সৃজনশীল বইয়ের আকাল

বৈচিত্র ডেস্ক : অমর একুশে বইমেলা, বাঙালির শুদ্ধমননের ধারক ও বাহক। জ্ঞান আরোহণের এ মেলায় প্রতিদিনই প্রকাশ হয় শত শত বই। কিন্তু এসব বই আকৃষ্ট করতে পারছে না পাঠকদের। পাঠকরা এ স্টল থেকে ও স্টলে ঘুরে কিনছেন আগের প্রাকাশের সৃজনশীল বই-ই। পাঠকের ভাষ্যে মেলায় প্রচুর বই থাকলেও মানের বই নেহায়েতই কম। প্রকাশক লেখকরাও বিষয়টি স্বীকার করছেন। তবে ভালো মানের বইয়ের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় এটিকে কোনো ফ্রেমে আনা এখনি সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছেন প্রকাশকরা।

এবারের অমর একুশে বইমেলায় এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে প্রায় পাঁচ শতাধিক বই। কিন্তু এসব বইয়ের হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি বই আকৃষ্ট করতে পেরেছে পাঠকদের। বইপোকা পাঠকরা বলছেন, গত বছর মেলায় সাড়ে চার হাজার বই এসেছিল। সেখানেও ভালো মানের বইয়ের সংখ্যা ছিল কম।

প্রকাশকরা বলছেন, লেখকরা তাদের নিজেদের মতো করে লেখেন। তারা (প্রকাশকরা) শুধুমাত্র যেসব লেখক তাদের আয়ত্তে থেকে লেখেন তাদেরকে কিছু নির্দেশনা দিতে পারেন। তবে সেটি কতটুকু গ্রহণ করা হবে আর কতটুকু বর্জন করা হবে সে সিদ্ধান্ত লেখক নিজেই নিয়ে থাকেন। আর এ কারণে বইয়ের মান সম্পর্কে প্রকাশকরা পুরো দায় নিতে চান না।

মানসম্মত বই কম প্রকাশ হওয়ার কথা স্বীকার করলেন প্রকাশকরাও। এ প্রসঙ্গে উত্স প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী মোস্তফা সেলিম মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘পাঠকতো অবশ্যই ভালো লেখা চাইবে। তবে এখন বইমেলায় চার-পাঁচ হাজার করে বই আসলেও পাঠককে আকৃষ্ট করার মতো বই কিন্তু কম।

তিনি বলেন, ভালো বই, মন্দ বই যাচাই করার শেষ জায়গাটা হচ্ছে পাঠক। একজন পাঠকই ঠিক করবেন আসলে কোনটা বই কোনটা বই নয়। অনেক পাঠক আবার ভালো বই, মন্দ বই বাছাইয়ের যোগ্যতা রাখেন না। সেদিক বিবেচনায় ভালো বইগুলো প্রকাশকরাই বাছাই করবেন এবং পাঠকের সামনে তুলে ধরবেন। কিন্তু আমাদের দেশে প্রচুর প্রকাশক। প্রকাশকদের চিন্তাভাবনাও ব্যবসায়িক। এজন্য ভালো বই খুব কম বের হচ্ছে।

নতুন লেখকরা পাঠকের কাছে পৌঁছাতে না পারা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখনকার সাহিত্য হচ্ছে উপরতলার সাহিত্য, লেখকরাও শহর কেন্দ্রিক, লেখার মধ্যে তারা ফ্ল্যাটের বর্ণনা দেন, ট্রাফিক জ্যামের বর্ণনা দেন। তাদের লেখায় পরিবেশ থাকে না, প্রকৃতি থাকে না, সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র থাকে না, সংগ্রামী মানুষের জীবনকাহিনীও থাকে না। এজন্য পাঠক তাদের গ্রহণ করে না।

তবে প্রতিষ্ঠিত লেখকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের ভাষায়, এখনকার লেখকরা কম পড়ে বেশি প্রকাশ করতে চান। আর এ কারণে তাদের কলম দিয়ে ভালো লেখা বের হয়ও কম। এ ছাড়া যারা সম্পাদনার দায়িত্বে আছেন তারাও সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারছেন না বলে মনে করেন লেখকরা। তবে যারা বইয়ের মূল্যায়ন করবেন সে পাঠকরা এতকিছু বিচার করতে চান না।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় কবি তিথি আফরোজের সঙ্গে। এবারের বইমেলায় তার ‘তিথির তিরিশ’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, একজনকে লেখক হওয়ার আগে প্রচুর পড়তে হবে। একজন লেখকের লেখা দেখলে বুঝা যায় তিনি কতটা পড়ে থাকেন। বেশি পড়লে বেশি ভালো লেখা সম্ভব। আর তার মধ্য দিয়েই একজন লেখক পাঠকের কাছে যেতে পারেন। এ ছাড়া যারা সম্পাদনা করেন তারাও এখানে একটা বড় ভূমিকা রাখেন। তারা যদি ভালো গাইড করতে পারেন তবে সেটাও বেশ কাজে দেয়।

একাধিক পাঠকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মানসম্মত লেখা চান। তবে সে লেখা লেখক কিভাবে লেখেন আর প্রকাশক কিভাবে সম্পাদনা করেন তা বিচার করতে চান না তারা। মূলত সৃজনশীল, তথ্যবহুল, ঐতিহাসিক, জীবনমুখি বা ফিকশনধর্মী বই-ই বেশি চান পাঠক। বাজারে আসা বইয়ের মধ্যে সংখ্যার দিক দিয়ে এগিয়ে আছে কবিতার বই। তবে বিক্রিতে কবিতার চেয়ে এগিয়ে আছে এসব বই।

মেলা শুরুর পর গত কয়েকদিন ধরে পাঠকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা তাদের মনমতো বই কমই পাচ্ছেন। আবার অনেকে জানিয়েছেন, তারা বই কিনবেন পরে। আগে ভালো মানের বই বেছে রাখছেন। আর এজন্য প্রায় প্রতিদিনই তারা আসছেন মেলায়।

মেলায় কথা হয় হেনা মমো নামে এক পাঠকের সঙ্গে। সিলেট থেকে বই কিনতে বইমেলায় এসেছেন তিনি। হেনা মমো বলেন, বইমেলায় ১০টি স্টলে ঘুরলাম। অনেক বই দেখলাম। কিন্তু মানসম্মত বইয়ের দেখা খুবই কম। ভেবেছিলাম ২০-৩০ বই কিনব। কিন্তু কিনতে পারলাম না। মাত্র ৩টি বই কিনেছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষার্থী মিতু ইসলাম বলেন, মেলা শুরুর পর প্রতিদিনই আসছি। একশ’ এর বেশি বই দেখেছি। তবে ভালো বই পেয়েছি কম। এখনো পর্যন্ত পাঁচটি বই কিনেছি। এখন ভিড় কম। তাই ঘুরে ঘুরে দেখছি। কয়েকদিন সময় নিয়ে আরো বই কিনব।’

কাকলী প্রকাশনীর প্রকাশক এ কে নাছির আহমেদ সেলিম মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘ভালো লেখক সবাই হতে পারে না। এজন্য লেখকের ভেতরে সৃজনশীলতা থাকতে হয়। লেখকদের মধ্য থেকে ভালো লেখককে পাঠক ঠিকই খুঁজে নেয়। আবার লেখকে পাঠকের কাছে পৌঁছাতেও কিছু উদ্যোগ নিতে হয়।’

অন্যদিকে বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. নূহ-উল-আলম লেনিন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন অর রশিদ, কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সুভাষ সিংহ রায়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তোফায়েল আহমেদ এমপি।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ করেন মাকিদ হায়দার এবং ইকবাল আজিজ। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাহমুদা আখতার। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী ফাতেমা-তুজ-জোহরা, খায়রুল আনাম শাকিল, ইয়াকুব আলী খান, লীনা তাপসী খান এবং ক্যামেলিয়া সিদ্দিকা। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন স্বরূপ হোসেন (তবলা), গাজী আবদুল হাকিম (বাঁশী), রবিনস্ চৌধুরী (কি-বোর্ড), ফিরোজ খান (সেতার)। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের সাহিত্যকর্ম বিষয়ে আলাপনে অংশ নেন জাকির তালুকদার, নাসিমা আনিস, বিধান রিবেরু, তিথি আফরোজ এবং গিরিশ গৈরিক। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সায়েরা হাবীব।

লেখক বলছি কর্ণার: এ বছর ভালো মানের ৫ জন লেখককে ২০ মিনিট করে নিজের বই নিয়ে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছে মেলা আয়োজক কর্তৃপক্ষ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লেক পাড়ে ‘লেখক বলছি’ কর্নারের এ আয়োজনে সোমবার নিজেদের সাহিত্যকর্ম বিষয়ে আলাপনে অংশ নেন গিরিশ গৈরিক (বই: বৈঠকখানায় কবি), জাকির তালুকদার (বই: গল্পের জার্নাল), তিথি আফরোজ (বই: তিথির তিরিশ), নাসিমা আনিস (বই: বৃহন্নলা বৃত্তান্ত) এবং বিধান রিবেরু (বই: চলচ্চিত্র বোধিনী)। প্রত্যেকেই তাদের বইয়ের ওপর ২০ মিনিট কথা বলেন। এরপর চলে পাঠক প্রশ্নোত্তর পর্ব।

নিজের বই সম্পর্কে কবি তিথি আফরোজ জানান, আমি আমার লেখার মধ্য দিয়ে মূলত মানুষের সংকট, সংকীর্ণতা, বহুরূপী প্রবণতা তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি।

নতুন বই : বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্যমতে গতকাল মেলার চতুর্থ দিনে বই প্রকাশিত হয়েছে ১৪১টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো গ্রন্থকুটির এনেছে মোহীত উল আলমের উপন্যাস ‘মুরলী’, জ্যোতি প্রকাশ এনেছে ড. তপন বাগচীর সমালোচনা গ্রন্থ ‘মহসিন হোসাইনের কবিতার বিষয় ও শরীরী নির্মণ’ হাওলাদার প্রকাশনী এনেছে নীরা কাদরীর আবৃত্তির বই ‘আবৃত্তির নির্বাচিত কবিতা’, পালক পাবলিশার্স এনেছে কাজী খলীকুজ্জামান আহমদের প্রবন্ধ ‘অবস্থা বদলের জন্য ব্যবস্থা বদলের সন্ধানে’, নাগরী এনেছে আবু হাসান শাহরিয়ারের কাব্যগ্রন্থ ‘বিমূর্ত প্রণয়কলা, অন্যপ্রকাশ এনেছে শিহাব শাহরিয়ারের কাব্যগ্রন্থ ‘পড়ে থাকে অহঙ্কার, ইমদাদুল হক মিলনের গল্পের বই ‘ফেলে যাওয়া রুমালখানি, নাসরীন জাহানের উপন্যাস ‘সিসেমের দ্বিতীয় দরজা, পাঞ্জেরী এনেছে সাইফুল্লাহ মাহমদু দুলালের কবিতার বই ‘প্রেমের আগেই পড়েছি বিরহে’, নবযুগ প্রকাশনী এনেছে সনজীদা খাতুনের প্রবন্ধ ‘নজরুল মানস’, অনন্যা এনেছে কনকচাঁপার গল্পের বই ‘কাঁটাঘুড়ি-২. সৈয়দ শামসুল হকের কবিতার বই ‘নায়লন গোলাপ টেবিলে’ মোস্তফা মামুনের কিশোর উপন্যাস ‘রাজু ভাই-মাইনাস শেলী আপা’ ইত্যাদি।

আজকের অনুষ্ঠানসূচি: আজ ৫ ফেব্রুয়ারি, অমর একুশে গ্রন্থমেলার পঞ্চম দিন। মেলা চলবে বেলা ৩:০০টা থেকে রাত ৯:০০টা পর্যন্ত। বিকেল ৪:০০টা গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘কবি সিকান্দার আবু জাফর: জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন কবি নাসির আহমেদ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন অধ্যাপক রফিকউল্লাহ খান, ড. শিরীণ আখতার এবং কবি বায়তুল্লাহ কাদেরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, কবিতা-আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *