একসময় কি ছাদের নিচে ক্রিকেট খেলতে হবে?

বৈচিত্র ডেস্ক:   ‘ইংলিশ ওয়েদারের’ দুর্নাম দুনিয়াজোড়া।

এখানে এই দেখলেন ঝলমলে রোদ, তো আধঘন্টা না যেতেই আকাশ গোমড়া করে মেঘ, তার পরই হয়তো টিপটিপ করে শুরু হয়ে গেল বৃষ্টি।

পর্যটক বা ভ্রমণকারী থেকে শুরু করে এখানে নানান কাজে-কর্মে যে বিদেশীরা আসেন, তাদের সাথে ব্রিটেনে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বললেই শুনবেন – এখানকার আবহাওয়ার নিন্দা।

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলতে আসা বিদেশী ফুটবলাররাও দুর্নাম করেন এদেশের বৃষ্টি নিয়ে। ব্রিটেনের স্থানীয় লোকেরা এ জন্য ব্যাগে একখানা ছাতা নিয়ে ঘোরেন, অনেকে বুড়ো বয়েসে রৌদ্রকরোজ্জ্বল আবহাওয়ায় বাকি জীবনটা কাটানোর জন্য স্পেনে বাড়ি কেনেন।

সমস্যা হলো, এরকম একটা দেশেই বসেছে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯-এর আসর, এবং দু’সপ্তাহ যেতে না যেতেই তিনটি ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেসে গেছে।

সবশেষ যে ম্যাচটিতে বৃষ্টির কারণে একটি বলও খেলা হলো না, এবং পয়েন্ট ভাগাভাগি করে নিল দু’দল – সেটি হচ্ছে মঙ্গলবারের বাংলাদেশ-শ্রীলংকা ম্যাচ।

টিভি চ্যানেলগুলো ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে পুরোনো খেলার হাইলাইটস দেখিয়ে গেল। বাংলাদেশ বা শ্রীলংকার ক্রিকেটারদের অনেকে ব্রিস্টলের হোটেল থেকেই বেরোন নি। ধারাভাষ্যকার আর অনলাইন সাংবাদিকরা সারা দিন এটা-সেটা নিয়ে কথাবার্তা বলে-লিখে সময় পার করলেন।

অনলাইনে অসংখ্য ক্রিকেটভক্তের মুখে ছিল একটি প্রশ্ন: যে দেশের আবহাওয়া এরকম, সেখানে এই বিশ্বকাপের আয়োজন করা কতটা উচিত কাজ হয়েছে?

এ সমালোচনা হতেই পারে তবে বিশ্লেষকদের কথা: আবহাওয়ার ওপর তো কারো হাত নেই।

মনে রাখা উচিত এই ইংল্যান্ডেই কিন্তু ক্রিকেট খেলার জন্ম – এই রোদ-মেঘ-বৃষ্টির দেশেই কয়েক শতাব্দী ধরে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। টেস্ট ক্রিকেট তো বটেই, এমনকি ৫০ ওভারের ক্রিকেট বা টি২০ ক্রিকেটেরও উদ্ভব এই দেশেই।

শুধু তাই নয়, ক্রিকেট বিশ্বকাপের জন্মও এই ইংল্যান্ডে, এবং ইংল্যান্ডের মাটিতে এর আগে একটি-দুটি নয়, চার-চারবার বিশ্বকাপের আসর বসেছে।

ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ ক্রিকেট হয়েছে এর আগে ১৯৭৫, ১৯৭৯, ১৯৮৩ এবং ১৯৯৯ সালে। এটাও মানতে হবে, বৃষ্টির উপদ্রবও তখন কমবেশি হয়েছে।

বাস্তবতা হলো: ইংল্যান্ড ছাড়া অন্য দেশেও যখন বিশ্বকাপ হয়েছে, সে সময়ও বৃষ্টিতে খেলা পন্ড হয়েছে, পয়েন্ট ভাগাভাগি হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ একটি মহামূল্যবান পয়েন্ট পেয়েছিল ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ম্যাচটি বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ায় – যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে যায়। উপমহাদেশেও ২০১১ সালের বিশ্বকাপে বৃষ্টির জন্য একটি খেলা বিঘ্নিত হয়।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্মও হয়েছিল এই বৃষ্টির কারণেই।

অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের মধ্যে একটি টেস্ট ম্যাচের প্রথম তিন দিন বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ায় দর্শকদের জন্য ‘সান্ত্বনা পুরস্কার’ হিসেবেই খেলা হয়েছিল ৪০ ওভারের (অস্ট্রেলিয়ায় তখন ছিল ৮ বলে এক ওভার) প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ, ১৯৭১ সালের ৫ই জানুয়ারি।

এখন কথা হলো: এখনকার দিনে ক্রিকেট যেমন অনেক টাকার পেশাদারদের খেলা হয়ে উঠেছে, এখানে টিভি, বিজ্ঞাপন, স্পন্সর ইত্যাদি বহু রকমের বিষয় জড়িয়ে গেছে – তাই বৃষ্টিতে খেলা পন্ড হলে তো সবারই ক্ষতি।

এটা ঠেকাতে কি করা যায়?

ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে খেলা সংক্ষিপ্ত করা, রিজার্ভ ডে, পয়েন্ট ভাগাভাগি – এগুলো হচ্ছে বৃষ্টি সামাল দেবার এক ধরনের উপায় – যার প্রয়োগ সব সময়ই হচ্ছে।

কিন্তু বিশ্বকাপের মতো এত বড় টুর্নামেন্টে প্রতিটি খেলার জন্য কি রিজার্ভ ডে রাখা সম্ভব?

এ কথা জিজ্ঞেস করা হয়েছিল বাংলাদেশ কোচ স্টিভ রোডসকে। তার কথা, ইংলিশ ওয়েদারের কথা মাথায় রেখে অনেকে হয়তো রিজার্ভ ডে চাইতে পারেন কিন্তু এত লম্বা টুর্নামেন্টে এরকম ব্যবস্থা রাখা সহজ নয়।

“এটা একটা লম্বা টুর্নামেন্ট, লিগ ম্যাচের রিজার্ভ ডে রাখাটা কঠিন, কিন্তু যদি ম্যাচের পর বিরতি থাকে – তাহলে তো রিজার্ভ ডে রাখাই যেতো,” বলেন তিনি।

শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক দিমুথ করুনারত্নের কথাও তাই। “রিজার্ভ ডে থাকলে আসলে দারুণ হতো, যদিও আমি জানি যে এরকম বড় টুর্নামেন্টে সব ম্যাচের রিজার্ভ ডে রাখাটা সহজ নয়।”

কথা উঠেছে পয়েন্ট ভাগাভাগি নিয়েও । বিশ্বকাপের মত একটা টুর্নামেন্টে কি দুটো দলের ম্যাচ না খেলেও একটা করে পয়েন্ট পেয়ে যাওয়া উচিত?

এ প্রশ্ন রেখেছিলাম ক্রিকেট ইতিহাসবিদ বরিয়া মজুমদারের কাছে।

তিনি বললেন, আসলে বিশ্বকাপের মত বড় টুর্নামেন্টে প্রতিটি ম্যাচের জন্য রিজার্ভ ডে-র মত বিকল্প রাখা খুবই কঠিন।

“এতে ৫০ দিনের টুর্নামেন্টের আয়তন দ্বিগুণ হয়ে যাবে, টিভি সম্প্রচার আয়োজনের জটিলতা বেড়ে যাবে। তাই এটা সম্ভব কিনা তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। ১৯৯২ সালে বৃষ্টির জন্য দক্ষিণ আফ্রিকাকে এক বলে ২২ রান করার লক্ষ্য দেয়া হয়েছিল। চিরকাল এভাবেই ক্রিকেট খেলা হয়ে এসেছে, কেউ আবহাওয়ার জন্য সুবিধে পাচ্ছে, কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু আবহাওয়ার ওপর তো কারো হাত নেই” – বলছিলেন বরিয়া মজুমদার।

বৃষ্টির হাত থেকে উইম্বলডন টেনিস টুর্নামেন্টকে বাঁচাতে লন্ডনের সেন্টারকোর্টে সচল ঢাকনা বসানো হয়েছে। অনেক ফুটবল স্টেডিয়ামেও ঢাকনা আছে।

কিন্তু ক্রিকেটের মতো খেলায় এত বড় মাঠের স্টেডিয়ামেও কি ছাদ বসানো সম্ভব?

ক্রিকেট ইতিহাসবিদ বরিয়া মজুমদার বলছিলেন, এ পরীক্ষাও ইতিমধ্যেই করা হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে টেলস্ট্রা ডোম নামে একটি ছাদওয়ালা স্টেডিয়ামে ২০০০ সালের ১৬ই আগস্ট অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম একদিনের ম্যাচ খেলেছিল, ওই স্টেডিয়ামে মোট ৫টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়েছে।

“উইম্বলডনে সেন্টারকোর্টে ছাদ বসানোর পর অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। তাই বলা যায় না ক্রিকেটে একটা-দুটো স্টেডিয়ামে এটা হতেই পারে। কারণ এক সময় হয়তো লোকে বলবে আমরা পয়সা দিয়ে টিকিট কেটেছি, টিভি কোম্পানি বলবে (বৃষ্টির জন্য) তাদের ব্রডকাস্টে লোকসান হচ্ছে।

কিন্তু ক্রিকেট স্টেডিয়াম তো টেনিস-ফুটবলের মাঠের চেয়ে অনেক বড়, আকৃতিও অন্যরকম, তাই ক্রিকেট মাঠের ওপর কি ছাদ দেয়া সম্ভব?

“টেলস্ট্রা ডোম তো আসলে ছাদওয়ালা ফুটবল স্টেডিয়াম, সেখানে যদি ক্রিকেট ম্যাচ হতে পারে তাহলে অন্যত্র কেন সম্ভব হবে না? হয়তো ১০ বছরের মধ্যেই আমরা এরকম কোন পরিবর্তন দেখতে পাবো” – বলছিলেন বরিয়া মজুমদার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *