প্রয়াত খন্দকার আবদুল বাতেন

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম :  ২৭ জানুয়ারি টাঙ্গাইল শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে এক প্রাণহীন গণসংবর্ধনা হলো। জেলার আট এমপি, তার মধ্যে আবার একজন মন্ত্রী, সংবর্ধনায় উৎসাহের ছিটেফোঁটাও ছিল না। কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক আমার প্রিয় মানুষ। সংবর্ধনায় একমাত্র তিনিই বক্তৃতা করেছেন, স্বাগত জানিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, প্রবীণ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান খান ফারুক। সংবর্ধনায় সভাপতিও ছিলেন তিনি।

যাক ওসব ২১ জানুয়ারি রংপুরের হারাগাছ হয়ে লালমনিরহাটের রাজপুর তোজাম্মেলের বাড়ি গিয়েছিলাম। জনাব তোজাম্মেল ৬০-৬২ বছরের অতি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। তার হত্যার প্রতিবাদ ও পরিবার পরিজনকে সমবেদনা ও সহানুভূতি জানাতে গিয়েছিলাম। কড়কড়া রোদে ধানখেতে প্রতিবাদ সভায় বিপুল লোক হয়েছিল। তার মধ্যে শুধু মহিলাই হবে ৩-৪ হাজার। এর আগে নোয়াখালী, সিলেট বেশ কয়েক জায়গায় গেছি। সিলেটের পথে বারবার বাংলাদেশ বিমান এক-দেড়-দুই-তিন ঘণ্টাও দেরি করেছে। কিন্তু ঢাকা-সৈয়দপুর যাওয়ার পথে ইউএস বাংলা, ফেরার পথে নভো এয়ার কোনোটাই এক মিনিট দেরি করেনি। যাওয়ার পথে এমপি স্বপনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তার স্ত্রী খুব সম্ভবত নরসিংদীর শামসুদ্দিন ভূইয়ার নাতিন। সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে বেরোবার পথে ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলীর মেয়ে শাওনের সঙ্গে দেখা। সালাম করে উঠে দাঁড়িয়ে বলছিল, ‘আমাকে চিনেছেন মামা? আমি ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলীর মেয়ে।’ বলেছিলাম, চশমাটা খুলো তো। চশমা পরায় চিনতে না পারলেও চশমা খুলতেই চিনেছিলাম শাওনকে। ৩-৪ বছর বয়সে কত কোলে পিঠে ওঠেছে। শাওনের মা তহুরা আলীর কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। বলছিল সবাই ভালো আছে। বিমানবন্দর থেকে বেরোতেই এক সুদর্শন লম্বা যুবক ছুটে এসে বলল, এই গাড়িতে উঠুন। গিয়ে বসলাম। ৫-৭ গজের মধ্যেই আ স ম আবদুর রব দাঁড়িয়ে ছিলেন। বেশ ইতস্ততাও লাগছিল। এক সময় তাকেও এনে সামনের সিটে বসানো হলো। সাধারণত আমি সামনের সিটে বসি। সেদিন প্রায় ৮০+৮০= ১৬০ কিলোমিটার পিছনের সিটে বসে জার্নি করেছি। গাড়িটা ছিল ১৫০০ সিসি। আমি সব সময় জিপে চলি। তাই ঝাঁকি একটু কম লাগে। গাড়ির মালিক হারুন অসম্ভব সুন্দর ভাষী। সারাদিন আমাদের সঙ্গে ছিল। তার কথায় সব সময় চমৎকৃত হয়েছি। সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে বেরোতেই নিত্যসঙ্গী ফরিদের ফোন, ‘দাদা শুনেছেন, খন্দকার আবদুল বাতেন কিছুক্ষণ আগে মারা গেছেন।’ শুনে খুবই খারাপ লাগছিল। আশা করিনি ওভাবে খবর পাব।

কী ভাগ্য! খন্দকার আবদুল বাতেনের মৃত্যুর সংবাদ পেলাম রংপুরে। গাড়িতে ছিলেন আ স ম আবদুর রব আর হাবিবুর রহমান তালুকদার বীরপ্রতীক। ’৬৯ গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক, ঢাকসুর ভিপি, বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলক আ স ম আবদুর রব ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট রংপুর জেলে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার খবর পান। আর আমি খন্দকার বাতেনের পরপারে যাওয়ার খবর পাই সেই রংপুরে। কাকতালীয় কিনা জানি না। ’৬০-এর দশকে ছাত্র রাজনীতিতে টাঙ্গাইল জেলার সীমানায় খন্দকার আবদুল বাতেন অবশ্যই একজন আলোচিত ছাত্রনেতা ছিলেন। খন্দকার আবদুল বাতেন নাগরপুরের মানুষ। পড়তেন করটিয়া সাদত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। থাকতেন মুসলিম হোস্টেলের পূর্ব-দক্ষিণের কোনার ১৩ নম্বর রুমে। ’৬৭-’৬৮-এর দিনগুলোতে করটিয়া সাদত কলেজ চলত ওই রুম থেকে। মাঝে আমি সেনাবাহিনীতে গিয়েছিলাম। ’৬৭-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত ছিলাম। কলেজে গিয়েই ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী তখন ছাত্রদের প্রাণ স্পন্দন। ছাত্র সমাজে কোনো নেতা এত জনপ্রিয় হতে পারেন লতিফ সিদ্দিকী ছাড়া দ্বিতীয় নজির পাওয়া যাবে না। শাজাহান সিরাজ, ফজলুর রহমান খান ফারুক, আল মুজাহিদী তখন ছাত্রলীগের নেতা। অন্যদিকে হামিদুল হক মোহন আরও ২-৪ জন তাদের পরের স্তরের। এ রকম সময় লতিফ সিদ্দিকী যখন নিরাপত্তা আইনে ময়মনসিংহ জেলে। তখন টাঙ্গাইলে ছাত্র রাজনীতি পরিষ্কার দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে শাজাহান সিরাজ, আরেক দিকে লতিফ সিদ্দিকী। ঢাকায় শাজাহান সিরাজের শেকড় খুবই শক্ত, স্থানীয় ভাবে ছাত্র জনতার মাঝে লতিফ সিদ্দিকী মুকুটহীন সম্রাট।

গণতন্ত্রের দেশ অথচ কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংসদ নির্বাচন নেই। কিন্তু পাকিস্তানের শেষ দিকেও কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হতো। করটিয়া সাদত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজও তার ব্যতিক্রম ছিল না। ’৬৮-এর করটিয়া সাদত কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন আরও কারা কারা অংশ নিয়েছিলাম। কলেজ শাখায় শাজাহান সিরাজের গ্রুপ শক্তিশালী। ৩৬ সদস্যের কমিটিতে আমরা ১৩, বাকি শাজাহান সিরাজের দল। তাই তেমন কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের মতে হতো না। আমরা যুক্তি দিতাম, তর্ক করতাম। কিন্তু ভোটে হেরে যেতাম। তবু সাধারণ ছাত্ররা আমাদের পিছনে কাতারবন্দী থাকায় একেবারে উপেক্ষা করতে পারত না। ’৬৮-এর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে খন্দকার আবদুল বাতেন ভিপি আর আজিজুর রহমান দুলাল জিএস প্রার্থী হয়েছিল। আমরা দলীয় ঐক্যের স্বার্থে একজন শাজাহান সিরাজের, অন্যজন লতিফ সিদ্দিকী গ্রুপ থেকে চেয়েছিলাম। মনোনয়ন পর্যন্ত তর্ক-বিতর্ক চলছিল। কিন্তু শেষে আমাদের কথা শোনা হয়নি। ছাত্রলীগের মনোনয়ন ঘোষণা হলে আমরা কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। মনোনয়ন উপেক্ষা করে প্রার্থী হলে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হবে। বহিষ্কার করলে কী হবে, জেলায় তার কী প্রভাব পড়বে, কলেজেই বা কী হবে অনেক ভেবে চিন্তে শেষ পর্যন্ত সোহরাব আলী খান আরজুকে জিএস পদে লতিফ সিদ্দিকী গ্রুপের পক্ষ থেকে দাঁড় করা হয়। আমাদের সঙ্গে অনেক প্রবীণ ছাত্র নেতারা ছিলেন। ভাতকুড়ার সোহরাব আলী খান আরজু ছোটখাটো চমৎকার এক যুবক। একেবারে হতদরিদ্র পরিবারে জন্মালেও দারিদ্র্য তাকে ম্লান বা ম্রিয়মাণ করতে পারেনি। বর্তমানে দেশে তেমন নির্বাচনী পরিবেশ নেই। কিন্তু তখন সাদত কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচন জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে কোনো অংশে কম ছিল না। আমরা প্রায় দুই-আড়াই মাস রাত-দিন এক করে দিনে কলেজে, রাতে গ্রামে গ্রামে প্রচার চালাতাম। সোহরাব আলী খান আরজুকে নিয়ে যেখানেই যেতাম সেখানেই বিপুল সাড়া পেতাম। ভোটের দিন সারাদিনই উত্তেজনা ছিল। তবে সে উত্তেজনা শুধু আমাদের মধ্যে ছাত্রলীগ আর ছাত্রলীগ। মুসলিম লীগের ছাত্র ফেডারেশন নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলেনি। ছাত্র ইউনিয়নেরও তেমন প্রভাব ছিল না। ছাত্র ইউনিয়ন আবার তিন ভাগে বিভক্ত। একটা বিপ্লবী, একটা মতিয়া চৌধুরী, আরেকটা রাশেদ খান মেনন। তারা  তিন ইউনিয়ন এক হয়ে নির্বাচন করে হাজারচারি ভোটের মধ্যে শতেকখানির বেশি পায়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে। সকাল থেকে ৪টা পর্যন্ত সে এক অভূতপূর্ব ভোট হয়। গোনা হলে দেখা গেল ভিপিতে খন্দকার আবদুল বাতেন জিতেছেন। আবদুল বাতেন জিতবেন এটা জানাই ছিল। কারণ আমাদের গ্রুপে ভিপি প্রার্থী ছিল না। আমরা এক জিএস নিয়েই লড়েছিলাম। আমাদের জিএস সোহরাব আলী খান আরজু দ্বিগুণেরও বেশি ভোট পেয়েছিল। সেই থেকে করটিয়া সাদত কলেজের ছাত্র সংসদ দুই ভাগে বিভক্ত। পরিষদে সোহরাব আলী খান আরজুর তেমন ভোট ছিল না। কিন্তু তার দক্ষতা যোগ্যতা তাকে সপ্রতিভায় উদ্ভাসিত করেছিল। যদিও ভিপি শাসিত পরিষদ। কিন্তু একমাত্র সোহরাব আলী খান আরজুর সময় করটিয়া সাদত কলেজ ছাত্র সংসদ অনেকটা জিএস শাসিত হয়ে পড়েছিল। খন্দকার আবদুল বাতেন আর সোহরাব আলী খান আরজুর অভিষেক ছিল অসাধারণ। আবদুর জব্বার, আপেল মাহমুদ, রথীন্দ্র নাথ রায় গান গাইতে এসেছিলেন। প্রধান অতিথি ছিলেন ইত্তেফাকের সিরাজ উদ্দিন হোসেন। অত বেঁটেখাটো ছোট্ট মানুষ মাঠ কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। তার আইয়ুব বিরোধী প্রতিটি কথাই আমাদের উতালা করেছিল। সেখানে সংসদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এক অসাধারণ বক্তৃতা করেছিলেন সোহরাব আলী খান আরজু। তার বক্তৃতায় আমরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। অত বড় একটা অনুষ্ঠানে একবারের জন্যও যেখানে লতিফ সিদ্দিকীর নাম উচ্চারণ হয়নি সেখানে বারবার সেই লতিফ সিদ্দিকীর নাম নিয়ে যখন সোহরাব আলী খান আরজু প্রায় ৩০-৩২ মিনিট বক্তৃতা করলেন তখন সবাই তন্ময় হয়ে গিয়েছিল। আমি নিজেও দারুণ অভিভূত হয়েছিলাম। অমন চমৎকার বক্তৃতার পর ভিপি হিসেবে খন্দকার আবদুল বাতেন তেমন কিছুই বলতে পারেননি। খন্দকার বাতেন সুবক্তা ছিলেন না। নির্বাচনের পর ভেবেছিলাম কলেজ এবং জেলা আমাদের ওপর শক্ত পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু কলেজের ১২ আনা ছাত্র-ছাত্রী আমাদের হওয়ায় এবং জেলা কমিটিতে আমাদের প্রাধান্য থাকায় তেমন কোনো শক্ত পদক্ষেপ নিতে সাহস পায়নি। বিশেষ করে তখন শুধু আন্দোলন আর আন্দোলন। আন্দোলন ছাড়া কিছু ছিল না। বঙ্গবন্ধু জেলে, আওয়ামী লীগের সিংহভাগ নেতা জেলে। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, আবদুর রাজ্জাক, ওবায়দুর রহমান, শেখ ফজলুল হক মণি সবাই জেলে। টাঙ্গাইলে লতিফ সিদ্দিকী এক বছর ধরে বিনা বিচারে ময়মনসিংহ জেলে। এ অবস্থায় ’৬৮ সাল ছিল আন্দোলনের বছর। আর সেই সময়ই সাদত কলেজের ভিপি খন্দকার আবদুল বাতেন, জিএস সোহরাব আলী খান আরজু। ভিপি হিসেবে খন্দকার বাতেন জিএস সোহরাব আলী খান আরজুর চাইতে বড় নেতা। কিন্তু সভা সমাবেশে সোহরাব আলী খান আরজুর বক্তৃতার পর ভিপি বাতেনের বক্তৃতা কেউ শুনত না, শুনতে চাইত না। তাই খন্দকার বাতেন আস্তে আস্তে কোণঠাসা বা ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছিলেন। শুধু খুঁটার জোরই সব নয় যোগ্যতাও লাগে। যতদিন যাচ্ছিল দুই উপদলের বিভক্তি বাড়ছিল। কোনোভাবে ’৬৮ শেষ হয়। ’৬৯-এ আন্দোলন আরও ক্ষুরধার হয়। ’৬৯-এর ৫ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে বিশ্বনাথের মৃত্যুতে টাঙ্গাইল জ্বলে ওঠে। আন্দোলন শতগুণ বেগবান হয়। আমি, আবু মোহাম্মদ আনোয়ার বক্স, আল মুজাহিদীর ভাই শামীম আল মামুন একই রাতে গ্রেফতার হই। খন্দকার বাতেন দুই দিন পর গ্রেফতার হয়ে আমাদের সবাই ময়মনসিংহ জেলে মিলিত হন। সেই প্রথম বুঝলাম লোকটি একেবারে শিশুর মতো। মায়ের জন্য তার কী কান্না যে কান্নার কথা লিখে বুঝানো যাবে না।

‘সংগ্রাম সংগ্রাম চলবেই চলবে’ এর মধ্যে দিয়েই ’৬৯-এর ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু মুক্ত হন। সব রাজবন্দীরা তখন মুক্ত বিহঙ্গের মতো ডানা মেলেছে, কারাগার খালি করে সবাই বেরিয়ে এসেছেন। এক নতুন নতুন হাবভাব, শেখ মুজিব ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়েছেন। আইয়ুবের গোলটেবিল ব্যর্থ হলে ইয়াহিয়া ক্ষমতায় আসেন। তিনি এসেই ঘোষণা করেন, ‘আমার ক্ষমতার লোভ নেই। নির্বাচন দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাব।’ আমরা বিশ্বাস করি এবং সেই মতো চর-ভর-পাহাড় ছুটে বেড়াতে থাকি। পাগলও অমন উন্মাদ হয় না যেমনটা তখন আমরা ছাত্র-যুবকরা হয়েছিলাম। জেলার সাদত কলেজ ছিল আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নামকরা। সারা টাঙ্গাইলের নেতৃত্ব দিত সাদত কলেজ। সেই নেতাদের মধ্যে খন্দকার বাতেনও ছিলেন। স্র্রোতিশ্বিনী নদীর পানির মতো দিনগুলো গাড়িয়ে যাচ্ছিল। ’৭০-এর নির্বাচনে এক অভাবনীয় ফল হয়, সব সিট পায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। দলীয় নেতার পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে গিয়ে বঙ্গবন্ধু হলেন জাতীয় নেতা, বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষার মূর্ত প্রতীক। নির্বাচনী ফলাফলে যা আশা করেছিলাম তা আমরা পেলাম না। ২৫ মার্চ হানাদার বাহিনী আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল যা ছিল আমাদের কল্পনারও বাইরে। নেতারা সব আমাদের ফেলেফুলে জীবন বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নেয়, কর্মীরাও যে পালায়নি তা নয়। সে এক দিশাহারা পাগলপ্রায় অবস্থা। বেশ লম্বা ছিলাম, বুদ্ধিসুদ্ধিও হয়তো তেমন ছিল না, মায়া-মমতায় ছিলাম ভরপুর, মা-বাবা-ভাই-বোন ছেড়ে পালাতে মন সায় দেয়নি তাই রুখে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সাধারণ মানুষের সাড়াও পেয়েছিলাম অভাবনীয়। মূলত পাহাড়ের সখিপুর, ভরের ভূঞাপুর-গোপালপুরকে বেইজ করে কাদেরিয়া বাহিনীর জন্ম। তখনো কাদেরিয়া বাহিনী হয়ে সারেনি। মুক্তিবাহিনী, কাদের সিদ্দিকীর বাহিনী এ রকম নামে আলোচনা হতো। মাথার দাম লাখ টাকা। এ রকম এক সময় বংশাই নদীর পাড়ে গোলাবাড়িতে খন্দকার আবদুল বাতেন বর্গার মনিটর কাশেমের সঙ্গে আমার কাছে আসেন। অনেক কথা হয়। কদিনের মধ্যেই বেশ কিছু অস্ত্র দিয়ে তাকে সাহায্য করব এমনটাই কথা ছিল। অস্ত্র গোলাবারুদ দিয়ে সাহায্য করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে সাহায্য করা যায়নি। ওরমধ্যেই তিনি ৭০-৮০ জনের একটা দল গড়েছিলেন। জুলাইয়ের দিকে আমাদের যখন ৪-৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা তখন কেদারপুর-লাউহাটির ক্যাম্প কমান্ডার লাবিবুর রহমানের সঙ্গে তার দলের সহকারী কমান্ডার শাহাজাদা ও শাজাহানের কথা হয় তারা কাদেরিয়া বাহিনীর সঙ্গে মিশে যাবেন। পরদিন মিশবে তাই আগেরদিন খাওয়ানোর জন্য ক্যাম্প কমান্ডার লাবিবকে নিমন্ত্রণ করেছিল। লাবিবুর রহমান আরও দুজন সঙ্গে নিয়ে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাওয়ার পথে বাতেনের দলের হাতে আক্রান্ত হয়। তাতে কমান্ডার লাবিব এবং জাহাঙ্গীর হোসেন তালুকদার নিহত হয়। স্বগোত্রীয়দের হাতে লাবিব, জাহাঙ্গীরই কাদেরিয়া বাহিনীর প্রথম শহীদ। অনেক ঘটনা। এরপর বলতে গেলে বাতেনের দল সারা যুদ্ধের সময় পালিয়ে বেরিয়েছে। একদিকে হানাদারদের ভয়, অন্যদিকে আমাদের। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি মুজিব বাহিনী গঠিত হয়। তার জেলা কমান্ডার আলমগীর খান মেনু, সহকারী খন্দকার বাতেন। যদিও কেউ টাঙ্গাইলে আসেনি, সবাই ছিলেন ভারতে। যুদ্ধ শেষে তারা ঢাকায় গিয়ে ৬০-৭০টা অস্ত্র জমা দেন। কিছুদিন পরেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ হয় এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করেন। খন্দকার আবদুল বাতেন হন জাসদের গণবাহিনীর টাঙ্গাইলের প্রধান। গণবাহিনীর হাতে কত আওয়ামী লীগ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা যে নিহত হয় তার কোনো হিসাব-নিকাশ ছিল না।

’৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্রও প্রস্তুত করেছিল জাসদের গণবাহিনী। সেই বাহিনীর টাঙ্গাইলের প্রধান ’৯২-’৯৩ সালে আবার আওয়ামী লীগে যোগদান করে। বাতেনের আওয়ামী লীগে যোগদানের পর যে মিষ্টি খাওয়া-খাওয়ি হয়েছিল তা দেখে দুঃখ-বেদনায় বুক ফেটে গিয়েছিল। এরপর আওয়ামী লীগ তাকে মনোনয়ন দেয় এমপি হন। এবারও একবার তাকেই নাকি মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। পরে মনা আর মকবুলের ছেলে ভাগিনা টিটুকে দেওয়া হয়। সেই খন্দকার আবদুল বাতেনের মৃত্যু সংবাদ শুনেছিলাম আ স ম আবদুর রব এবং আমি এক গাড়িতে। কী বিচিত্র! তবু মানুষ চলে গেলে তার কিছু থাকে না। আল্লাহর কাছে খন্দকার আবদুল বাতেনের মাগফিরাত কামনা করি। আল্লাহ তাকে বেহেস্তবাসী করুন- আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *