জৈব কৃষির গ্রাম

শাইখ সিরাজ : জানুয়ারির শেষ। মাঘের মাঝামাঝি। নরম রোদের শেষ দুপুরে চিত্রা নদীর তীরে তখন মাঠে মাঠে কর্মচাঞ্চল্য। ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ উপজেলার এ অঞ্চলটি কৃষিবৈচিত্র্যে বেশ সমৃদ্ধ। মাঠভর্তি নানান ফসল। শীতের সবজি, আখ, পানের বরজ, পেয়ারা বা কুলের বাগান, আবার মাঠের কোথাও হলুদে হলুদে সয়লাব গাঁদা ফুলে। অপেক্ষাকৃত নিচু জমিতে লাগানো হচ্ছে বোরো ধান। সবজি, ফুল, ফল বাড়ির আঙিনা থেকে নেমে এসেছে কৃষির মাঠে। সব ফল-ফসলই চাষ হচ্ছে এখানে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। কৃষক ভিন্ন ভিন্ন জাতের ফল ফসলের চাষের মধ্য দিয়ে তৈরি করে নিচ্ছে নিজস্ব অর্থনীতি। কখন কোন ফসল চাষ করবে, সে সিদ্ধান্ত সে নিতে শিখেছে বুঝে-শুনে। কৃষক জানে মাটিই তার জীবিকার উৎস। মাটি থেকেই উৎপাদন হয় সোনার ফসল। তাই সচেতন হচ্ছে মাটির যতে। রাসায়নিক সার প্রয়োগ কমিয়ে জৈবসার ব্যবহারেও বেশ উদ্যোগী হয়ে উঠছে তারা। গ্রামীণ প্রকৃতির ভিতর দিয়ে চলতে চলতে এসবই ভাবছিলাম। আমাদের গন্তব্য মহেশ্বরচাঁদা গ্রামে। এ গ্রাম এবং তার আশপাশের কয়েকটি গ্রামে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সারের বাণিজ্যিক উৎপাদন ইতিমধ্যে সারা দেশে সাড়া জাগিয়েছে।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম গানে গানে বলেছিলেন, ‘খাঁটি সোনার চাইতে খাঁটি আমার দেশের মাটি।’ কিন্তু সেই মাটি তার খাঁটিত্ব হারাচ্ছে অধিক কর্ষণে, অপরিকল্পিত চাষাবাদে। ক্রমেই কমে যাচ্ছে মাটির উর্বরতা। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭৯.৪৬ লাখ হেক্টর জমি আবাদযোগ্য। আর এ আবাদযোগ্য মাটির জৈব-পদার্থই মূলত মাটির প্রাণ; যা মাটির ভৌত, রাসায়নিক এবং জৈবিক ধর্ম টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। মাটিতে জৈব উপাদানের পরিমাণ শতকরা ৫ ভাগ। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকার মাটিতে জৈব-পদার্থ নেমে এসেছে শতকরা ১ ভাগের নিচে; যা ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে এক বিরাট হুমকি। এর প্রধান কারণ হলো উত্তরোত্তর ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি, উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল সম্প্রসারণ ও মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সারের প্রয়োগ। এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। জৈবসারের গুরুত্ব বোঝাতে গ্রামে গ্রামে চলছে জৈবসার উৎপাদন কার্যক্রম। তেমনি একটি উল্লেখযোগ্য এলাকা ঝিনাইদহের কালিগঞ্জের মহেশ্বরচাঁদা গ্রাম। এখানে প্রতি বাড়িতে কৃষক তৈরি করছেন কেঁচো সার। ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সারের বাণিজ্যিক উৎপাদনের বিষয়টি এক যুগ আগেও সাধারণ কৃষক তথা গ্রামীণ জনসাধারণের কাছে ছিল অনেকটাই অজানা। পাঠক, মনে পড়ছে সেই আশির দশকে ‘মাটি ও মানুষ’ করার সময় থেকে জৈবসারের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে কৃষককে অবিরত বলে এসেছি এবং পরবর্তীতে ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রথম থেকেই এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণ প্রচারণা চালিয়ে এসেছি। যেখানে আপনারা দেখেছেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া, মানিকগঞ্জের শিবালয়, নরসিংদীর বেলাব, রায়পুরাসহ বিভিন্ন উপজেলায় গ্রামীণ নারীদের মাধ্যমে ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে কেঁচো সার উৎপাদন কার্যক্রম। আর এখন সারা দেশেই কমবেশি উৎপাদন হচ্ছে কেঁচো সার। গ্রামে গ্রামে নারীরা এ কাজে যুক্ত হয়েছেন। তারা বিষমুক্ত ফসল ফলাচ্ছেন। এতে মিটছে তাদের পারিবারিক পুষ্টিচাহিদা। আর অতিরিক্ত ফসল বিক্রি করে আসছে বাড়তি আয়। যে কারণে কোনো কোনো গ্রামের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এ কেঁচো সার।

মহেশ্বরচাঁদা গ্রামে এর আগেও একবার এসেছিলাম। তখন দেখেছিলাম মাটিকে বাঁচানোর মহৎ চিন্তা তাদের কাছে কতটা সুস্পষ্ট। আজ সাত-আট বছর পর আবারও এ গ্রামে এসে অন্যরকম লাগছে সবকিছু। মনে হচ্ছে এ গ্রামের মাটি, প্রকৃতি, কৃষি-ফসল আর মানুষ যেন একে অন্যের ভাষা বোঝে। সঙ্গে আছেন স্থানীয় এস এম শাহিন হোসেন। তিনি একটি বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। শাহিন জানালেন, মহেশ্বরচাঁদা ও দাকোপ গ্রাম থেকে জৈবসার যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি দেশের বাইরেও রপ্তানি হচ্ছে এখানকার নারীদের উৎপাদিত জৈবসার।

মহেশ্বরচাঁদা গ্রামে যখন পৌঁছলাম তখন সূর্য অনেকখানি পশ্চিমে হেলে পড়েছে। হালকা কুয়াশা ছেয়ে গেছে দূরের ঘরবাড়ি। এ গ্রামের গৃহিণী শাহনাজ পারভীন তখন ব্যস্ত জৈবসার তৈরির নানান সরঞ্জাম নিয়ে তার বাড়ির নিজস্ব আঙিনায়। কথা হলো তার সঙ্গে। জানালেন জৈবসার কীভাবে পাল্টে দিল তার জীবন-সংসার। একসময়ের হতদরিদ্র শাহনাজ পারভীনের জীবন বদলে গেছে কেঁচো সার উৎপাদন করে। ছনের ঘরের ভিটেতেই উঠেছে বিল্ডিং ঘর। শুধু তাই নয়, ঘরের ভিতর টাইলসের ফ্লোর। আর এ বিল্ডিংয়ের সামনে এখন তার কেঁচো সার উৎপাদন কারখানা।

জানতে চাই শাহনাজ বেগমের আয়-ব্যয়ের সামগ্রিক হিসাব। তিনি জানালেন, শুধু কেঁচো সার বিক্রি করেই মাসে গড় আয় আসে প্রায় ১০ হাজার টাকা। মাসে ১৫ মণ কেঁচো সার উৎপাদন করেন তিনি। আর কেঁচো বিক্রি করেন প্রতি মাসে প্রায় ১০ কেজি। শাহনাজ বলছিলেন, নিজের জমিতেও তিনি জৈবসার ব্যবহার করেন। ফলে জমিতে সেচ লাগে কম। ২৫ কাঠা জমিতে সেচ দিতে প্রয়োজন পড়ে মাত্র আধা লিটার জ্বালানি তেলের।

পাশেই ছিলেন শাহনাজ বেগমের শাশুড়ি রেবেকা বেগম। যিনি পারিবারিক চরম সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিলেন এই কেঁচো উৎপাদন করে। এ জৈবকৃষির অভিযান থেকে মিলেছে তার সামাজিক স্বীকৃতিও। পেয়েছেন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সনদ, ক্রেস্ট ও পুরস্কার।

শুধু শাহনাজ আর রেবেকাই নন, জৈবসার উৎপাদন করে সুলতানা, মরিয়ম, মিলি, সহিরনসহ অসংখ্য নারী এখন স্বাবলম্বী। মহেশ্বরচাঁদা গ্রামের ৯৬টি পরিবারের মাঝে ৯৩টি যুক্ত হয়েছে জৈবসার উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আঙিনা, গোয়ালঘর বা পরিত্যক্ত জায়গা সব জায়গায় মাটির চাড়ি বসিয়ে উৎপাদন হচ্ছে কেঁচো কম্পোস্ট সার। এতে সৃষ্টি হয়েছে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান, একই সঙ্গে গ্রামবাসী ফিরে পাচ্ছে জমির উর্বরতা, মিলছে বিশুদ্ধ ফসল আর কমছে উৎপাদন খরচ।

দেখলাম একটি রাইস মিলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে একটি গরুর খামার। খামারটিতে গরুর খাবার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে মিলের তুষ ও খুদ। গরুর গোবর ব্যবহার হচ্ছে বায়োগ্যাস উৎপাদনে; যা দিয়ে মিটছে রাইস মিলের কর্মীদের রান্নার জ্বালানি। আর গোবরের স্লারি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে কেঁচো সার। সব মিলে দারুণ এক উৎপাদন চক্র এখানে।

জৈবকৃষি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের তাগিদ এখন গোটা এলাকার কৃষকের কাছেই পৌঁছে গেছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এগিয়ে এসেছেন। একেকজন নারী অদূর ভবিষ্যতে পরিণত হবেন একেকজন সফল কৃষি উদ্যোক্তায়। তাদের অবদানে সোনাফলা হয়ে উঠবে এ অঞ্চলের মাটি। ঘরে ঘরে আসবে সচ্ছলতা। ঝিনাইদহের কালিগঞ্জে জৈবসার উৎপাদন যতটা আশার সঞ্চার করেছে তার চেয়েও সুসংবাদ হলো এ জেলার সব এলাকাতেই ছড়িয়ে পড়ছে বিষমুক্ত সবজি চাষের অনুশীলন; যা আগামী দিনে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি জরুরি। আশা করি সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন দেশের কোনো কৃষকই আর মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক কিংবা রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভর করবেন না। বরং মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও বিশুদ্ধ সবজি উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠবেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *