আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস

অপূর্ব আজাদ:

পয়লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন এটি। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দেন। সেই জীবনদানের ঘটনা স্মরণ করে দিনটি সারা দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অবিভক্ত বাংলার শ্রমিকরা ছিল হে মার্কেটের শ্রমিকদের চেয়েও এগিয়ে। দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে বিশ্বের প্রথম শ্রমিক ধর্মঘট হয়েছিল অবিভক্ত বাংলায় ১৮৬২ সালের মে মাসে। অর্থাৎ শিকাগো ঘটনার ২৪ বছর আগে। ওই ধর্মঘট ডেকেছিলেন রেলওয়ে শ্রমিকরা। ১৮৬১-৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট আবরাহাম লিঙ্কনের ক্রীতদাসদের মুক্তিদানের সিদ্ধান্ত আমেরিকায় শ্রমিক আন্দোলনে জোয়ার সৃষ্টি হয়। আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলন এ সময় তীব্রতা লাভ করে। ১৮৬৮ সালে আমেরিকার আইনসভায় সরকারি শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কার্যসময় নির্ধারণের আইন পাস হয়, কিন্তু বেসরকারি শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে ইংল্যান্ডের সমাজবিজ্ঞানী ও সমাজ সংস্কারক রবার্ট ওয়েন সর্বপ্রথম শ্রমিকদের আট ঘণ্টা শ্রম, আট ঘণ্টা মনোরঞ্জন ও আট ঘণ্টা বিশ্রামের তত্ত্ব তুলে ধরেন। এ তত্ত্ব শ্রমজীবীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে তারা। কিন্তু অধিক মুনাফার জন্য শিল্পমালিকরা শ্রমিকের কাজের কোনো সময় বেঁধে দিতে রাজি ছিলেন না। এ সময় শ্রমিকদের সপ্তাহের ছয় দিনে দৈনিক ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য করা হতো। তাই শ্রমিক সংগঠনগুলো সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে ইউরোপজুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলে। সমাজতন্ত্রী বা সমাজবাদীরা এ আন্দোলনে নানাভাবে উৎসাহ জোগায়। শিল্পসমৃদ্ধ আমেরিকার শিকাগো শহরে ১৮৮৬ সালের এপ্রিলে এ আন্দোলন প্রবল গতি লাভ করে। স্মরণ করা যেতে পারে, ১৮৮৪ সালের অক্টোবরেই আমেরিকার ফেডারেশন অব অর্গানাইজড ট্রেডস অ্যান্ড লেবার ইউনিয়ন সময় বেঁধে দিয়েছিল ১ মে, ১৮৮৬-এর মধ্যে আট ঘণ্টা শ্রমের বিষয়টিকে মানদন্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি পূরণে অনীহা দেখালে ১ মে, ১৮৮৬ আমেরিকাজুড়ে হরতাল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি দেওয়া হয়। পরপর তিন দিন অনুষ্ঠিত হয় সমাবেশ ও বিক্ষোভ। ৪ মে ঘটে হৃদয়বিদারক অধ্যায়। এদিন সন্ধ্যায় হালকা বৃষ্টি উপেক্ষা করে মিছিল বের করেন আন্দোলনরত শ্রমিকরা। এরপর হে মার্কেট চত্বরে শুরু হয় বক্তৃতা পর্ব। ওই সময় শেষ বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন শ্রমিকনেতা স্যামুয়েল ফিনডেন। রাত সাড়ে ১০টায় তার বক্তৃতা শেষ হতেই পুলিশ সভাস্থল ছেড়ে সবাইকে চলে যেতে হুকুম দেয়। এমনি এক মুহূর্তে পুলিশের এগিয়ে আসার সময় ঘরে তৈরি একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই এক পুলিশ সদস্য নিহত হন। আহত হন আরও ৬৬ জন; যার মধ্যে ছয় পুলিশ সদস্য পরে মারা যান। পুলিশের ভাষ্য, বোমা বিস্ফোরণের পর উভয় পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময় শুরু হয়। কিন্তু পুরো বিষয়টি ছিল সাজানো। ইতিহাসবিদদের মতে, পুলিশই শ্রমিকদের ওপর গুলি ছোড়ে। মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে যায় হে মার্কেট চত্বর। রাস্তায় পড়ে থাকে শ্রমিকের লাশ। যদিও বলা হয় এতে চার শ্রমিক নিহত ও ৬০ জন আহত হয়েছেন, কিন্তু প্রকৃত সত্য অনেকটাই আড়ালে ঢাকা পড়ে। হে মার্কেটের রক্তাক্ত ঘটনার পর আন্দোলনকারী শতাধিক শ্রমিককে গ্রেফতার করা হয়। এরপর শুরু হয় বিচারের নামে প্রহসন। বিচার শেষে জুরি বোর্ড আট শ্রমিক আন্দোলনকারীকে মৃত্যুদন্ড প্রদানের পক্ষে মত দিলেও বিচারক সাতজনকে মৃত্যুদন্ড ও একজনকে ১৫ বছরের কারাদন্ড প্রদান করেন। উচ্চ আদালতও একই রায় বহাল রাখে। আমেরিকার অঙ্গরাজ্য ইলিনয়ের গভর্নর রিচার্ড জেমস শ্রমিকনেতা ফিনডেন ও স্ত্রোয়ারের মৃত্যুদন্ড মওকুফ করে ১০ নভেম্বর, ১৮৮৭ যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেন। এরপর শুরু হয় বাকি পাঁচজনের মৃত্যুর প্রহর গোনার পালা। কিন্তু এদিনই ঘটে আরেক বিষাদময় ঘটনা। লিঞ্জ নামের এক সাজাপ্রাপ্ত বিপ্লবী শ্রমিক মৃত্যুদন্ডের বদলে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণের উদ্দেশ্যে কৌশলে চুরুট বা মোটা সিগারেটের মতো দেখতে বিশেষ ধরনের হাতে তৈরি বোমা সংগ্রহ করেন। চুরুটের মতোই তা মুখে পুরে আগুন ধরিয়ে বিস্ফোরণ ঘটান। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার ছয় ঘণ্টা পর মারা যান তিনি। পরদিন ১১ নভেম্বর, ১৮৮৭ অবশিষ্ট চার বিপ্লবী শ্রমিক অ্যাঞ্জেল, ফিশার, পারসন্স ও স্পাইসকে নেওয়া হয় ফাঁসির মঞ্চে। ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগোতে এগোতে তারা শ্রমিকের অধিকারের কথা নিয়ে রচিত গণসংগীত ও বিপ্লবী গান গেয়ে যান। ফাঁসিতে ঝোলানোর আগমুহূর্তে স্পাইস বলে যান, ‘এমন একদিন আসবে যেদিন আমাদের মৃত্যু তোমরা যে কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে চাও, তার চেয়েও শক্তিশালী হবে।’ বৃথা যায়নি শ্রমিকনেতা স্পাইসের সেই সাহসী উচ্চারণ। বিশ্বে আজ শ্রমিকের আট ঘণ্টা শ্রমের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশে দেশে ১ মে স্মরণ করা হয় হে মার্কেটের বীর সেই শ্রমিকদের। ১ মে পৃথিবীর ৮০টি দেশে মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকে। এ ৮০টি দেশসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও স্বার্থ রক্ষায় এদিন বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়। এদিন শ্রমিকদের নিয়ে যারা ভাবেন, তারা স্মরণ করেন ১৮৮৬ সালে আমেরিকার হে মার্কেটে ঘটে যাওয়া করুণ কাহিনী। পয়লা মে অমর হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *