দুদকে যদি ভেজাল মিলে ধরে নেবে ঘটেছে তা মনের ভুলে

মোকাম্মেল হোসেন: ইমাম সাহেব বললেন-

মিলাদ শেষে মসজিদ থেকে একসঙ্গে বের হলেন আন্নেছ বেপারি ও জমশেদ আলী। সড়কে ওঠার পর জিলাপিতে কামড় বসিয়ে আন্নেছ বেপারির কাছে জমসেদ আলী জানতে চাইলেন-

: বেপারির পো, মিলাদ দিলা কীজন্য?

জমসেদ আলীর কথায় আন্নেছ বেপারি খুবই অবাক হলেন। বললেন-

: মোনাজাত ধরছিলা কি?

: ধরছিলাম।

: মোনাজাতের আগে ইমামসাবের কথা কানে যায় নাই?

: না।

আন্নেছ আলী দাঁড়িয়ে পড়লেন। জমশেইদ্যা কি তার সঙ্গে মশকরা করছে? মিলাদ মশকরার বিষয় না- এই নাদান কি তা জানে? আন্নেছ বেপারি চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন-

: মসজিদে উপস্থিত সবাই বিষয়টা শুনল আর তুমি শুনলা না; বড়ই আশ্চর্য ঘটনা! বাড়ি থেকইা বাইর হওয়ার আগে আম্বিয়ার মা কানের মধ্যে তুলা গুইজ্যা দিছে নাকি?

: আরে না।

: তাইলে?

: কয়েকদিন আগে মমিসিং শহরে গেছিলাম। রাস্তা দিয়া হাঁটার সময় একটা ট্রাক এমন জোরে পেঁ-পেঁ কইরা উঠছিল- ওই শব্দে আমরা দুই কানই তবদা খাইছে।

: হায় আল্লাহ তুই সোবাহান! কও কী!

: কথা সত্য। ওই ঘটনার পর থেইকা কানে ঠিকমতো শুনতে পাইতেছি না।

আন্নেছ বেপারি জমসেদ আলীকে নিয়ে সড়কের পাশে একটা জামগাছের নিচে দাঁড়ালেন। এরপর তার কানের কাছে মুখ রেখে চেঁচিয়ে বললেন-

: আমার বড় পোলা ময়নাল…

জমসেদ আলী ঝটকা মেরে ঘুরে দাঁড়ালেন। বিরক্ত মুখে বললেন-

: এত জোরে চেঁচাও ক্যান? কথা যা কওয়ার আস্তে কও।

জমশেদ আলীর কথা শুনে আন্নেছ বেপারি অকাশ থেকে পড়লেন। চোখ কপালে তুলে বললেন-

: আরে মরজ্বালা! তুমিই তো বললা- কানে তবদা খাইয়া বইসা রইছো!

: তবদা খাইলেও অতটা বয়ড়া হইছি না যে, কানের কাছে ঢোল বাজান লাগবে। ঠিক আছে; এইবার কও- ময়নালের কী হইছে?

: ময়নালের চাকরি ঠিক হইয়া গেছে।

: কোন দেশে?

: বিদেশে না; দেশেই।

: দেশে কী চাকরি!

: বড়ই আচানক কারবার; দেশের মধ্যেই বিদেশি চাকরি! বুঝলা, মানুষ আদম বেপারির হাতে তিন-চাইর লাখ টাকা তুইলা দেওনের পর ওই ব্যাটার লেঙ্গুড় মুচড়াইতে মুচড়াইতে অবশেষে বিদেশ যাওয়ার চান্স পাইলেও বেতন হয় খুবই সামান্য; আর আমাদের ময়নাল জয়েনিংয়ের কাগজ হাতে লইয়া দেখবে- তার বেতন ধার্য্য হইছে ৩০ হাজার টাকা। এর বাইরে ওভারটাইমও আছে!

: কও কী! সরকারি চাকরি, না কোম্পানি?

: কোম্পানি।

: কোন কোম্পানি?

: অনেক বড় কোম্পানি। পদ্মা সেতুর নাম শুনছো?

: হ, শুনছি।

: এই সেতু কত লম্বা হইতে পারে- ধারণা করতে পারবা?

: না।

: মাটি থেইকা আসমান পর্যন্ত লম্বা। ময়নাল এইরকম একটা জায়গায় চাকরি করবে- এইটা নিশ্চিত হওয়ার পর গর্বে আমার বুকটা দশ হাত ফুইল্যা ওঠছে।

জমশেদ আলীকে চিন্তিত দেখাল। মাথা চুলকাতে চুলকাতে তিনি বললেন-

: পদ্মা সেতুর কাজকাম না খারিজ হইয়া গেল!

: আরে না; ইংরেজ ত্যান্দামি করায় কাম একটু হোঁচট খাইছিল। এখন আর কোনো সমস্যা নাই।

: আমার ইদ্রিসও বেকার বইসা রইছে। তার একটা গতি কইরা দেও না!

: এইটা কোনো ব্যাপারই না; তুমি উত্তরপাড়ার লিটন মিয়ার কাছে চইলা যাও।

জামসেদ আলীর পেটে ক্ষুধা। তিনি এটাকে পাত্তা না দিয়ে লিটন মিয়ার বাড়িতে উপস্থিত হলেন। লিটন মিয়া দুপুরের খাওয়া শেষে পানের পিক ফেলতে ফেলতে বাইরে এলে জমসেদ আলী বললেন-

: তোমার কাছে আসলাম।

: বিষয় কী?

: আমি অনেক আশা লইয়া তোমার কাছে আসছি; তুমি কিন্তু আমারে নৈরাশ করতে পারবা না।

: আগে বিষয়টা বলেন, শুনি।

: তুমি নাকি লোকজনরে চাকরি দিতেছ?

: অঃ। খবর পাইয়া গেছেন তাইলে?

: আরে! এইটা কী সাপের বাচ্চা, বাক্সের মধ্যে লুকাইয়া রাখবা? সুখবর হইল ফুলের সুবাসের মতো। সুবাস বাতাসের আগে আগে ছড়ায়।

লোক নিয়োগ উপলক্ষে লিটন মিয়া তার বাড়িতে ছোটখাট একটা অফিস খুলে ফেলেছে। জমসেদ আলীকে নিয়ে সে অফিসকক্ষে প্রবেশ করল। সেখানে দুজন অপরিচিত মানুষকে বসে থাকতে দেখে জমসেদ আলী বললেন-

: ওনাদের তো চিনলাম না!

লিটন মিয়া লোক দুজনের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল-

: কোম্পানির লোক। ঢাকা থেইকা আসছে।

: অঃ।

লিটন মিয়া আঙুলের ডগায় লেগে থাকা চুন জিহ্বায় ঘষার পর জানতে চাইল-

: চাকরি কার জন্য?

: আমার বড় পোলা ইদ্রিসের জন্য।

: ইদ্রিসের পড়ালেখা কতদূর?

: এইট পাস কইরা আর পড়ল না! কত কইলাম- পড় বেটা, পড়। সরকার দেশের সব মানুষরে বিএ, এমএ পাস করানোর জন্য এত খাটাখাটনি করতেছে! তুই স্কুল ছাইড়া দিলে সরকারের মুখে চুনকালি পড়বে, তুইও ক্ষতিগ্রস্ত হবি। কে শুনে কার কথা!

: অসুবিধা নাই। আমরা হাইপোস্টে লোক নিতেছি না; লেবার পোস্ট।

: পোস্ট-ফোস্ট কোনো বিষয় না। বেতন ঠিকমতো পাইলেই হইল।

লিটন মিয়ার ঠোঁটে হাসির ঝিলিক দেখা গেল। নতুন কেনা আরাম কেদারায় হেলান দিয়ে সে বলল-

: বেতন লইয়া কোনো টেনশন নাই। বিদেশি কোম্পানির কাজ-কারবারই আলাদা। সবকিছু বিদেশি সিস্টেমে চলে। মাসের শেষে বেতনের চেক ব্যাংকে চইলা যাবে।

: বেতন কত ধরবে?

: বেতন হবে ডলারে। ডলারের রেট অনুযায়ী ব্যাংক টাকা দিতে বাধ্য থাকবে।

জমশেদ আলী দেখলেন, হিসাব ফকফকা। তিনি অস্থিরতা গোপন না করে বললেন-

: কাগজপাতি কী কী লাগব- এইটা আগে কও।

: রঙিন ছবি লাগবে ৩ কপি; পাসপোর্ট সাইজ। জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি আর চেয়ারম্যানের কাছ থেইকা একটা ক্যারেক্টার সার্টিফিটেক আনন লাগবে।

: পয়সাকড়ি কত লাগবে?

: ২০ হাজার। মেডিকেল টেস্ট, কন্ট্রাকটরের কমিশন ইত্যাদি আত্তাবাত্তা মিলাইয়া রেট আরও বেশি পইড়া যায়…

: আইচ্ছা, ২০ হাজারই দিমু।

জমসেদ আলীর হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দেয়া হল। কাগজ হাতে নিয়ে তিনি বললেন-

: এইটা কী দিলা? আমি তো চক্ষে দেখি না!

জমসেদ আলীর কথা শুনে লিটন মিয়া ভড়কে গেল। কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে থাকার পর জমসেদ আলীর নাকের সামনে ডানহাত রেখে সে বলল-

: বলেন তো চাচামিয়া, হাতে কয়টা আঙুল?

: পাঁচটা!

উত্তর শুনে লিটন মিয়ার মুখ আরও বেশি হা গেল। ঢোক গিলে সে বলল-

: তাইলে চক্ষে দেখি না- এই কথা কেন বললেন!

: এইটা হইল কথার কথা। লেখাপড়া না জানা মানুষ; এইজন্য বলছি, চক্ষে দেখি না।

: আপনের লেখাপড়া জানাটা জরুরি না। যে কাগজটা দিছি, ওইটা হইল ইদ্রিসের সিরিয়াল নম্বর। টাকা-পয়সা ও কাগজপত্র জমা দিলেই সিরিয়াল নম্বর অনুযায়ী আপনের ছেলের নাম খাতায় এন্ট্রি হইয়া যাবে।

কর্মপ্রত্যাশী এক হাজার যুবকের নাম অফিস রেজিস্টারে এন্ট্রি হওয়ার পর লিটন মিয়া ছোটখাট একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ফেলল। সরকারদলীয় এক নেতা সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বক্তৃতার ভঙ্গিতে বললেন-

: ভায়েরা, সরকার ঘোষণা দিছিল- বাংলার ঘরে ঘরে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। আমাদের সরকার যে কথা নয়, কাজে বিশ্বাসী- আজকের শোকরানা অনুষ্ঠান তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই এলাকার প্রতিটি ঘরে আজ কর্মসৃজনের কলি ফুল হয়ে ফোটার অপেক্ষায় কাচুমাচু করতেছে…

শোকরানা অনুষ্ঠানের তিনদিন পর নিয়োগপ্রাপ্তদের কর্মস্থলে নেয়ার জন্য লিটন মিয়া ও তার দুই সাগরেদ বাস রিজার্ভ করতে শহরে গিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেল। লিটন মিয়ার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া গেল।

মাসখানেক গত হওয়ার পর সবাই বুঝতে পারল, তারা প্রতারিত হয়েছে। এসময় একজন বলল-

: চল, বিষয়টা থানায় জানাই।

জয়নাল নামের এক ছেলে মাথা নেড়ে বলল-

: ধুরাউ! থানা-পুলিশ কইরা লাভ নাই। পুলিশ ওই চিটারদের কাছ থেইকা টাকা খাবে, আবার আমাদের কাছ থেইকাও টাকা নিবে।

সাদেকুল নামের একজন তখন জানতে চাইল-

: তুই তাইলে কী করবার চাস?

মাথার চুল টানতে টানতে জয়নাল বলল-

: সবচাইতে উত্তম কাজ হইত- ছেঁচা দিয়া হারামজাদার হাড়-মাংস এক করতে পারলে। সেইটা তো সম্ভব না। তবে একটা কাজ করা যাইতে পারে।

: কী কাজ?

: ঢাকায় যাওয়া যাইতে পারে। লিটন মিয়া এতগুলা মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে- বিষয়টা দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরে আইন্যা এর বিচার চাওয়া যাইতে পারে।

পরদিনই জয়নাল ও সাদেকুলকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হল। তারা দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যালয়ে গিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করতেই সেখানে দায়িত্ব পালনরত একজন বললেন-

: আপনাদের নিজের জেলায় দুর্নীতি কমিশন অফিস আছে; সেখানে যান।

সাদেকুলের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করে জয়নাল বলল-

: আমরা এইখানে আসছি ডাইরেক্ট অ্যাকশনের জন্য। আপনেরা ঘটনার তদন্ত করেন; তারপর কঠিন অ্যাকশন নেন।

জয়নাল-সাদেকুলকে শান্ত করার অভিপ্রায়ে দুদক কর্মকর্তা অভিযোগপত্র ড্রয়ারে রেখে কিছুদিন পরে যোগাযোগ করতে বললেন। দুই সপ্তাহ পরে দুদক অফিসে গিয়ে ভদ্রলোকদের খোঁজ করতেই ওখানকার এক কর্মকর্তা জয়নাল-সাদেকুলের উদ্দেশে বললেন-

: উনি তো নেই।

: কোথায় গেছেন?

: মামলা থেকে খালাস দেয়ার জন্য এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিছিলেন। বিষয়টা ফাঁস হওয়ার পর বর্তমানে তিনি আন্ডার অ্যারেস্ট।

এ কথা শুনে জয়নাল বিস্মিত হল। বলল-

: হায় আল্লাহ; দুদকেও ভেজাল!

জয়নালের কথা শুনে ভদ্রলোক বললেন-

: ভেজাল বলবেন না; ভেজাল বলা ঠিক হবে না। মনে করতে হবে- ঘটনাটা মনের ভুলে ঘটছে।

জয়নালের বিস্ময়ের মাত্রা আরও বেড়ে গেল। সে বলল-

: মনের ভুলে কেউ ঘুষ খায়!

: অন্য কোথাও খায় কিনা জানি না; তবে দুদকে এই ধরনের ঘটনা মাঝেমধ্যে ঘটে। জাহালমের নাম শুনছেন?

: জি না।

: জাহালম নামে এক যুবক বিনাদোষে তিনবছর জেল খাটার পর দুদক বুঝতে পারছে, ঘটনাটা মনের ভুলে ঘটছে। এরকম উদাহরণ আরও আছে; শুনবেন?

কষ্টের হাসি সারা মুখে ছড়িয়ে দিয়ে দুদক কর্মকর্তার উদ্দেশে জয়নাল বলল-

: জি না; আর শুনতে চাই না। যতটুকু শুনছি, এতেই আমরার পেট ভইরা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *