নারী দিবস আসে, নারী দিবস যায়

তসলিমা নাসরিন:

আজকাল নানারকম দিবস উদযাপন করে মানুষ। শিশু দিবস, পঙ্গু দিবস, শ্রমিক দিবস, বাবা দিবস, মা দিবস ইত্যাদি। প্রতিটি দিবসের উদ্দেশ্য, এরা অর্থাৎ শিশু, পঙ্গু, শ্রমিক, বাবা, মা যথেষ্ট মর্যাদা পায় না, এদের প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া উচিত। নারী দিবসও এমন একটি দিবস। নারীরা সমাজে শিশু বা পঙ্গু বা শ্রমিকের মতোই অসহায়, দুর্বল। সে কারণেই নারীকে কিছুটা অনুকম্পা করার দায় অনুভব করেছে সুশীল সমাজ। মনে আছে আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে আমি ‘জরায়ুর স্বাধীনতা’ দাবি করেছিলাম। ‘জরায়ুর স্বাধীনতা’- এই শব্দ-যুগল পুরুষতন্ত্রের মসনদ কিছুটা কাঁপিয়ে দিয়েছিল। লক্ষ মৌলবাদী পথে নেমে পড়েছিল। তসলিমাকে হাতের কাছে পেলে ছিঁড়ে খাবে। ওরা না হয় অভদ্র, ভদ্র পুরুষেরা কী করছিল তখন? তারা কি আমার গুণ গাইছিল? না, কেউই গায়নি। তারা বন্ধ ঘরে বসে তসলিমার মুণ্ডুপাত করছিল। আর মৌলবাদীরা বাইরের খোলা হাওয়ায়, সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়েই তসলিমার মুণ্ডুুপাত করছিল। জরায়ুর স্বাধীনতা বলতে আমি ঠিক কী বুঝেছি দিকে দিকে এই কৈফিয়তও আমাকে দিতে হয়েছে। আমি সবিনয়ে বলেছি, মেয়েরা তাদের নিজের জরায়ুতে কতগুলো সন্তান ধারণ করবে, আদৌ সন্তান ধারণ করবে কিনা, সন্তান পুত্র নাকি কন্যা, তাছাড়া কোন পুরুষের বীর্য নেবে, কোন পুরুষের বীর্য নেবে না- এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার নামই জরায়ুর স্বাধীনতা। আমার ব্যাখ্যা মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছিল। ভদ্র, অভদ্র, শিক্ষিত, অশিক্ষিত সব পুরুষই একযোগে তসলিমা-বিরোধী হয়ে উঠেছিল, কারণ তারা বিশ্বাস করে নারীর শরীরের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ওপর, মোদ্দা কথা, নারীর আপাদমস্তকের ওপর, অধিকার সম্পূর্ণই পুরুষের, পুরুষের একা। নারীর শরীরের ওপর নারীর অধিকার নেই, থাকা উচিত নয়, যে নারী অধিকার চায়, সে নারী নষ্টা। আমাকে ‘বেশ্যা’ বলেই চিহ্নিত করেছিল বাংলাদেশের সমাজ, যদিও আমি ছিলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তার, বাক-স্বাধীনতায় এবং মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী দেশের একজন জনপ্রিয় লেখক।

‘বেশ্যা’ শব্দটি সব ধরনের পুরুষই সাহসী মেয়েদের ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্য, কেঁচোর মতো নিজেকে গুটিয়ে গর্তে ফেরত যাওয়ার জন্য মেয়েদের উদ্দেশে উচ্চারণ করে। পুরুষের শারীরিক তৃপ্তির জন্য প্রতারিত, প্রত্যাখ্যাত, দরিদ্র, দুর্বল মেয়েদের পুরুষের যৌনদাসী বানানো হয়েছে, যাদের পুরুষেরা ‘বেশ্যা’ নামে ডাকে। আবার সমাজের যে মেয়েরা পুরুষের যৌনদাসী হতে অস্বীকার করে, শিক্ষিত হয়ে স্বাবলম্বী হয়ে মাথা উঁচু করে চলে, নিজের যুক্তিবুদ্ধিতে উজ্জ্বল যে মেয়েরা, পুরুষসৃষ্ট বৈষম্যকে যে মেয়েরা মানে না, পুরুষ-নির্ভর নয় যে মেয়েরা, যে মেয়েরা মনে করে তাদের শরীরের ওপর অধিকার তাদেরই, পুরুষের নয়, সেই মেয়েদের ওপর পুরুষের বড় রাগ, রাগ করে তাদেরও তারা ‘বেশ্যা’ বলে ডাকে।

শুধু মৌলবাদীরা নারীবিরোধী বা নারীবিদ্বেষী নয়, প্রায় সব পুরুষই নারীবিরোধী এবং নারীবিদ্বেষী। যারা মৌলবাদীদের বিপক্ষে, তারাও। যারা নারীর সঙ্গে প্রেম করে, তারাও। যারা নারীকে নিয়ে ঘর-সংসার করে, তারাও। আমি নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছি, মৌলবাদীরা যতটা ঘৃণা নারীকে করে, তার চেয়ে কিছু কম ঘৃণা ভদ্রলোকেরা করে না।

এখনকার আধুনিক শিক্ষিত মেয়েরা প্রায় গণহারে হিজাবি হয়ে উঠেছে। ওদের হিজাবি হওয়ার পেছনে মৌলবাদীদের ভূমিকা আছে, তবে দুঃখ এই, ওদের হিজাবের আগ্রাসন থেকে মুক্ত করার জন্য কোনও ভূমিকাই ভদ্রলোকেরা পালন করছেন না। তাহলে ভদ্রলোকেরাই কি ভিতরে ভিতরে এক একজন মৌলবাদী নয়? একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষের অস্তিত্ব যখন নানারকম কায়দা কৌশল করে যৌন-বস্তুতে নামিয়ে আনা হয়, তখনই বাড়তি কাপড়ে তার গা ঢাকতে হয়। মেয়েরা হিজাবি হয়েছে সম্ভবত ‘বেশ্যা’ নামের গালি থেকে এবং ধর্ষণ থেকে নিজেদের বাঁচানোর জন্য। কিন্তু তাতে কি বাঁচে সবাই? পুরুষের নিজেদের স্বার্থে মেয়েদের কাউকে ‘বেশ্যা’ বানায়, কাউকে ‘বেশ্যা’ বলে গালি দেয়। আমি বহু বছর থেকে মেয়েদের বলছি এই গালিকে তারা যেন ভয় না পায়, যেন ভড়কে না যায়, যেন যে পথে দ্বিধাহীন চলছিল, সে পথেই দ্বিধাহীন চলে।

বাঙালি সমাজ কী ভয়ঙ্করভাবে নারীবিদ্বেষী, তা কি আমার জীবনের ইতিহাস দিয়েই বোঝা যায় না? আমার কি প্রতিবছর চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে নিজেকে, যে, এই দেখ, আমি কোনও খুন করিনি, ধর্ষণ করিনি, চুরি ডাকাতি করিনি, দুর্নীতি করিনি, কারও কোনও ক্ষতি করিনি, কাউকে মারধর করিনি, কারও ওপর অন্যায় করিনি, শুধু নারীর অধিকার নিয়ে বই লিখেছি বলে নির্বাসন দন্ড পেয়েছি। নারীর সমান অধিকার যে তন্ত্রমন্ত্রগুলো মানে না, সেগুলোকে শ্রদ্ধা না করার জন্য বলেছি বলে নির্বাসন দন্ড পেয়েছি আমি। সমাজ যদি সভ্য হতো, কোনও নারীবাদী লেখককে নির্বাসনে যেতে হতো না। নারীবিদ্বেষী সমাজই নারীবাদী লেখককে নির্বাসন দেয়, তার কণ্ঠরোধ করে।

বাংলাদেশও ঘটা করে উদযাপন করে নারী দিবস। দুনিয়াকে দেখানোর জন্য যে তারা সভ্য ভব্য! এ কথাও সম্ভবত বলতে চায় যে নারী যেহেতু দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারে, নারী চাইলে যে কোনো বড় পদেও অধিষ্ঠিত হতে পারে। বলতে চায়, নারীদের পৃথক অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়, সব নারীই ভোগ করতে পারে পুরুষের সমান অধিকার। সব নারীরই অধিকার আছে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার, চাকরি করার, স্বনির্ভর হওয়ার। অধিকার আছে রাজনীতি করার, নেত্রী হওয়ার, সমাজের নীতি-নির্ধারণ করার। কিন্তু সত্যি কি সেই অধিকার মেয়েদের আছে? বিখ্যাত পিতা বা স্বামী বা ভাইয়ের নাম না ব্যবহার করে ক’জন নারী মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছে?

মেয়েরা যে পারিবারিক আইনকে ধর্মের ভিত্তিতে নয়, বরং সমান অধিকারের ভিত্তিতে করার জন্য কতকাল আন্দোলন করেছে, পেরেছে করতে? পারেনি। কটা মেয়ে পারে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে? ধরে বেঁধে বিয়ে দেওয়া হয় না? স্বামীর বাড়িতে দাসীর কাজ করতে পাঠানো হয় না? কটা মেয়ে পারে যা তার করতে ইচ্ছা করে, করতে? কটা মেয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে সে কটি সন্তান নেবে অথবা আদৌ সন্তান নেবে কিনা- এ ব্যাপারে? কটা মেয়ের শরীরের ওপর নিজের অধিকার আছে? মেয়েরা কী পড়বে, কতটুকু পড়বে, কোথায় যাবে, কী পরে যাবে, কী খাবে, কতটুকু খাবে, অর্থ উপার্জন করবে কিনা, করলে সে অর্থ কার হাতে দেবে বা সে অর্থ দিয়ে কী করবে- সব সিদ্ধান্তই অন্যরা নেয়, মেয়েরা নয়। মেয়েদের শুধু শরীরই যে অন্যের তা নয়, মেয়েদের জীবনও অন্যের। মেয়েরা অনেকটা রোবটের মতো, রোবটকে যাহা বলা হয়, রোবট তাহাই করে, অথবা তাহাই করিতে বাধ্য থাকে। মেয়েরা অনেকটা সে রকম। আর যে মেয়ে রোবট হতে চায় না, রক্ত মাংসের মানুষ হতে চায়, নিজের বুদ্ধি বিবেক, নিজের শিক্ষা সচেতনতা নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে চায়, সিদ্ধান্ত নিতে চায়, বৈষম্যহীন সমাজ এবং পরিবার চায়, তাহলেই সে মন্দ মেয়ে, তাকে ধর্ষণ করো, মেরে ফেলো, বা তাকে নিষিদ্ধ করো, তাকে নির্বাসন দাও। ধর্ষণ চলছেই। শারীরিক, মানসিক সবরকম ধর্ষণ চলছেই সমাজে। ধর্ষণ কোনও যৌনতা নয়, ধর্ষণ নারী-নির্যাতন, ধর্ষণ নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য, পেশির জোর, পুরুষত্বের অহমিকা, উগ্র পুরুষতন্ত্র, চরম নারীবিদ্বেষ। বছর বছর নারী দিবস আসে, নারী দিবস যায়। কিন্তু বৃদ্ধা থেকে শিশু অবধি কেউই ধর্ষণ থেকে বাঁচতে পারে না। কী লাভ এই নারী দিবসে? পুরুষ যদি নারীর সমানাধিকারে বিশ্বাস না করে, পুরুষতন্ত্রের জয়জয়কার যদি সারা বছর, একটি দিনের নারী দিবসে পুরুষতন্ত্রের সামান্য কালিও যদি ধোয়া না যায়, তবে নারী দিবস কি ছাতার মাথা করে দেশটিতে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *