৬৬ বছরে ইত্তেফাক

বৈচিত্র ডেস্ক : গণমানুষের মুখপত্র দৈনিক ইত্তেফাক ৬৬ বছরে পা দিল আজ। ইত্তেফাক তার প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে এসেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার স্বপ্ন-লালিত যে বাংলাদেশ — ইত্তেফাক সেই জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে উত্সর্গ করেছিল। সেই পথ ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু সত্ সাংবাদিকতা ছিল সেই কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার মন্ত্র। সত্ সাংবাদিকতার সেই মন্ত্র ইত্তেফাক আজও হূদয়ে ধারণ করে চলেছে।

মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মানিক মিয়া ও ইত্তেফাক- এই ত্রয়ী এক হয়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সর্বোচ্চ সীমা স্পর্শ করেছিল। তারই পথ ধরে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইত্তেফাক বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করে চলেছে। দেশবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন, সীমাহীন ভালোবাসাই ছিল ইত্তেফাকের সুদীর্ঘ পথচলার একমাত্র শক্তি ও সাহস। আজকের শুভ মুহূর্তে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা, শুভেচ্ছা।

মুক্তিযুদ্ধের পরে নতুন বাস্তবতায় দৈনিক ইত্তেফাক নতুন আঙ্গিকে প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু সত্য, ন্যায়, গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশের মানুষের অধিকারের প্রশ্নে ইত্তেফাকের অবস্থান কখনো বদলায়নি। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ইত্তেফাকের সেই পুরানো আদর্শই এখনও একমাত্র সম্পাদকীয় নীতি। আর তা হলো, নিরপেক্ষ ও নির্ভীক সাংবাদিকতার ধারা অনুসরণ এবং গণমানুষের মনে স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখা, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের সঙ্গে আপস না করা এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে অবিচল থাকা।

মুক্তিযুদ্ধ দৈনিক ইত্তেফাকের নিরন্তর প্রেরণার উত্স। আজকের শুভক্ষণে তাই ইত্তেফাক গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনে নিহত শহীদদের। মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও নির্ভীক সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে। এঁদের সীমাহীন প্রেরণা, ভালোবাসা ও ত্যাগের বিনিময়ে ইত্তেফাক এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসার শক্তি পেয়েছে।

১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের মুখপত্ররূপে ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন পত্রিকার আনুষ্ঠানিক সম্পাদক। কলকাতা প্রত্যাগত তফাজ্জল হোসেন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার সাথে যুক্ত হন এবং ১৯৫১ সালের ১৪ আগস্ট থেকে এই পত্রিকার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর ইত্তেফাক দৈনিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হয়। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তত্কালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের যে ভরাডুবি হয়, এর পেছনে ছিল দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার শক্তিশালী রিপোর্ট ও মানিক মিয়ার ক্ষুরধার লেখনি।

১৯৬৯ সালে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া আকস্মিকভাবে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত থাকে এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ও স্বাধীনতা আন্দোলনে পত্রিকাটি সরাসরি সমর্থন দেয়। বিশেষ করে ১৯৭০ সালের নির্বাচন, আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়, ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানিদের অনীহা ও ষড়যন্ত্র এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ ও সর্বাত্মক অসহযোগের আহ্বান থেকে ২৫শে মার্চ রাতে আক্রান্ত হবার পূর্বপর্যন্ত ইত্তেফাক গৌরবময় ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে ইত্তেফাক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করে গেছে। একসময়ে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের সামরিক শাসক ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে ২৫ মার্চ রাতে ইত্তেফাক ভবন পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু মানুষের ভালোবাসায় বারবার প্রবল প্রতাপে ফিরে এসেছে ইত্তেফাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *