কীটনাশকের নাশকতায় ক্ষতিগ্রস্ত ফুল ও ফসল

বৈচিত্র ডেস্ক : কীটপতঙ্গ প্রকৃতির সম্পদ। এরা আমাদের প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। মানুষের জন্য উপকারী ও অপকারী, দুই ধরনেরই কীটপতঙ্গ রয়েছে।

উপকারী কীটপতঙ্গ সাহায্য করে পরাগায়নে কিংবা মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র ও বসতি তৈরির কাজে। মৌমাছি গড়ে তোলে মৌচাক; রেশম পোকা তৈরি করে রেশমি সুতার পুত্তলি, আর প্রবাল কীট মরে গিয়ে প্রবালদ্বীপ হয়ে জেগে ওঠে সাগরের বুকে।

আবার অপকারী পোকা ফুল-ফল, সবজি বাগান ও ফসলের ক্ষেতের জন্য বিপদ ডেকে আনে। এরা প্রকৃতির সাজানো বাগান আর মানুষের পরিশ্রমে গড়ে ওঠা ফসলের মাঠকে বিরান করে দিতে পারে। পঙ্গপালের আক্রমণ একটা দেশের ফসল ধ্বংস করে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করতে পারে। আবার মশা-মাছি, ছারপোকা এসব কীটপতঙ্গ বহন করে নানা রোগজীবাণু।

আঠারো শতকের মাঝামাঝি থেকে মানুষ ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। ফলে কীটপতঙ্গ দমনে নানা উপায় খুঁজতে শুরু করে। প্রথম তারা এ কাজের জন্য ব্যবহার করতে থাকে গবাদিপশুর মূত্র বা তামাকপাতাসহ নানা প্রাকৃতিক উপাদান।

কিন্তু ‘কীটনাশক’ বলতে আজ কেবল রাসায়নিক কীটনাশককে বোঝায়। ‘কীটনাশক’ ছড়ানোর পর তা গাছের কাণ্ড ও পাতায় লেগে থাকে। কিছু কীটপতঙ্গ সেসব গাছের কাণ্ড বা পাতার রস চুষে খায়। তখন কীটনাশকের সূক্ষ্ম কণাগুলো কীটপতঙ্গের দেহে প্রবেশ করে এদের মৃত্যু ঘটায়। আবার যেসব কীটপতঙ্গ গাছের কাণ্ড বা পাতা খায় না কিন্তু সংস্পর্শে আসে, এদের লোমকূপ দিয়ে কীটনাশক ঢুকে পড়ে; ফলে পতঙ্গগুলো মারা যায়। রাসায়নিক কীটনাশক দীর্ঘ সময় কাজ করে বলেই পোকার আক্রমণের মুখেও গাছ বা ফসলকে রক্ষা করা যায়।

কীটনাশক তৈরি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। বস্তুত এ সময় ডিডিটি ও বিএইচসি নামে দুটি রাসায়নিক কীটনাশক বিশ্বজুড়ে বিস্ময় সৃষ্টি করে।

ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ দমনে এ দুটি কীটনাশক অবিশ্বাস্য রকমের ফল দেয়। আর তাতে রক্ষা পায় বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, ফুল ও ফলের বাগান। ঘাতক মশা-মাছির হাত থেকেও রক্ষা পায় মানুষ। এতে প্রতিহত হয় নানাবিধ রোগের বিস্তার। কিছু দিনের মধ্যেই ডিডিটি ও বিএইচসি প্রাণিজগতের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দেয়।

এসব কীটনাশকের বিষে কেবল অপকারী কীটপতঙ্গই মরেনি, মরেছে অগণিত উপকারী কীটপতঙ্গ। কীটনাশকের বিষে মরা কীটপতঙ্গ খেয়ে মরেছে পাখি। ধান, পাট ও গমের ক্ষেতে ছিটানো কীটনাশকের বিষ বৃষ্টি, সেচ ও বানের পানিতে পুকুর ও জলাশয়ে গিয়ে পড়েছে, ফলে মরেছে মাছ। আর সেসব মাছ খেয়ে মানুষ ভুগেছে নানা জটিল ও কঠিন রোগে।

আবার দেখা যায় ডিডিটি প্রকৃতিতে কোনোভাবেই বিনষ্ট হয় না, এদের বিষক্রিয়া থেকে যায় যুগ যুগ ধরে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ডিডিটির ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। পরবর্তীতে ভারত ব্যতীত পৃথিবীর সব দেশ ডিডিটি নিষিদ্ধ করে।

সব ধরনের পেস্টিসাইড বা বালাইনাশক মূলত বিষ যা ব্যবহৃত হয় ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড়, জীবাণু, আগাছা ও ইঁদুর দমনের জন্য। বিভিন্ন প্রকার পেস্টিসাইডের মধ্যে রয়েছে ইনসেক্টিসাইড বা কীটনাশক, ফানজিসাইড বা ছত্রাকনাশক, উইডিসাইড/হার্বিসাইড বা আগাছানাশক, মাইটিসাইড বা মাকড়সানাশক এবং রোডেন্টিসাইড বা ইঁদুর মারার বিষ।

বাংলাদেশে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে কীটনাশক ব্যবহার হয় ১৯৫১ সালে। ১৯৫৬ সালে সরকার বাংলাদেশ ভূখণ্ডের জন্য দুই টন কীটনাশক আমদানি করে। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত কীটনাশকে শতভাগ ভর্তুকি দেয়। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে ১৯৮০ সাল থেকে বেসরকারি খাতে কীটনাশক আমদানির অনুমতি দেয়।

শুরুর দিকে কীটনাশক ব্যবহার কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয় করার জন্য সরকারের একটি স্লোগান ছিল- ‘বোকার ফসল পোকায় খায়’। সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রচারণায় স্বল্প সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বালাইনাশকের ব্যবহার। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০, এ সময়ে বাংলাদেশে কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ে প্রায় দ্বিগুণ। ১৯৮৫-৮৬ সালে ব্যবহৃত কীটনাশকের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬৩ মেট্রিক টন যা ১৯৯০-৯১ সালে বেড়ে হয় ৬ হাজার ৯৪৮ মেট্রিক টন। ১৯৯৯ সালে দেশে বালাইনাশক ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৩৪০ টন যা ২০০৮ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ হাজার ৬৯০ মেট্রিক টনে। যদিও ২০১৭ সালে এ পরিমাণ কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৩৭ হাজার ২৫৮ মেট্রিক টনে। এ হিসাবের বাইরে প্রতি বছর চোরাইপথে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে আসছে প্রচুর পরিমাণ কীটনাশক যেগুলো পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে কৃষি জমির জীববৈচিত্র্যের যে চিত্র উঠে আসে- তা এক কথায় ভয়াবহ। কৃষি জমি বিশেষ করে ধানের জমিতে একসময় শামুক-ঝিনুক ও বিভিন্ন ধরনের ছোট মাছ দেখা যেত। এখন এগুলো অনেকটা অনুপস্থিত।

প্রকৃতির লাঙল বলা হয় যে কেঁচোকে তাও এখন আর কৃষি জমিতে পাওয়া যায় না। ফসলের জমিতে পোকামাকড় খাওয়ার জন্য পাখ-পাখালির বিচরণ কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। ফসলের মাঠে ফুল থেকে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌমাছি আর ভ্রমরের গুঞ্জনও কমে গেছে নানাবিধ বিষাক্ততায়। এছাড়াও কৃষি পরিবেশে বিদ্যমান নানা সরীসৃপ আজ বিলুপ্তপ্রায়।

ইতিমধ্যে ১২ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণীর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ফসলের জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ অব্যাহতভাবে কমে যাওয়ায় এবং রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহারে মাটিতে বিভিন্ন উপকারী অনুজীব আর বেঁচে থাকতে পারছে না। অন্যদিকে, অব্যাহতভাবে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে নতুন প্রজাতির পোকার জন্ম হচ্ছে, যা প্রচলিত মাত্রায় কীটনাশক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

সাম্প্রতিক সময়ে ফসলের জমিতে আগাছানাশকের ব্যাপক ব্যবহার বিভিন্ন উদ্ভিদ প্রজাতিকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাছানাশকের ব্যবহারের কারণে ভবিষ্যতে নতুন প্রজাতির আগাছার উদ্ভব ঘটবে যা কোনোভাবেই দমন করা যাবে না।

দেশে ব্যবহৃত কীটনাশকের মধ্যে কয়েকটি অতি উচ্চমাত্রায় বিষাক্ত যেগুলো মানুষ ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত কীটনাশকগুলো ‘ডার্টি ডজন’, ‘পপস্’ বা ‘ন্যস্টি নাইন’ নামে পরিচিত। এদের সংখ্যা ৯ থেকে ১৮টি। শিল্পোন্নত বিভিন্ন দেশে রেসিডুয়াল ইফেক্টের কারণে এসব বালাইনাশক নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশে এর অনেকগুলো বিদ্যমান রয়েছে।

এছাড়াও ইউরোপসহ উন্নতবিশ্বে লাল তালিকাভুক্ত চরম বিষাক্ত কীটনাশক নিষিদ্ধ। আমাদের দেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অধিক মুনাফার আশায় এসব অতি ক্ষতিকর কীটনাশক আমদানি ও বাজারজাত করছে।

কীটনাশকের নাশকতায় উপকারী ও অপকারী দু’ধরনের কীটপতঙ্গ মরছে। মরছে সাপ, ব্যাঙ ও মাছ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে এসব প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। জীবজগতের খাদ্যশৃঙ্খলে এরা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। কীটপতঙ্গ দমনে এক সময় ঐতিহ্যবাহী লোকজ জ্ঞানের ব্যবহার করে প্রতিবেশের ভারসাম্যের কাজ সুন্দরভাবে চালান যেত।

আশার কথা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এবং অনেক এনজিওর উদ্যোগে কৃষি কাজে সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এতে কৃষকের খরচও কমবে এবং পরিবেশ ভালো থাকবে। এই লোকজ জ্ঞানের মধ্যে রয়েছে- ক্ষেতে কঞ্চি ও ডালপালা ইত্যাদি পুঁতে রাখলে তাতে পাখি বসে ক্ষেতের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেতে পারে। কুপি বা মশাল জ্বালিয়ে পোকা ফাঁদে ফেলে মারা প্রভৃতি। পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশে সমন্বিত বালাই দমন আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *