বামপন্থীদের মঞ্জিলে মকসুদ কতদূর?

জয়া ফারহানা : বুর্জোয়া রাজনীতি ধনিক শ্রেণী দিয়ে গঠিত বলে তা সবসময় ধনীদের পক্ষে কাজ করে। এ হল দ্রুততম সময়ে অতি ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির রাজনীতি। একজন ওয়ারেন বাফেট, রবার্ট ব্যারন কিংবা স্ট্যানফোর্ডের মতো ধনকুবেরের দানবীরে পরিণত হওয়া এই রাজনীতিকে জায়েজ করতে পারে না।

দু-চারজন দানপতি দিয়ে এ ব্যবস্থাকে মানবিকও করা যায় না। পুঁজিতন্ত্রের অনৈতিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে বসবাস করে সবরকম রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে কোনো খামখেয়ালি ধনকুবের যদি তার ধনসম্পদের ৯০ শতাংশ দান করে দেন, তাহলেও এ ব্যবস্থাপনার পক্ষে বলার মতো একটি যুক্তিও নেই আমাদের কাছে। তবু গ্লাসনস্ত এলো, এলো পেরেস্ত্রয়কাও।

অস্বীকারের উপায় নেই, সমাজতন্ত্রের বিরোধীরা সে যাত্রা সফল হয়েছেন। সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রচারণার ফসল সাফল্যের সঙ্গে ঘরে তুলতে পেরেছেন এর বিরুদ্ধবাদীরা। ফলে দুনিয়ার কোনো জনপদই আজ আর বামদের জন্য মসৃণ নয়। এক রকম বাস্তুচ্যুতও বলা যায় তাদের।

হারাধনের শেষ সন্তান ছিমছাম কিউবাও ঝলমলে জৌলুসপূর্ণ আরাম এবং বিলাসের জীবনে ফেরত যেতে চাইছে, সেও তো কম দিন নয়। তারও আগে গেছে ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, ভিয়েতনাম।

বামদের জন্য সবচেয়ে মসৃণ মহাদেশ দক্ষিণ আমেরিকা এবড়োখেবড়ো হয়েছে, তাও তো বহুদিন হল। বলশেভিক বিপ্লবের পর দুনিয়ার দেশে দেশে যখন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার উত্থান ঘটছে, তখন এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণ যেন মুখ ফিরিয়ে নেয়- তার জন্য খরচ হয়েছে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার।

কত বাম নেতা আমৃত্যু কাটিয়েছেন কারাগারে। কত লেখক-শিল্পী-কবি-সাহিত্যিকের অমূল্য সৃষ্টি নিষিদ্ধ করেছে পুঁজিতান্ত্রিক সরকার। এহেন কর্মকাণ্ডে সবার আগে নাম করতে হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।

তবে রাজনীতিতে যে শেষ কথা বলে কিছু নেই- এই বহুল বিখ্যাত তত্ত্বকে আবারও সত্য প্রমাণ করল কাউন্সিল অব ইকোনমিক অ্যাডভাইজার্সের একটি বিশেষ প্রতিবেদন। সিইএ’র ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন নাকি মার্কিন জনগণ প্রতিদিনই একটু একটু করে সমাজতন্ত্রের মূল্যবোধের দিকে ঝুঁকছেন।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ত্লাইব এবং ওকাসিও কর্টেজ। আর ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনের সূত্রে কিংবা তারও আগে ৯৯ শতাংশ বনাম ১ শতাংশের আলোচিত ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলনের কারণে ডেমোক্রেট দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বার্নি স্যান্ডার্স দুনিয়ার বামদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠছেন।

বিপরীতে বাণিজ্যনীতির কারণে ট্রাম্প সরকারের প্রতি অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কর্পোরেট কর কমানো এবং ওবামা কেয়ার বাতিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত অজনপ্রিয় হয়েছে মার্কিনিদের কাছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ এবং জলবায়ু বিষয়ক প্যারিস চুক্তি থেকে ট্রাম্পের সরে আসাও পছন্দ করেনি মার্কিন জনগণ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো কট্টর পুঁজিতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও তরুণদের কাছে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সমাজতন্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে বলা যায়- পাথরেও ফুল ফোটা সম্ভব তাহলে! নব্বই দশকের শুরুর দিকে কমেডি করে বলা হতো, একদিন কমিউনিস্ট দেশ রাশিয়া হবে ক্যাপিটালিস্ট- তা যে অসম্ভব নয়, তার ইঙ্গিত মিলছে।

কিন্তু কেন ফুল ফোটাতে পারছেন না তবে আমাদের বার্নি স্যান্ডার্সরা? কী অবস্থা তাদের? এ দেশে এখনও বামপন্থায় বিশ্বাসী বিরল ব্যতিক্রম যারা আছেন, তারা যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছেন মরীচিকাহীন মরুভূমিতে। মরীচিকা অবশ্য মায়াসদৃশ প্রতারণা। আমরা বরং মরীচিকা শব্দের বদলে মরূদ্যান শব্দটি ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু মরূদ্যান কি আছে আদতে?

বামপন্থার নামে এ দেশের বামপন্থী নেতাদের ঘোরতর পচন প্রক্রিয়া দেখেছি আমরা। তারপরও মরূদ্যান আছে নিশ্চয়ই। সবরকম অপমান ও নির্যাতনের পরও ক্ষতবিক্ষত মনে আজও যারা নির্লজ্জের মতো বামপন্থা আঁকড়ে আছেন বলে দাবি করেন, তারা কি এই মরূদ্যানের খোঁজখবর রাখেন?

২.

আমাদের বিখ্যাত বাম নেতাদের কেউ কেউ বহুদিন আগে ঘোষণা দিয়েছিলেন, হাঁড়িতে পানি চড়ানো হয়েছে; পানি ফুটে উঠলেই ভাত চড়ানো হবে এবং তখন সবাইকে সংবাদ দেয়া হবে। এ রকম ঘোষণা অবশ্য আমরা মাঝে মাঝেই শুনি। কিন্তু চাল ফুটে ভাত আর হয় না।

বলতেই হচ্ছে- যবে এই হাঁড়ি চড়ানো হয়েছে; তাতে এতদিনে ভাত রান্না হয়ে যাওয়ার কথা। তবে ভাত হল না কেন? উনুনের আঁচ ঠিকঠাক নেই? ভাতের চালে গোলমাল? নাকি ফোটানোর পানি অশুদ্ধ? খুঁজে বের করতে হবে তাদেরই।

তারা বলেছিলেন- জনগণকে তারা পরিষ্কার করে সেটাই জানাবেন; যা তারা অস্পষ্ট করে তাদের কাছ থেকে শিখেছেন। তবে কি আমরা ধরে নেব, জনগণের অস্পষ্ট ভাষা তারা শিখতে পারেননি বলে এখন পরিষ্কার করে জনগণকে শেখাতে পারছেন না? উত্তর বাম নেতরাই ভালো দিতে পারবেন। তবে আমরা যারা অপেক্ষায় ছিলাম এবং এখনও অপেক্ষায় আছি; তারা দেখতে পাচ্ছি, এখনও বামদের হাঁড়ির ভাত জনগণকে সরবরাহ করা যায়নি।

৩.

ঠিক যে, আমাদের বাম নেতাদের সংগ্রাম বহুমুখী। পাশ্চাত্যের তরুণরা যেখানে বামপন্থার দিকে ঝুঁকছে, প্রাচ্যের তরুণ সমাজের আইকন তখনও দিপীকা পাড়ুকোন-রণবীর সিং। তারা এমনই আইডল, যারা একদিনের অনুষ্ঠানে গোলাপ ফুল কিনতে খরচ করে ছয় লাখ রুপি।

এই ‘আইডল’ দম্পতির বিয়ের ভেন্যু লেক কোমোতে শেফ যে মেনু পরিবেশন করবেন, তা আর কোনোদিন তিনি অন্য কোনো অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করতে পারবেন না। নিজেকে অন্য সবার চেয়ে স্বতন্ত্র এবং শ্রেষ্ঠ প্রমাণে এই তরিকা যিনি গ্রহণ করেন, তারা প্রাচ্যের কোটি কোটি মানুষের আইডল! এ মানসিক ক্লেদের কারণেই প্রাচ্যে সমাজতন্ত্রের এই দুর্দশা।

৪.

ঐতিহাসিক টয়েনবি বলেছিলেন মার্কসবাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবে জাতীয়তাবাদ। তখন ভাবা হতো, এ দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে জাতীয়তাবাদ একদিন পরাস্ত হবে। জাতীয়তাবাদের মধ্যে সংকীর্ণতা আছে; কিন্তু মার্কসবাদ বিশ্ব মানবতার পথ দেখায়। বিশ্বের কোনো দেশ আজ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় না চললেও এখনও বিশ্বের গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষ বিশ্বাস করে সমাজতন্ত্রই আদর্শ ধারণা।

প্রমাণ- পুঁজি যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি প্রসারিত হয়েছে; তারা সমাজতন্ত্রের অনেক ধারণা প্রয়োগ করেছে। রাষ্ট্রের দেয়া বেকার ভাতা, বৃদ্ধ ভাতা ইত্যাদি সমাজতান্ত্রিক ধারণা। তবে ক্ষতিও যে কিছু হয়নি, তা নয়। প্রায় পাঁচ দশকের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্ব পুরোটাই বুর্জোয়াবাদী।

কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, শিল্প- সাহিত্য-সংস্কৃতির আবার জাত কী? শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির কোনো সীমারেখা নেই। যে আধেয়তে আধার পরিবেশিত হবে, তা যদি পুঁজিপতিদের হয়; তবে তার জাত থাকে বৈকি! গত পাঁচ দশক ধরে গণমাধ্যমে যে পুঁজি লগ্নি হয়েছে; তার সবই তো পুঁজিতন্ত্রের পুঁজিপতিদের। ফলে গণমাধ্যমের সব চোখ সবসময় তাদের অনুসরণ করে।

বামপন্থীরা সেখানে নিগৃহীত প্রাণী। তারপরও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমরা এই আশা করে থাকব- মানুষ নিশ্চয়ই একদিন বুঝতে পারবে, কিসে তার ভালো। কেউ অন্যের শ্রম নিয়ে মুনাফা করবে না। শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসাসহ সব মৌলিক অধিকার সবাই সমানভাবে ভোগ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *