বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বৈঠক: থাকবে না একক ব্যক্তি ঋণসীমা

বৈচিত্র ডেস্ক :  ব্যাংকিং খাতে একক ব্যক্তি ঋণসীমা (সিঙ্গেল ব্রোয়ার এক্সপোজারস) থাকবে না। ভালো ঋণ গ্রহীতারা চাহিদা অনুযায়ী ঋণ নিতে পারবেন। কিন্তু খাবার ঋণ গ্রহীতাদের ক্ষেত্রে একক ব্যক্তি ঋণসীমা বহাল থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বৈঠক শেষে (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর ৫টায়) সাংবাদিকদের সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতের সমস্যা দূর করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) টুলসকে কাজে লাগানো হবে। খুব শিগগিরই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত উন্নয়নে আইএমএফ কাজ শুরু করবে। এটি করতে সংস্থাটি রাজি হয়েছে।’

ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ সম্মেলনের তৃতীয় দিনে আইএমএফের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। ওই বৈঠকে ওঠে আসে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ও আগামী পহেলা জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন প্রসঙ্গ। এসময় ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও সমস্যা নিয়ে অর্থমন্ত্রী খোলামেলা আলোচনা করেন।

বৈঠক শেষে বিশ্ববাংকের সদর দফতরে ব্রিফিং করেন তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আগে ব্যাংকিং খাতে এক ব্যক্তি ঋণসীমা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হতো। এ নিয়ে শঙ্কায় পড়তে হতো যে, টাকা নিয়ে তা ফেরত দেবে কিনা। কিন্তু আমরা চাই একজনই ব্যাংকের সব টাকা গ্রহণ করুক। তাতে আপত্তি থাকবে না। তবে সে হতে হবে ভালো ঋণ পরিশোধকারী। আর ভালোভাবে ঋণ পরিশোধ করে দেশের অগ্রগতিকে এগিয়ে নিয়ে গেলে তাকে ঋণ দেব না কেন?’

একক ব্যক্তি ঋণসীমা সংশোধনের ইঙ্গিত দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এটি বাইবেল না যে, তা পরিবর্তন করা যাবে না। ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের ভুল সিদ্ধান্তসহ আরও অনেক কিছু আছে- যা ধীর ধীরে ঠিক করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে একক ব্যক্তি ঋণ সীমা থাকবে না। একক ব্যক্তি ঋণসীমা তাদের জন্য রাখা হবে যারা খাবার ঋণ গ্রহীতা। কিন্তু যারা ভালো ব্যবসায়ী, সৎ উদ্যোক্তা, ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসা করবেন, দেশের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে নিজেদের সম্পৃক্ত করবেন- তাদের জন্য একক ব্যক্তি ঋণসীমার প্রয়োজন নাই। পৃথিবীর কোনো দেশে এটি নাই।’

এদিকে বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সক্ষমতা তৈরিতে আইএমএফের কাছে সহায়তা চাওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠান ও মানবসম্পদ- দুটিরই সক্ষমতা বাড়াতে তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত বিভিন্ন ভাবে দুর্বল আছে। কিছু কিছু স্থানে সমস্যা আছে। এসব সমস্যা দূর করতে তাদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। কারণ এসব সমস্যা দূর করতে আইএমএফের কাছে কার্যকরী টুলস আছে। এই টুলস ব্যবহার করে ব্যাংকিং খাতকে সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসা যাবে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে কাজ করতে সংস্থাটি রাজিও হয়েছে। খুব শিগগিরই তারা স্টাডি করে যাতে সুন্দর ও সফলভাবে ব্যাংকিং খাত পরিচালনা করা যায় সে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

আইএমএফের কাছ থেকে ব্যাংকিং খাতের কোন কোন বিষয়ে সহযোগিতা নেয়া হবে- এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘অটোমেশন করা হবে। ব্যাংকিং খাতে এই অটোমেশন করতে সব ধরনের প্রযুক্তি তারা দেবে। ব্যাংকিং খাতে সারা বিশ্বে সফল হয়েছে ব্লক চেইন প্রযুক্তি। এটি তাদের কাছে আছে। তারা এই প্রযুক্তি কিভাবে ব্যবহার করতে হয়, প্রযুক্তি কোন দেশ থেকে আনতে হবে এসব বিষয়ে পরামর্শ দেবে। এটি কার্যকর করতে জনবল তৈরি করতে হবে। এ কাজটিও আইএমএফ করবে। কারণ তারা এ বিষয়ে অনেক শক্তিশালী।’

এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারে ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর হবে কিনা- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘অনলাইন ও অটোমেশনে গেলে ব্যাংকিং খাতে অনেকাংশেই অনিময় অন্যায় কমে আসবে। বর্তমান একজন ব্যক্তি ১০টি ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। এরমধ্যে ৫টি ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে আরও ৫টি ব্যাংকে যাচ্ছেন। এভাবে টাকা-পয়সা নেয়া অপরাধ। কিন্তু অটোমেশন হলে এক স্থান থেকে বসে ধরা যাবে একজন ব্যক্তি কয়টি ব্যাংকের কাছে যাচ্ছেন।’

নতুন ভ্যাট আইন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এ আইন বাস্তবায়নের পেছনে অনেক উদ্যোগ ছিল আইএমএফের। আইনটি প্রণয়নে আর্থিক ও জনবলের দিক থেকে সহায়তা করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছে। সংস্থাটির সুপারিশ ছিল নতুন ভ্যাট আইনে সিঙ্গেল রেট। এটি তারা চেয়েছে। অনেক আলোচনার মাধ্যমে সংস্থাটি রাজি হয়েছে ভ্যাটের তিনটি স্তর থাকবে। আগামী বাজেটে নতুন ভ্যাট হার হবে ৫, ৭.৫ ও ১০ শতাংশ। আগে ছিল ১৫ শতাংশ, সেটি ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। সংস্থাটি তা মেনে নিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কাস্টমসের ক্ষেত্রে ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ থাকবে। তবে ভোগের দিক থেকে ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ থাকবে না। সেটি হবে ১০ শতাংশ। সব তুলে দিলেতো বাজেট বাস্তবায়ন হবে না।’

আ হ ম মস্তুফা কামাল বলেন, আমাদের সুখবর হচ্ছে আর্ন্তজাতিক দাতা সংস্থার (আইএমএফ) প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর করতে রাজি হয়েছেন। আশা করছি এই সফরের সময় দেশের উপকার হবে এমন নানাবিধ বিষয় নিয়ে আলোচনার সুযোগ হবে। এর আগে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর করেছেন। আইএমএফ প্রেসিডেন্ট সফর করলে বাংলাদেশের অপ্রাপ্তির বিষয়গুলো পূরণের সুযোগ পাব।’

প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক একমত না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, তাদের কেলেন্ডার ইয়ার ও আমাদের ফিসকেল ইয়ারে গরমিল হচ্ছে। বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ দিচ্ছি এ বছরই তারা বলেছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। কারণ তারা কখনোই ৬ শতাংশের ওপরে বলে না। এবার ৭ শতাংশের ওপরে বলেছে সংস্থাটি। আর প্রকৃতভাবে এটি ৮ শতাংশ অতিক্রম করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *