সরকারের নতুন নির্বাচনী ম্যাজিক

বদরুদ্দীন উমর : ডিসেম্বরের ৩০ তারিখের সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ সরকার অনেক ম্যাজিক দেখাচ্ছে। এসব ম্যাজিক নতুন নয়। এর উদ্দেশ্য ২০১৪ সালের নির্বাচন অনুসৃত লাইনের ম্যাজিক নতুন আঙ্গিকে দেখানোর চেষ্টা।

২০১৪ সালের নির্বাচনে এমন আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছিল যার ফলে ১৫৩ আসনে কোনো প্রার্থীই ছিল না এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করার মতো অবস্থায় এসেছিল। এবার আতঙ্ক সৃষ্টি করলেও তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না, উপরন্তু বিপুলসংখ্যক প্রার্থী নির্বাচন দৌড়ে মাঠে নেমেছেন।

কাজেই কৌশল পরিবর্তন করে একই ম্যাজিক দেখানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেই কৌশল হল, যারা নির্বাচন কমিশনের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে তাদের মনোনয়ন বাতিল করা, যাতে তারা নির্বাচনে অংশই নিতে না পারে। কাজেই এ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে যে, সারা দেশে রিটার্নিং অফিসাররা ৩০৬৫টি নমিনেশন পেপারের মধ্যে ৭৮৬টি বাতিল করেছেন। এর মধ্যে বিএনপির নেতৃত্বাধীনে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী সংখ্যা ৮০-এর ওপর (উধরষু ঝঃধৎ, ০৩.১২.২০১৮)। কিন্তু আসলে এ সংখ্যা আরও বেশি, কারণ এ কাজ করা হবে এটা আগে থেকে অনুমান করে বিএনপি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একাধিক প্রার্থীর নমিনেশন দাখিল করেছিল, যাতে তাদের ঘোষিত প্রার্থীর নমিনেশন পেপার বাতিল হলে অন্য প্রার্থীকে তারা নমিনেশন দিতে পারে।

দেখা যাচ্ছে সেই সব প্রার্থীকেও টার্গেট করে রিটার্নিং অফিসাররা তাদের নমিনেশনপত্র বাতিল করেছেন। লক্ষ করার বিষয়, যাদের নমিনেশন পেপার এভাবে বাতিল করা হয়েছে, তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের কেউ নেই, একজন ছাড়া (Daily Star, 03.12.2018)।

সরকার জেলার ডেপুটি কমিশনারদের (ডিসি) নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করেছে। অর্থাৎ এই সরকারি আমলারাই নির্বাচনে সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকবেন। এভাবে ডিসিদের রিটার্নিং অফিসার করার পর তাদের এক সভা ডাকা হয়েছিল বলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল। সেই সভায় তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল কিভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে।

এ নিয়ে বিরোধী দল থেকে আপত্তি জানানোর পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো খবর নেই, তবে তারা এ ব্যাপারে তদন্ত করবেন।

প্রথমত, রিটার্নিং অফিসারদের এ ধরনের একটা সভা কিভাবে হল, যার রিপোর্ট পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হল, অথচ নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে কিছুই জানল না, এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। দ্বিতীয়ত, এ নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তদন্তের কথা বললেও আজ পর্যন্ত সে রকম কোনো তদন্ত বা তদন্তের রিপোর্ট কোথাও নেই। অর্থাৎ প্রধান নির্বাচন কমিশনার তদন্ত করবেন একথা বললেও আসলে তিনি কোনো তদন্তই করেননি।

ধারণা করা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর অফিসে রিটার্নিং অফিসারদের যে সভা হয়েছিল, তাতে তাদেরকে যেসব নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তার মধ্যে ছিল বিরোধী দলগুলোর নমিনেশন পেপার বাতিলের। তাদেরকে নিশ্চয় এ প্রসঙ্গে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রত্যেক বিরোধী দলের প্রার্থীর বিষয়ে খোঁজখবর নিতে এবং সামান্য অজুহাত পেলেই তার ভিত্তিতে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিলের। যাদের নমিনেশন পেপার এভাবে বাতিল করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশকেই দেখানো হয়েছে ঋণখেলাপি হিসেবে। এছাড়া আছে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ইত্যাদির বিল পরিশোধ না করার ব্যাপার। এখানে প্রশ্ন হল, ঋণখেলাপি অথবা বিল পরিশোধ না করা দোষের ব্যাপার হতে পারে; কিন্তু তার ভিত্তিতে এভাবে ঢালাওভাবে নমিনেশন পেপার বাতিলের দৃষ্টান্ত এ দেশে আগে দেখা যায়নি। এমনকি সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার ছেলে গণফোরামে যোগ দেয়া রেজা কিবরিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে তিনি তার ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ না করার জন্য! এ ধরনের কারবার এ দেশেও এক অদৃষ্টপূর্ব ব্যাপার। ফ্যাসিজম কোন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে এটা হল তার অন্যতম উদাহরণ।

এ প্রসঙ্গে যা বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার তা হল, আওয়ামী লীগের শত শত মনোনয়নপ্রাপ্ত লোকের কারও বিরুদ্ধে রিটার্নিং অফিসাররা ঋণখেলাপি অথবা বিল পরিশোধ না করার উদাহরণ পাননি!

এর থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, রিটার্নিং অফিসারদের তদন্ত ও বিচার অনুযায়ী আওয়ামী লীগের লোকরা ধোয়া তুলসীপাতা, তাদের মতো সৎ ও নিরীহ আর কেউ নেই!!

অথচ এ কথা কে না জানে যে, তাদের লোকেরা বিগত ১০ বছর বাংলাদেশকে লুটপাট করে খেয়েছে, ব্যাংক থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা তাদের লোকজনদের দ্বারাই লুটপাট হয়েছে, যার অনেক রিপোর্ট সংবাদপত্রেই ছাপা হয়েছে। বিল পরিশোধ না করার জন্য আওয়ামী লীগ নেতারা বিখ্যাত। কিন্তু এসব বিষয়ে রিটার্নিং অফিসাররা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া লোকদের কারও কোনো তথ্য পাননি!

তারা এই রিটার্নিং অফিসারদের সার্টিফিকেটের ছাড়পত্র পেয়ে নিজেদের মনোনয়নপত্র নিরাপদ রেখে পাস করিয়ে নিয়েছেন!!! এর থেকে বড় ম্যাজিক আর কী হতে পারে? এই হীন ম্যাজিকের খেলাই রিটার্নিং অফিসাররা দেখিয়েছেন তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করার নামে।

সরাসরি রাজনীতির রীতিনীতি পরিত্যাগ করে এভাবে আওয়ামী লীগ যে তাদের সরকারি ক্ষমতার জোরে ম্যাজিক দেখানোর ব্যবস্থা করেছে, এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে তারা যে শুধু বিরোধী দলের ভয়ে ভীত তাই নয়, জনগণের বিরোধিতার মুখে তারা মহা আতঙ্কিত। এদিক দিয়ে বলা চলে তারা এখন জনাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে অস্থির আছে।

জনগণের ভয় তাদেরকে দিশেহারা করেছে। জনগণ তাদের বিরুদ্ধে এমনভাবে ক্ষিপ্ত হয়েছেন যে, তারা বিরোধীদেরকে ভোট দিতে প্রস্তুত। এই ভোট তারা যাতে না দিতে পারেন, এজন্যই ব্যাপকভাবে নানা উসিলায় বিরোধীদলীয় লোকদের, এমনকি অনেক স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী মনোনয়নপত্র জমাদানকারীর বিরুদ্ধেও তারা পদক্ষেপ নিয়েছে।

কিন্তু কাকে ভোট দেবেন এটা সব ক্ষেত্রে ঠিক করতে না পারলেও কাকে ভোট দেবেন না এটা যদি জনগণ স্থির করে থাকেন সচেতনভাবে, তাহলে আওয়ামী লীগ বিরোধীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করেও রেহাই পাবে বলে মনে হয় না। কারণ কাকে ভোট দেবেন এটা ভোটাররা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত না হলেও তারা আওয়ামী লীগকে ভোট দেবেন না। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ভোটের বাক্স খালিই থাকবে, যদি না আরও ম্যাজিক দেখিয়ে ভোটের বাক্স ভাংচুর এবং মিথ্যা ভোটের ম্যাজিক দেখানো সম্ভব হয়।

আওয়ামী লীগের মিত্র হিসেবে তাদের জোটের প্রধান অংশ হল জাতীয় পার্টি। এই পার্টি নিজেদের মধ্যে টাকা-পয়সা নিয়ে এমন দাঙ্গা-হাঙ্গামায় জড়িত হয়েছে যে তাদের অবস্থা কাহিল। তাদের এখন এমন অবস্থা যে ঘর সামলানোও বড় দায়। এ ধরনের এক মিত্র যে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে কাজে আসবে এটা মনে হয় না।

আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় অঘোষিত মিত্র হচ্ছেন চট্টগ্রাম মাদ্রাসার মাওলানা শফী। তাদের কওমি মাদ্রাসার লোকজনকে এখন অনেকেই মনে করেন আওয়ামী লীগের একটা ভোটব্যাংক। কিন্তু বাস্তবত কী ঘটবে সেটা স্বতন্ত্র ব্যাপার। তারা যে হঠাৎ করে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে তাদের জয়জয়কার ঘটাবে, এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার কিছু নেই। আওয়ামী লীগের নিজের অবস্থাসহ এভাবে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে সেটা আওয়ামী লীগের জন্য যে অনুকূল শর্ত তৈরি করছে এমন নয়।

যাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে তাদের একটা আপিলের সুযোগ আইনত আছে। তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে আপিল করবেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের যে অবস্থা তাতে এসব আপিলের অবস্থা কী দাঁড়াবে সেটা অনুমান করা কঠিন নয়।

প্রকৃতপক্ষে সরকার নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, আমলাতন্ত্র ও আদালত দিয়ে সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর এখন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, তাতে প্রতিষ্ঠানগুলো এক পক্ষ হিসেবেই কাজ করছে। কিন্তু এই সুবিধাজনক অবস্থা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণের বিপজ্জনক অসুবিধা হল, এর উল্টো দিকে আছেন জনগণ, তারা হলেন অন্য পক্ষ।

প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে একত্রিত করে, সেগুলোর ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে আওয়ামী লীগ এখন জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে তাদেরকে দাঁড় করিয়েছে। অন্য কথা বাদ দিলেও সমগ্র বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার জন্যই এটা এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই বিপদ সামান্য নয়।

বাংলাদেশের জনগণ এখন তাদের নিুতম গণতান্ত্রিক অধিকার ভোটদানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য সচেতনভাবে তৈরি হয়েছেন। ২০১৪ সালের পুনরাবৃত্তি তারা চান না। আওয়ামী লীগ ম্যাজিক দেখিয়ে দ্বিতীয়বার ২০১৪ সালকে ফিরিয়ে আনতে চাইলেও তাদের সে চেষ্টা জনগণের দ্বারাই প্রতিহত হবে।

এ বিষয়ে মনে হয় আওয়ামী লীগ সরকারের বিশেষ ধারণা নেই। কাজেই রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে তারা যদি জনগণকে বুড়ো আঙুল দেখানোর চেষ্টা করেন, তাহলে সেটা শুধু যে তাদের নিজেদের জন্য বিপদ ডেকে আনবে তাই নয়, দেশেও অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি করবে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন সামনে রেখে যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে তাতে এই ভয়ংকর আশঙ্কা আজ অনেকের মধ্যেই। এই আশঙ্কার বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।

বাংলাদেশের জনগণ আজ নিজেদের ভোটাধিকার ঠিকমতো প্রয়োগ করতে চান এ কারণে যে, নির্বাচিত অথবা অনির্বাচিত কোনো ধরনের স্বৈরতন্ত্র বা ফ্যাসিজম সহ্য করার মতো ক্ষমতা তাদের আর নেই। তারা এর বিরোধী।

কাজেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে যদি এক টালমাটাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সেখানে নতুন কোনো রূপে ফ্যাসিজম ক্ষমতায় আসে, এটা জনগণ আর কোনোক্রমেই চান না। তারা এর বিরোধী।

তারা যে আজ শুধু খাওয়া, পরা, চিকিৎসা, বাসস্থান, শিক্ষার ক্ষেত্রে গণতন্ত্র চান তাই নয়, তারা একই সঙ্গে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে চান। এভাবে নিঃশ্বাস গ্রহণের স্বাধীনতা ও নিশ্চয়তার জন্যই তারা এখন প্রধানত সংগ্রাম করছেন।

নির্বাচনের মাধ্যমে এই অধিকার যদি প্রতিষ্ঠিত না হয় এবং ফ্যাসিজম যদি অন্য কোনো রূপেও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, সেটা হবে দেশের ও জনগণের জীবনে এক ভয়াবহ ব্যাপার। মস্ত এক ট্র্যাজেডিও বটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *