আমাদের ক্ষমতাবানরা যে কথাটি বোঝেন না

নঈম নিজাম: নাগরিকদের কাছে জবাবদিহির জন্য অফিস উন্মুক্ত করে দিয়েছেন এক মেয়র। ভেঙে ফেলেছেন মেয়র ভবনের দেয়াল। সব প্রকল্পের ব্যয়, কবে বাস্তবায়ন হবে এসব তথ্য ঝুলিয়ে রেখেছেন দেয়ালে। মানুষ অবাধে মেয়র অফিসে প্রবেশ করে। নিজেদের সুবিধা-অসুবিধা তুলে ধরে। জেনে যায় সব নগর পরিকল্পনা। এমনকি উন্নয়ন ব্যয়ও তাদের অজানা নয়। এ গল্প বাংলাদেশের কোনো মেয়রের নয়। এ গল্প তুরস্কের একজন মেয়রের। সম্প্রতি নির্বাচিত এই মেয়র বলেছেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে জবাবদিহির কোনো বিকল্প নেই। আমাদেরও এমন একজন মেয়র ছিলেন। তিনি আনিসুল হক। তাঁর কাজের ধরনও ছিল আলাদা। তিনি মেয়র থাকাকালে ঢাকাকে বদলানোর চেষ্টা করেন। উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়ে আসেন জবাবদিহিতা। উন্নয়ন প্রকল্পে বিলবোর্ড ঝুলিয়ে লিখে রাখতেন মোট ব্যয়ের পরিমাণ, কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হবে সব তথ্য। বনানী কবরস্থানের পাশ দিয়ে আসা-যাওয়ার সময় রাতে দেখতাম, প্রতিদিন কী পরিমাণ কাজ হতো তার বর্ণনাও। তিনি দীর্ঘমেয়াদি অনেক পরিকল্পনা নেন। সেসব বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। তিনি যা রেখে গেছেন আমরাও তা ধরে রাখতে পারিনি। এই নগরজীবন থেকে জবাবদিহিতা হারিয়ে গেছে। এখন কেউ কারও কাছে জবাবদিহিতায় নারাজ। জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করেন। জনগণকে কেউই মানুষ মনে করেন না। আমলারা মনে করেন, সরকারকে টিকিয়ে রেখেছেন, ক্ষমতায় এনেছেন তারা। তাই তাদের আবার জবাবদিহিতা কী? সবকিছুর ঊর্ধ্বে তারা। ঘাটে ঘাটে এখন হয়রানি। মানুষের পক্ষে কথা বলার কেউ নেই। মানুষকে বোঝারও কেউ নেই। এখন কথা বলে কিছু হয় না। মানুষ প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা নেই। এ নিয়ে কথা বলা যায় না। সরকারি কর্মকর্তাদের কাজ নিয়ে মাশরাফির বক্তব্যেও বিতর্ক হয়। সবারই মনে রাখা দরকার, তিনি শুধু ক্রিকেট ক্যাপ্টেন নন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিও। জনগণের সুখ-দুঃখ দেখার দায়িত্ব তার। অকারণে বিতর্ক তৈরি করা যায়, কিন্তু বাস্তবতা অনুধাবন করা যায় না। নিরীহ মানুষ এখন আর বিচার চাইতে থানায় যেতে চায় না। অভিযোগ করে লাভ হয় না। আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হলে এমনই হয়। সংসদ প্রাণবন্ত না হলে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন একসঙ্গে হুমকিতে পড়ে। প্রত্যাশার জায়গাগুলো শেষ হয়ে যায়। তখন সবকিছুতেই হতাশার কালো মেঘ নেমে আসে।

মাঝে মাঝে মনে হয় এই বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম? যুক্তরাষ্ট্রে বসে সিরাজুল আলম খান আমাকে একবার বলেছিলেন, নিউক্লিয়াস তারা গঠন করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। তখন তাদের বয়স ছিল খুবই কম। বঙ্গবন্ধু এই তারুণ্যকে বেছে নিয়েছিলেন দেশ স্বাধীন করার শক্তি হিসেবে। ষাটের দশকের রাজনীতিকে আরও বেশি করে সামনে আনা দরকার। ষাটের দশকের নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ কীভাবে বাস্তবায়ন করত তা সত্যিকারভাবে সামনে এলে ইতিহাসের অনেক অজানাকে জানা যাবে। বঙ্গবন্ধু ধাপে ধাপে পাকিস্তানিদের সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। জাগিয়ে তুলেছিলেন বাঙালিদের। পাঠ্যসূচিতে সবকিছুই নতুন প্রজম্মের সামনে তুলে ধরতে হবে। জানাতে হবে সব অজানা। সিরাজুল আলম খান আরও বলেছিলেন, ছাত্রনেতারা বুদ্ধিজীবীদের কাছে তখন গেলে তারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতেন। এমনকি বুদ্ধিজীবীরা তাদের বলতেন, তোমরা এই নেতার পেছনে কেন সময় নষ্ট করছ। ছাত্রনেতারা বলতেন, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন করার কথা ভাবেন। এজন্য কাজ করছেন। আর তো কেউ স্বাধীনতার কথা বলেন না। কাজও করেন না। তাই আমরা তাঁর নেতৃত্বে কাজ করছি। আমরা তাঁর নেতৃত্বে এ দেশকে স্বাধীন করবই। বুদ্ধিজীবীরা তখন থামতেন। বঙ্গবন্ধু মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে। মানুষ সেই স্বপ্ন থেকেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাই ভারত কিংবা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে আমাদের স্বাধীনতার তুলনা চলে না। আমাদের সবকিছুই আলাদা। আমরা নয় মাস যুদ্ধ করেছি। ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে এখনো অনেক বিতর্ক বেরিয়ে আসে। এমনকি ইতিহাসের ঘাটে ঘাটেও অনেক প্রশ্ন। সেসব ইতিহাস নিয়ে তাদের গবেষকরা নতুন করে কাজ করছেন। বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ আজ কোথায় যাচ্ছে? মানুষের অসহায়ত্ব দেখে মাঝে মাঝে দুঃখ হয়, কষ্ট হয়। সবকিছু থেকে নিজেকে আড়াল করে ফেলতে ইচ্ছা করে।

কদিন আগে কলকাতা গিয়েছিলাম। কলকাতা বদলে যাচ্ছে। সকালবেলায় ফ্লাইট ধরব। খালি সড়ক। ড্রাইভার সিগন্যাল ক্রস করে না। এই সকালেও আইন মেনে গাড়ি চালায়। বাসগুলো লেন মেনে চলে। বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন শেষ করে বেল্টের সামনে এলেই লাগেজ চলে আসে। বের হওয়ার সময় কাস্টমসের খারাপ ব্যবহার নেই। ইমিগ্রেশনে হয়রানি নেই। আসার দিন সকালে গিয়েছিলাম বিখ্যাত লেখক বুদ্ধদেব গুহের বাড়িতে। বিখ্যাত এই লেখকের সঙ্গে আগের দিন রাতে দেখা হয় কলকাতা প্রেস ক্লাবে। তিনি পি সি সরকারকে নিয়ে আড্ডা দিতে আসেন। বিদায় মুহূর্তে দেখা হতেই বললেন, আপনি তো আমার বাড়িতে আসার কথা কাল সকালে। এই দেখার কারণে সকালে আসা যেন বন্ধ না হয়। বললাম, ফ্লাইটের তাগাদা আছে। তবু আসব। আপনাকে দেখে যাব। তিনি বললেন, শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। চোখে দেখতেও সমস্যা। সকালে গেলাম লেখকের বাড়িতে। বুদ্ধদেব গুহের কন্যা বললেন, পাঁচটি মিনিট সময় দিন। বাবা তৈরি হচ্ছেন। আপনি একটু সময়ের আগেই এসে পৌঁছেছেন। তাই সামান্য সময়টুকু অপেক্ষা করতে হবে। বললাম, ফ্লাইটের তাড়া রয়েছে। তাই আগে আসা। কোনো সমস্যা নেই। ড্রইংরুমে বসতে চাইলে ওরা বলল, না, আপনারা দুজন ভিতরে চলে যান। বেডরুমে বসে আছেন বুদ্ধদেব গুহ। বুদ্ধদেব গুহ বললেন, আজই চলে যাবেন? বললাম, হ্যাঁ। আপনার বাড়ি থেকে বের হয়ে বিমানবন্দর। বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই এই লেখকের। বললেন, আপনাদের রাষ্ট্রপতি লোকটাকে আমার পছন্দ। ইউটিউবে তার বক্তৃতা দেখে মজা পেয়েছি। মানুষটা জমাতে পারেন। আমি বললাম, আমাদের দেশের মানুষও আপনাকে পছন্দ করে। একবার আসুন। হাওরের রাজপুত্র আমাদের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে গল্প করে আসবেন। ভালো লাগবে। তিনি বললেন, শরীর কুলালে চলে আসব। বুদ্ধদেব গুহের জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে বরিশাল ও রংপুরে। ছোটবেলার সেসব স্মৃতি এখনো তাকে তাড়া করে বেড়ায়। বাংলাদেশকে ভুলতে পারছেন না। বাংলাদেশের সেই সৌন্দর্য এখনো বুকে লালন করে চলেন। এসব দেখলে, শুনলে ভালো লাগে। কিন্তু ঘাটে ঘাটে মানুষের হয়রানি দেখলে আবার মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়। চারদিকের এসব জটিলতা আমরা এড়াতে পারি না। সমাজজীবনের পদে পদে সমস্যা। কবে সবকিছু স্বাভাবিক হবে জানি না।

দুই দিনের এই দুুনিয়ায় এত লড়াইয়ের কী আছে? ক্ষমতা নিয়ে মিথ্যা অহংকারেরও কিছু নেই। দুনিয়ার অনেক রাজা-মহারাজা ক্ষমতায় থাকতেই কষ্ট দেখে গেছেন।

আফসোস করেছেন শেষ মুহূর্তের ভোগান্তি নিয়ে। দিল্লির শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহের কথা আমাদের জানা রয়েছে। বার্মায় (বর্তমান মিয়ানমার) তাঁর কবর আমি জিয়ারত করেছি। ইংরেজ শাসকরা বাহাদুর শাহের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করেন। তাঁর সন্তানদের বেশির ভাগকে হত্যা করেন। বাদশাহকে নির্বাসনে পাঠান তখনকার বার্মার রেঙ্গুনে। বাহাদুর শাহ জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো লেখালেখি করে কাটিয়েছেন। বার্মায় নির্বাসিত জীবনে বুঝতে পারেন দিল্লিতে আর তাঁর ফেরা হবে না। কষ্টের জীবনের শেষ মুহূর্তে বাহাদুর শাহ লিখলেন-

‘মরণকে বাদ ইশকক মেরা বা আসর হুয়া উড়নে লাগি হ্যায় খাক মেরি ক্যোয়ি ইয়ার মে; কিতনা বদ নসিব হ্যায় জাফর দাফন কে লিয়ে দোগজ জমিন ভি মিলানা চুকি ক্যোয়ি ইয়ার মে’।

ক্ষমতা এমনই। একদিন যাঁর দাপটে দিল্লি কেঁপে উঠত আজ তাঁর দাফনের জন্য জমি মেলেনি নিজের শহরে। নির্বাসনের শেষ চার বছর বড় কষ্টে অতিবাহিত হয়েছে। ক্ষমতায় থাকতে আমরা তা বুঝতে পারি না। আমরা আমাদের মতো করে চলি। ক্ষমতা হারানোর পর আফসোস করি। ভুলের মূল্যায়ন করি। অথচ ক্ষমতায় থাকার সময় এ মূল্যায়ন করলে কোনো সমস্যা হয় না। ঝামেলা হয় না। বিএনপি চেয়ারপারসন কি ২০০১ সালের পর ভেবেছিলেন তাঁকে কারাভোগ করতে হবে? দলের লোকজন তাঁর কথা শুনবে না একদিন! আদেশ-নির্দেশ উপেক্ষা করেই তাঁর হাতে তৈরি সংগঠন অন্য কারও সঙ্গে গোপনে সম্পর্ক রাখবে? রাজনীতির অঙ্ক বড়ই জটিল। এ অঙ্কে একবার ভুল হলে সহজে আর ঠিক হয় না। বিএনপির এখন তা-ই হয়েছে। আমি ২০১৩ সালে বিএনপির অনেক নেতার চোখে-মুখে অহংকার দেখেছি। দেখেছি ক্ষমতায় এসে গেছি ভাব। এখন অনেক কিছু বদলে গেছে। রাজনীতিতে খোলস বদল সব যুগেই ছিল। মানুষ হঠাৎ চেহারা বদলে ফেলে। কবির কথায়- প্রেমিক যেমন খুনি হতে পারে না তেমনি সত্যিকারের রাজনৈতিক কর্মীর মত-পথ বদল হতে পারে না। কিন্তু আজকাল সবকিছুই বদলে যাচ্ছে। জীবনের চলার পথে থেমে গেছে সুরতরঙ্গ। ২০১৪ সালের পর এক প্রতিমন্ত্রী ফোন করেন একটি বিষয় নিয়ে। তাঁর কথায় ছিল ভয়ঙ্কর অহংকার। সেই তিনি এবার আর মন্ত্রী হননি। এমপি হননি। এখন হয়তো বুঝছেন ক্ষমতা আসলেই কিছু না। আজ আছি, কাল নেই। যারা এ বিষয়টি বুঝতে পারেন তাদের সমস্যা নেই। যারা বুঝতে পারেন না তাদেরই বাকি জীবন গভীর কষ্টে অতিবাহিত করতে হয়। ক্ষমতা নিয়ে অহংকার করতে হয় না। ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে হয় মানুষের কল্যাণে। দেশের সুন্দর আগামীর জন্য। আমাদের ক্ষমতাবানরা এ কথাটি বোঝেন না। সমস্যা এখানেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *