স্পেনের মালাগা ভ্রমণের দিনগুলো

রহমান মৃধা : বসন্ত এবার আসতে শুরু করে সুইডেনে একটু আগেই অন্য বছরের তুলনায়। কিন্তু প্রকৃতি তার মোড় ঘুরিয়ে শুধু ঠান্ডা নয় তীব্র শীতে পরিনত করবে তা ভাবতে পারিনি। শুধু কি তাই? এই তীব্র শীত ইংল্যান্ডেও আকষ্মিকভাবে বেশ প্রভাব বিস্তার করেছে। মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল তাই আমার সহধর্মিনী মারিয়াকে বললাম এক সপ্তাহের ছুটি নিতে, ছুটি হয়ে গেল আর চলে এলাম স্পেনের মালাগা।

এবারের মালাগা ভ্রমণে ছেলেমেয়ে ছাড়া এসেছি তাই থাকার ব্যবস্থা হয়েছে তিন শহরে। মারিয়ার বাবার বাড়ি তোরেমলিনোস (Torremolinos) যেখানে থাকব দুদিন। বন্ধু টমি আলবেরির (Tommy Ahlberg) বাড়ি ফুয়েনসিরোলা (Funguerila) সেখানে তিনদিন।

আর ফ্যামেলি ফ্রেন্ড ডালের (Dhal) বাড়ি মার্বেয়া (Marbella) সেখানে থাকবো দুদিন। মালাগা শহর এবং মিসাছ (Mijas) নামে এক পাহাড়ি গ্রাম বেড়ানোরও ব্যবস্থা করেছি এবারের ভ্রমণসূচীতে। আসার পর থেকেই সকাল সন্ধা শুধু ঘোরাঘুরি চলছে।

প্রতিদিন ভূমধ্যসাগরে (ম্যাডিটেরিয়ান) কিছুক্ষন সাঁতার কাটা, তারপর স্প্যানিশ কফি পান এবং সঙ্গে রুটি (baguette) খাওয়া চলছে দেদারছে। রাতের ডিনারের ব্যবস্থা বাড়িতে কারণ স্পেনের তাজা শাকসব্জি, মাছ, গোস্ত কোনভাবেই মিস করা চলবে না। তাই এখানকার সুপার মার্কেট মার্কাডোনায় (Mercadona) মনের আনন্দে বাজার করা আমার ভ্রমণের একটি বিশেষ অংশ হয়েছে।

তাছাড়া আমি বাইরের খাবার খুব একটা খাইনা যার কারনে নিজেই রান্না করি আমার পছন্দ মত। পায়েয়া (Paella) ভ্যালেন্সিয়ার একটি ট্রেডিশনাল খাবার যা পুরো স্পেন এমনকি সারা বিশ্বে বেশ পরিচিত। তবে আমার রান্না পায়েয়ার স্বাদ হার মানাতে শুরু করেছে স্প্যানিশদের পায়েয়াকে যা মন্তব্য করেছে আমার স্থানীয় বন্ধুরা। প্রসঙ্গত যে সব স্পেনিশ শব্দে দুটো “L” ব্যবহার করা হয় তার উচ্চারণ “J” যার কারনে মার্বেয়া (Marbella) এবং পায়েয়া (Paella) লেখার সাথে উচ্চারণের পার্থক্য লক্ষনীয়। অনেকবার এসেছি এসব শহরে, ঘুরেছি বহুবার তবে পরিবর্তন হয়েছে অনেক। ভাষাগত দিক থেকে শুরু করে প্রযুক্তি এবং কালচারাল পরিবর্তন বড় করে চোখে পড়ছে এবারের ভ্রমণে।

ভিনদেশী চিনাদের স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতে দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আপ্লুত বোধ করছি দেখে যে স্কুল, কলেজ এবং খেলার মাঠে নানা বর্ণের এবং নানা ধর্মের সমন্বয়ে হিউম্যান সোসাইটি গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশের মানুষ যাদের বর্ণ এবং ধর্ম ভিন্ন এবং যারা তাদের নিজের দেশে বিতাড়িত, নির্যাতিত, নিপীড়িত তারও ঠাঁই পেয়েছে এখানে।

আবার অনেকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে বা ভালোবাসার সেতু তৈরি করে নতুন জীবন খুঁজে পেয়েছে কোন সমস্যা ছাড়া। সব দেখে মনে হচ্ছে পরিবর্তনের যুগে নতুনত্বের ঢেউ বইছে মানুষের মাঝে। এখানে রয়েছে বোধশক্তি, আবেগ, সহিষ্ণুতা, ধৈর্য্য এবং ভালোবাসা।

কিন্তু অনেকে তাদের নিজের দেশেই মানব হয়ে দানবের মত অমানুষিক এবং কুৎসিত আচরণ করছে। অনেকে আজ ধর্ম এবং বর্ণের নামে আগুন জ্বালিয়ে নিজের দেশের মানুষকে পুড়িয়ে মারছে। পৃথিবীর নানা দেশের অজানা অচেনা মানুষ আজ একত্রে বসবাস করছে এখানে বলতে গেলে কোন সমস্যা ছাড়া। অথচ আমরা নিজেরা নিজেদের দেশের মানুষকে নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করতে পারছিনে। কি কারণ রয়েছে আমাদের না পারার পেছনে? মানব জাতির সভ্যতার মাঝে অসভ্য আচরণ যা ভাবতেও ঘৃণা হচ্ছে। জানিনে এরা কবে এবং কিভাবে ভালো মানুষ হবে! মনটা খারাপ হয়ে গেল দেশের অভাগা মানুষের কথা ভেবে। তাই ভাবছি ছুটির দিনটির অবসান এভাবে না ঘটিয়ে বরং লেখার অবসান ঘটিয়ে ভূমধ্যসাগরে (ম্যাডিটেরিয়ান) কিছুক্ষন ডুবাডুবি করি। মন চাইছে অনেক কিছু লিখি কিন্তু তা আর হলো না আজ তাই শেষ করলাম ছোট্ট একটি ভিডিও দিয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *