ইউক্যালিপটাসের থাবায় বিপন্ন প্রকৃতি-পরিবেশ

বৈচিত্র ডেস্ক : পরিবেশের বন্ধু গাছ। মানুষেরও বন্ধু। মানুষ ও প্রকৃতি থাকে কাছাকাছি। গাছ মানুষকে বাঁচার অক্সিজেন দেয়, ছায়া দেয়, ফল দেয়। গাছ নিজেকে বিলিয়ে দেয় মানুষের কল্যাণে। কিন্তু সেই গাছই যদি প্রকৃতির জন্য, মানুষের জন্য আগ্রাসী-প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে তাহলে তা আতঙ্কের বিষয়। এমনই এক প্রাণঘাতী গাছ পরদেশি ’ইউক্যালিপটাস’। এই গাছের প্রভাবে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। খেয়ে ফেলছে মাটির উর্বরা শক্তি। নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। এসব কারণেই বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ‘ইউক্যালিপটাস’। কিন্তু আশঙ্কার কথা, নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও থেমে নেই ইউক্যালিপটাসের রোপণ।

সবচেয়ে বেশি ইউক্যালিপটাস চোখে পড়ে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে। রাস্তার ধারে, আবাদী জমি, ধান ক্ষেতের আইলের ধারে, পুকুরের চারপাশে, উঠানে ব্যাপক হারে চলছে ইউক্যালিপটাসের চাষ। এক দশক আগে সরকার ইউক্যালিপটাস রোপণ করা নিষিদ্ধ করলেও এখনো ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, বগুড়া, জয়পুরহাট, নীলফামারী, সৈয়দপুর, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুরসহ বহু জেলায় বাণিজ্যিকভাবে চারা উত্পাদন ও রোপণ করা হচ্ছে।

উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, ইউক্যালিপটাস, আকাশমনি ও ইপিলইপিলের মতো বিদেশি দ্রুত বর্ধনশীল প্রজাতির গাছ মাটির ৫০-৬০ ফুট নিচ পর্যন্ত পানি শোষণ করে তা বাতাসে ছেড়ে দেয়। ফলে পানিশূন্যতা দেখা দেয় মাটিতে। এই গাছ মাটিকে পানিশূন্য ও অনুর্বর করে ফেলে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ রহিম বলেন, ইউক্যালিপটাস জিরোপেট্রিক ন্যাচারের গাছ বিধায় সে মাটির গভীর থেকে পানি শোষণ বেশি করে। এটি দ্রুত বর্ধনশীল। গাছটি ১৫/২০ বছর কোনো স্থানে থাকলে সেখানে অপর প্রজাতির কোনো গাছ জন্মাতে অসুবিধার সৃষ্টি করে। কারণ পাতার টক্সিক কেমিক্যাল মাটিতে থাকা নাইট্রোজেন পরমাণু ভেঙে দিয়ে ছোট ছোট উদ্ভিদের খাদ্য তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করে। এতে মাটির পুষ্টি-প্রবাহও নষ্ট হয়। এই গাছের প্রভাবে এখন তো দেশি ফলের গাছগুলো একে এক নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।

ইউক্যালিপটাসের আদিবাস অস্ট্রেলিয়ায়। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন প্রকল্প (ইউএনডিপি) এর উদ্যোগে ইউক্যালিপটাসসহ বিভিন্ন বিদেশি দ্রুত বর্ধনশীল প্রজাতির গাছ আমাদের দেশে আসে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে উপজেলা পর্যায়ের ‘সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি’ এবং সরকারের বন বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইউক্যালিপটাস, আকাশমনি, পাইন ইত্যাদি বিদেশি গাছ ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়েছে। বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, রংপুর প্রভৃতি অঞ্চলগুলোতে এ গাছের চারা প্রথমে প্রথম ব্যাপকভাবে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। বাংলাদেশের জলবায়ু, মাটি ও কৃষি জমিতো বটেই দ্রুত বর্ধনশীল এই গাছটি পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। সাধারণ মানুষের উপর একসময় ইউক্যালিপটাস চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা ছাড়াই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *