বাংলা ও বাঙালি

তসলিমা নাসরিন:

  ১. পয়লা বৈশাখে দেশজুড়ে উৎসব হয়। নাচ গান মেলা মিছিল পোশাক আশাক আর খাওয়া দাওয়ার হৈ হুল্লোড়। বাঙালি সংস্কৃতি যে যেমন পারে উদযাপন করে। এই একটি দিনই। পরদিন থেকেই যাপন করতে শুরু করে মিশেল সংস্কৃতি। বলতে শুরু করে মিশেল ভাষা। শুরু হয় দেশি জিনিসকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা, এমনকী ঘৃণা করাও। শুরু হয় ধনী দেশগুলোর সব কিছুকেই আলিঙ্গন করা। বাঙালি নিজের সন্তানকেও চায় না মাতৃভাষা শিখুক। ইংরেজি বলতে পারলে আনন্দে নাচে বাঙালি। যে লোক ভালো ইংরেজি বলে, তাকে, যে লোক ভালো বাংলা বলে, তার চেয়ে শতগুণ বেশি সমীহ করে। বাংলা দরিদ্র মানুষের ভাষা, এ ভাষা শিখে ভালো চাকরি বাকরি বা ব্যবসা বাণিজ্য জোটানো যায় নাÑএরকম একটি বিশ্বাস অধিকাংশ মানুষের মনেই গেড়ে বসা। বাংলা ভাষাটি লিখতে পড়তে বলতে পারার চর্চায় খুব কম মানুষেরই আগ্রহ। সারা বছরের চিত্রটি এরকমই, শুধু একদিন সব উল্টে যায়। পয়লা বৈশাখের দিন। এই দিনটি পালন করার বিরুদ্ধে বিশাল এক ধর্মীয় গোষ্ঠী উঠে পড়ে লেগেছে। তারা এ দেশে বাঙালি সংস্কৃতি নয়, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি নয়, আরবীয় সংস্কৃতি আমদানি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরব লোকদের মতো তারা চায়, বাঙালিরা জীবনযাপন করুক। বাঙালিরা নিজের পোশাক ছুড়ে ফেলে আরবদের পোশাক পরুক, নিজের ভাষা বিসর্জন দিয়ে আরবদের ভাষা বলুক। বাংলা ভাষা এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য এরাও বেশ তৎপর।

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর দুদিক থেকে চাপ, এক আধুনিকতার নামে ইংরেজি ভাষা এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির চাপ। দুই ধর্মের নামে আরবি ভাষা এবং আরবের সংস্কৃতির চাপ। এই দুই চাপে বাংলা চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে আছে, কবে এর দম ফুরিয়ে যাবে কে জানে। ভাষা এবং সংস্কৃতিকে না ভালোবাসলে ভাষা এবং সংস্কৃতি টিকে থাকে না। পৃথিবীতে প্রতি দু’সপ্তাহে একটি করে ভাষা মরে যাচ্ছে। বাংলা ধুঁকছে। একটি দিনের উৎসব মুমূর্ষু বাংলাকে কতটা শুশ্রুষা করবে তা আমি জানি না।

২. বাঙালি দ্বিধাগ্রস্ত জাতি। নিজের দেশ নিয়ে গর্ব করবে কিন্তু দেশকে গড়ে তোলার জন্য প্রায় কিছুই করতে রাজি নয়। বাংলার হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টানসহ অন্য সবার এক সমাজে মিলেমিশে বাস করাই আজো সম্ভব হচ্ছে না। ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে প্রায়ই গোল বাধে। এ ওকে কুপিয়ে মারে, একের ভয়ে আরেক দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। ধর্মীয় কট্টরপন্থা যদি বাঙালিত্ব ভুলিয়ে দেয়, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট করে ফেলে, তাহলে কট্টরপন্থাকে দূর করতে হবে, বাঙালিত্বকে নয়। বাঙালিরা ভারতীয় উপমহাদেশে সবার আগে শিক্ষিত হয়েছে, এ নিয়ে বাঙালির গৌরব বেশ। বাংলার সাহিত্য, নাটক, গান, কবিতা, সিনেমা এখনো অন্যান্য অনেক অঞ্চলের চেয়ে বেশি সমৃদ্ধ। কিন্তু কী লাভ হলো শিক্ষিত হয়ে। এখনো নারী-পুরুষে বৈষম্য। এখনো নারী খুন, ধর্ষণ, যৌন হেনস্থা, নারীবিদ্বেষ, গার্হস্থ্য বর্বরতার শিকার। এখনো আইন নারীর বিরুদ্ধে, এখনো নারী সমানাধিকার থেকে বঞ্চিত। এখনো নারীরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক, এখনো তারা হয় ভোগ্য বস্তু, নয় সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত। এখনো বাংলায় দারিদ্র্য প্রচণ্ড, এখনো শ্রেণি আর জাতে বিভেদ, এখনো মানুষে মানুষে ঘৃণা, এখনো অবিশ্বাস, দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার। এই বাঙালির ভবিষ্যৎ কী? দিন দিন ধর্মীয় কট্টরপন্থা বাড়ছে বাংলায়, নারীবিদ্বেষ বাড়ছে, অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। এত বাড়ছে যে পশ্চিমবঙ্গে ‘হোক কলরব’ করতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের। এত বাড়ছে যে বাংলাদেশে ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ লেখা টি-শার্ট পরে ভিড়ের রাস্তায় হাঁটতে হচ্ছে বা বাসে ট্রেনে চড়তে হচ্ছে মেয়েদের। পয়লা বৈশাখ, যে দিনটি বাঙালির গৌরবের দিন, সে দিনটিতেও বাঙালি-পুরুষ রেহাই দেয় না মেয়েদের। আসলেই কি এই দিনটি নিয়ে তারা গৌরব করে? আমি জানি, এখন বহু পুরুষই বলবেন, তাঁরা যৌন হেনস্থা করেন না, তাঁরা ভালো মানুষ, আমি কেন তাবৎ বাঙালি পুরুষদের দোষ দিচ্ছি! আসলে আমি তাবৎ বাঙালি পুরুষদের দোষ দিচ্ছি না, যারা বদ, তাদেরই বদনাম করছি। কিন্তু এটাও তো ঠিক, বাঙালি পুরুষের মধ্যে যারা ভালো, তারা বদ পুরুষদের ভালো পুরুষে পরিণত করার জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না, কোনো সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলছেন না। সুতরাং এই দায়ভার তো কিছুটা তাদেরও! কিছু নারী যখন নির্যাতিত হয়, তখন নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার দায় সব নারীর। তেমনি কিছু পুরুষ যখন নারীকে অত্যাচার করে, তখন সেই কিছু পুরুষের বিরুদ্ধে রুখে ওঠার দায় সব পুরুষের। তখন যে পুরুষেরা হাত গুটিয়ে বসে থাকে, বুঝতে হবে, তারা আসলে অত্যাচারের পক্ষের পুরুষই। কেউ প্রশ্ন করতে পারে, আন্দোলন বা লড়াই করা সবার কাজ নয়, আন্দোলনে যোগ দিলেই সে ভালো মানুষ, তা না হলে নয়? মোটেও তা নয়। তুমি ভালো মানুষ, সমাজের কোনো কিছুতে তোমার যায় আসে না। এ হলে ঠিক আছে। কিন্তু অনেক কিছুতে তোমার যায় আসে, এমন কী পেঁয়াজের দাম বাড়লেও তুমি চেঁচাও, বৈষম্য মোটেও মানতে চাও না, অন্যায়ের বিচার চাও, কিন্তু নারীর বিরুদ্ধে যে অন্যায় হয়ে আসছে বহু শতাব্দী ধরে, সেটির বিরুদ্ধে চুপ কেন থাকো, একটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে তোমার কিছু যায় আসে না কেন। নিশ্চয়ই তুমি নারীবিদ্বেষকে সমর্থন করো।

৩. ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ লেখা টি-শার্ট বাংলাদেশের কিছু মেয়ে পরছে। এরকম টি-শার্ট আরও মেয়ের পরা উচিত। আরও কিছু লিখতে হবে টি-শার্টে। যেমন :

১। ঘেঁষবেন না, আমি আপনার মা-বোন নই।

২। আমি আপনার স্ত্রী নই, প্রেমিকাও নই। দূরত্ব বজায় রাখুন।

৩। যৌনবস্তু নই। তফাৎ যাও।

৪। আমরা তোমার সহযাত্রী, আমরা খাদ্য নই।

৫। বর্বরতা দূর করো। সভ্য সমাজ গড়ে তোলো।

৬। পুরুষতন্ত্র বিদেয় করো, বিবেকবান মানুষ গড়ো।

৭। পশুর কাছে ধর্ষণ না করা শেখো।

৮। ধর্ষণমুক্ত সমাজ চাই।

৯। নারীবিদ্বেষ আর নয়।

১০। নারীর সমানাধিকার ছাড়া সমাজ সভ্য হয় না।

১১। নারী-নির্যাতন বন্ধ করো।

১২। আমাকে বাধ্য করবেন না আপনাকে ঘৃণা করতে।

১৩। যৌন হেনস্থাকারী হওয়ায় কৃতিত্ব নেই, বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হন।

১৪। নারীর স্বাধীনতায় অশিক্ষিত আর অসভ্যরা বিশ্বাস করে না।

১৫। নারী-পুরুষের বৈষম্য ঘোচানো নারী-পুরুষ উভয়ের দায়িত্ব।

এসব লিখে সমাজের কিছুরই পরিবর্তন করা যায় না এ আমি বলবো না। যে কোনো প্রতিবাদই মানুষের মনে চিন্তার খোড়াক জোগায়। যে কোনো প্রতিবাদই উৎসাহ দেয় প্রতিবাদী হতে। মেয়েরা টি-শার্টে প্রতিবাদের ভাষাকে ধারণ করছে, এভাবেই মেয়েরা হয়ে উঠছে আস্ত এক একটি প্রতিরোধ। অস্বীকার করে লাভ নেই, কারণ সচেতন যে কোনো মানুষই জানে, একটি যুদ্ধ চলছে। সবার চোখের সামনেই যুদ্ধটি চলছে। যুদ্ধটি নারীর বিরুদ্ধে পুরুষের যুদ্ধ। নারীকে অপমান করা, হেনস্থা করা, নারীর অধিকার কেড়ে নেওয়া, স্বাধীনতা নষ্ট করা, নারীকে শারীরিকভাবে অত্যাচার করা, মানসিকভাবে নির্যাতন করা, নারীর মুখে এসিড ছোড়া, নারীকে ঘরবন্দী করা, নারীকে ধর্ষণ করা, নারীকে খুন করা- প্রতিনিয়ত হয়ে চলেছে। নারীর জন্য কোনো বাড়ি, কোনো অফিস, কোনো বাহির, কোনো পার্ক, কোনো রাস্তাঘাট, কোনো বাস ট্রেন নিরাপদ নয়। যে কোনো জায়গায় নারীকে হেনস্থা করা হয়, ধর্ষণ করা হয়, খুন করা হয়। নারীর জন্য কোনো সমাজ তো নয়ই, কোনো দেশও নিরাপদ নয়। যুদ্ধটা যেহেতু পুরুষ চালাচ্ছে নারীর বিরুদ্ধে, তাই নারী প্রতিটি অঞ্চলে অনিরাপদ, নারীর জীবন প্রতিটি অঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ। এই যুদ্ধের অবসান চাই। এই যুদ্ধের ইতি পুরুষ কবে টানবে, তা পুরুষই জানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *