হুমকির মুখে চুনতি বন

বৈচিত্র ডেস্ক:  তিন কারণে হুমকির মুখে কক্সবাজার জেলার চুনতি  অভয়ারণ্য (বন)। সাধারণ মানুষের চলাচল, বেপরোয়াভাবে গাছ-গাছালি কেটে ফেলা ও বনভূমি অবৈধ দখল। এসব কারণে এ অভয়ারণ্যটি মরুভূমিতে পরিণত হবার উপক্রম হয়েছে। অনেকে বলছেন, চুনতি বন্যপ্রাণির অভয়ারণ্য এখন শুধু নামেই। হারিয়ে যেতে বসেছে বনের অবয়ব। সরজমিন এই অভয়ারণ্যে ঘুরে এমন চিত্রই  দেখা  গেছে।

এ বনের ফরেস্টার মিজানুর রহমান বলেন, প্রায় ৮ হাজার  হেক্টরের মধ্যে এখন ৬ হাজার  হেক্টর  ভূমি টিকে আছে কিনা সন্দেহ। বনের অধিকাংশ গাছ ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী। পুরনো গাছের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, বনজুড়ে অ্যাকাশিয়ার বিস্তার। বনের গাছপালা  কেটে সেখানে বিদেশি গাছ রোপণ করা হয়েছে। বন সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, নষ্ট না করলে বন পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারত। চুনতি বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য মূলত ক্রান্তীয় মিশ্র চিরসবুজ বনের অংশ। চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কের পশ্চিম পাশে  লোহাগাড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে চুনতি বনের অবস্থান। অভয়ারণ্যটি চট্টগ্রামের বাঁশখালী,  লোহাগাড়া ও কক্সবাজার  জেলার চকরিয়া উপজেলার চুনতি, অধুনগর, হারবং, পুইছড়ি, বাঁশখালী, বড়হাতিয়া এবং টইটং এলাকা নিয়ে গঠিত হয়েছে। ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে এই অভয়ারণ্যটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তার আগে এই বন চুনতি রিজার্ভ বনভূমি নামেই পরিচিত ছিল।

চুনতি বনে এক সময় প্রাকৃতিকভাবে গাছপালার মধ্যে বাইট্রা গর্জন,  তেলিয়া গর্জন, ধুলিয়া গর্জন, চাপালিশ, বাঁশ,  বেত, ফার্ন এবং বনকলা ছিল অন্যতম। এখন শুধু বিক্ষিপ্তভাবে কিছু গর্জন, ২-৪ বছর বয়সী কিছু বেত গাছ আছে। হাতেগোনা কয়েকটি চাপালিশ। দু’একটি ছোট হরিণার দেখা  মেলে। ছোট গাছের মধ্যে কাউ, জাম, দাঁতরাঙা, টগর, পিচন্ডি এখনো টিকে আছে যৎসামান্য। এ বনের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে বনকলা বা ফার্ন গাছের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পুরনো গাছ খুব একটা না থাকায় অর্কিডও প্রায় বিলুপ্ত। বনের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে একটি মাত্র ছোট হরিণার গাছ দেখা গেছে। বনতলের লতাগুল্মও নেই বললেই চলে। অনেক আগেই চোরা শিকারি ও স্থানীয় মানুষ এসব সাফসুতরো করে  ফেলেছে। বনভূমি উজাড় হওয়ায় বনের পাখি ও অন্যান্য জীবজন্তুও হুমকির মুখে পড়েছে। এক সময় প্রায় ১৮ রকমের পাখি ও জীবজন্তু এই বনের স্থায়ী বাসিন্দা থাকলেও এখন তা অলীক ভাবনা ছাড়া আর কিছুই নয়। পুরনো রেকর্ডপত্রে একসময় এই বনে বন্যশূকর, মায়াহরিণ, বানর, মেছোবাঘ ইত্যাদি প্রাণী থাকার কথা বলা হলেও এখন বাস্তবতা ভিন্ন। এ ধরনের জীবজন্তুদের থাকার জন্য বনের ভিতর গাছপালার যে ধরনের ঘনত্ব থাকা প্রয়োজন এখন  নেই। ফলে আবাসন সঙ্কট, মানুষের পদচারণা ও খাদ্যাভাবে এসব বিপন্ন হয়ে পড়েছে। হাতি এক সময় এই বনে নিয়মিত দেখা গেলেও এখন ততটা দেখা যায় না। এ বনের ভিতর দিয়ে ২১ পয়েন্টে হাতি চলাচলের পথ থাকলেও নানা কারণে সেসব এখন বিলীন হওয়ার পথে। এছাড়া বনের নিবিড়তা কমে যাওয়ায় এবং আশপাশে মানুষের আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ায় হাতি চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। সূত্রমতে, বনবিভাগ ও বনের আশপাশের অস্থায়ী বাসিন্দারাই মূলত বন ধ্বংসের মূল কারণ। প্রশাসনের নজরদারির অভাবে দীর্ঘসময় ধরে এই বনের সব বনজ সম্পদ বিলুপ্ত হয়েছে। বন বিভাগের তথ্য মতে, বনের অভ্যন্তর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ১১টি করাতকল আছে। যার সবকটিই জলদি এলাকায়। তাছাড়া অভয়ারণ্যের আশপাশে ৭টির মতো ইট-ভাটা চিহ্নিত করা হয়েছে। আবার বনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য আসবাবের  দোকান। এই চিত্র  থেকে খুব সহজেই অনুমেয় চুনতি অভয়ারণ্যের ভাগ্যে কী ঘটেছিল। আগামী দিনগুলোতে কী ঘটবে। জানতে চাইলে চুনতি বনের দায়িত্বপ্রাপ্ত  রেঞ্জার জসিম উদ্দিন বলেন, এ বন রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *