি অনুযায়ীই প্রমাণিত হচ্ছে যে, তিনি কোনো নিরপেক্ষ ভূমিকা নির্বাচন সামনে রেখে পালন করছেন না। তিনি কোনো সরকারি লোকের গায়েই হাত দিচ্ছেন না। গ্রেফতারের ব্যাপারে তার হাত শুধু বিরোধী দলগুলোর দিকেই প্রসারিত।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এই ভূমিকা দেশে এক বিস্ফোরণমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টির ক্ষেত্রেই অবদান রাখছে। কারণ তাদের পক্ষপাতিত্বের কারণে নির্বাচনের সময়ে কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার ঘটলে সেটা জনগণ আর ২০১৪ সালের মতো চোখ-কান-মুখ বন্ধ রাখবেন না। তারা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে বদ্ধপরিকর। কাজেই নির্বাচনে কমিশনের সহায়তায় যদি কারচুপি হয় তার প্রতিফল শুধু প্রধান নির্বাচন কমিশনারকেই নয়, সমগ্র নির্বাচন কমিশনকে ভোগ করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা থাকা দরকার সেটা নেই এবং বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে সেটা হওয়া সম্ভব নয়, যদিও সংবিধান অনুযায়ী তাদের স্বাধীন ভূমিকা পালন করারই কথা। এটা হতে না পারার কারণ, সরকারপ্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে এমন একজনকে নিয়োগ দিয়েছে, যিনি নিয়োজিত হয়ে শপথ নেয়ার পর রাষ্ট্রের নয়, সরকারের পক্ষেই কাজ করছেন।

কাজেই এটা বলাই সঙ্গত যে, সরকার তার দুর্বল অবস্থা সত্ত্বেও সর্বতোভাবে এখন চেষ্টা করছে নির্বাচনে কারচুপি করার। ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে সরকারের যে শিক্ষা নেয়া উচিত ছিল, সেটা না নিয়ে তারা সেই নির্বাচনকে ‘আদর্শ’ ব্যবস্থা হিসেবে সামনে রেখেই অগ্রসর হচ্ছে। এর পরিণতি তাদেরকে অবশ্যই ভোগ করতে হবে। যদিও এ বিষয়ে তাদের চেতনা বলে কিছুই নেই।

শুধু নির্বাচন কমিশনই নয়, পুলিশকেও সরকার একইভাবে আগের মতো ব্যবহারের চেষ্টা করছে। এজন্য পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তারা যে তৎপর আছেন, এটা সংবাদপত্র রিপোর্ট থেকেই দেখা যায়। বিরোধী দলের নেতাদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সভা ডেকে তাদেরকে এ ব্যাপারে নসিহত করা হয়েছে, যাতে তারা আগামী নির্বাচনে সাধ্যমতো সরকারি দলকে সাহায্য করেন।

পূর্ব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পুলিশের ভূমিকার একটা প্রধান দিক হচ্ছে, নিজেরা লাঠি, কাঁদুনে গ্যাস ইত্যাদি ব্যবহার না করে পেশিশক্তিকে সুযোগ করে দেয়, যাতে তারা বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টদের ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়, বিরোধী পক্ষের ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করতে বাধা দেয় অথবা বিরত রাখে এবং ভোট কেন্দ্রে ঢুকে ভোটের বাক্সে জাল ভোট দিতে অথবা ভোটের বাক্স ভাঙতে পারে।

অনুমান করা যায়, এবারও এই পদ্ধতি যাতে বিশেষভাবে কার্যকর করা হয় তার নির্দেশই পুলিশকে দেয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজের ঘাড়ে গ্রেফতারের দায়দায়িত্ব নিলেও আসল কাজ সরাসরি সরকারি নির্দেশে পুলিশই তা করে থাকে। এই মর্মেও পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে।

এটা কোনো নতুন নির্দেশ নয়। এই অনুযায়ীই পুলিশ কাজ করছে। কিন্তু নির্বাচনী পরিস্থিতির মধ্যে এ কাজ করতে পুলিশ যাতে গড়িমসি না করে বা তাদের ‘দায়িত্ব’ পালনে দুর্বলতা প্রকাশ না করে, এজন্যই তাদেরকে চাঙ্গা রাখতে বিশেষভাবে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে চোখে পড়ার মতো আরেকটি কাজ সরকার থেকে করা হয়েছে। সরকার সব জেলা প্রশাসককে নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার করেছে। তারা তাদেরকে এক সভায় ডেকে এনে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তারা সরকারি প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করেন। এই মর্মে সংবাদপত্রে রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, তাদের কাছে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। তারা এ বিষয়ে তদন্ত করবেন।

তারা যে ‘তদন্তের’ কথা বলেছেন তার অবস্থা বা ফলাফল কী দাঁড়িয়েছে এ বিষয়ে কোনো রিপোর্ট কোথাও নেই। শুধু তাই নয়, এ ধরনের কোনো ‘তদন্ত’ আদৌ হয়েছে কিনা তার কোনো খবরও কোথাও নেই। এর থেকে বোঝা যায় সরকার নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও আমলাদেরকে নির্বাচনে তাদের পক্ষে কাজ করার জন্য তৈরি করছে, যদিও মুখে তারা সব সময়েই বলছে, তারা নির্বাচন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে করবে।

বাংলাদেশের মতো দেশে কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে যে এই অবস্থা হয় এটা নতুন নয়। সব সরকারের আমলেই এটা দেখা গেছে। নির্বাচনের আগে যেখানে জাতীয় সংসদ বা পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়া দরকার, সে কাজটিও করা হয়নি এবং সেটা যে করা হবে না এ ঘোষণা সরকার দিয়েছে।

একমাত্র নির্বাচনের পরই জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়ার কথা তারা বলেছে। নির্বাচনের তারিখ হচ্ছে ৩০ ডিসেম্বর এবং বর্তমান জাতীয় সংসদের মেয়াদ হচ্ছে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত।

বর্তমান নির্বাচন পরিস্থিতির একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, সংসদীয় বিরোধী দলগুলোর মূল অংশ এখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সংসদীয় বামপন্থী দলগুলো তাদের পৃথক একটি জোট করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু তাদের কোনো ভোট নেই, কাজেই নির্বাচনী লড়াইয়ে তাদের কোনো গুরুত্বও নেই।

তবে তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলেও আওয়ামী লীগের সামান্য কিছু ভোট তারা টানতে পারে। এতে আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে আওয়ামী লীগের ক্ষতির আসল জায়গা হল মূল বিরোধী জোট ছাড়াও তাদের নিজেদের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার অনেক আগে থেকেই তাদের অনেকেই প্রত্যেক সংসদীয় আসন এলাকায় নিজেরা পোস্টার দিয়ে এবং মিটিং-মিছিল করে নিজেদের প্রার্থিতা প্রচার করেছে। মনোনয়ন না পেলে তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগকে ছেড়ে দেবে না।

বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে তারা প্রায় প্রত্যেক আসনেই দাঁড়িয়ে যাবে এবং আওয়ামী লীগের ভোট টানবে। বিরোধী দলের বিরাট ভোটের টানের সঙ্গে এসব বিদ্রোহী প্রার্থীর ভোটের টান যুক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের অবস্থা খারাপ করবে। এছাড়া এ কারণে প্রত্যেক কেন্দ্রেই আওয়ামী লীগের পক্ষে পেশিশক্তির কাজ করার মতো কর্মীরও অভাব ঘটবে। এটা কম ক্ষতির ব্যাপার নয় আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ‘কৌশলের’ ক্ষেত্রে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের বিষয়টিতে ফিরে এসে বলা যায় যে, এই দাবি পূরণের সামান্য কোনো সম্ভাবনা নেই। বিরোধী দলের দিক থেকে প্রচারের ক্ষেত্রে এর কিছুটা সুবিধা ছাড়া অন্য কিছু পাওয়ার নেই। কাজেই সরকার নিজের নির্বাচনী স্বার্থে নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও আমলাদেরকে যথাসাধ্য ব্যবহার করবে। তবে এসব নির্বাচনী যন্ত্র ব্যবহার করলেই যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়জয়কার হবে, তার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কারণ এসবের অন্য দিকে আছেন জনগণ।

জনগণ এবার নিজেদের ভোটের অধিকার প্রয়োগ করার জন্য এমনভাবে মরিয়া হয়ে আছেন যে, মাঠে উপরোক্ত সরকারি তৎপরতা কোনো কোনো আসনে কারচুপি করতে পারলেও সারা দেশে এ কাজ করতে পারবে বলে মনে হয় না। অতীতে দেখা গেছে, নির্বাচনে ব্যাপক জনগণ বড় সংখ্যায় যখনই ভোট দেয়ার জন্য উদগ্রীব থাকেন, তখনই এর অর্থ দাঁড়ায় তারা পরিবর্তন চান। ক্ষমতাসীন সরকার হটিয়ে তারা একটা বিকল্প সরকার চান, সে সরকারের চরিত্র যাই হোক।

এটা মনে করার কারণ নেই যে, বর্তমান সরকারকে হটিয়ে অন্য সরকার এলে দেশের জনগণের জীবনে সুখের দেখা মিলবে। সেটা হতে পারে একমাত্র পুঁজিবাদ ও ফ্যাসিবাদের ধ্বংসের মাধ্যমে। এর কোনো আশু সম্ভাবনা না থাকলেও বর্তমানে যে ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতাসীন আছে, তাকে যদি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ অপসারণ করতে পারেন, তাহলে তারা এই মুহূর্তে সুখের মুখ না দেখলেও এর ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের পুঁজিবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন যে কিছুটা জোরদার হওয়ার শর্ত তৈরি হবে এতে সন্দেহ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *