কৃষক তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়

শাইখ সিরাজ: 

প্রবাদে আছে ‘বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়’। আমাদের দেশে ফলে শুধু বৃক্ষের পরিচয়ই মেলে না। কৃষকের পরিচয়ও মেলে ফলে। পেঁপে বাদশা, পেয়ারা আতিক, কুল সিরাজুল, আম কাশেম, মাল্টা বাবুল, খেজুর মোতালেব, লিচু কিতাব, কলা কাদের। নামগুলো মোটেও কাল্পনিক নয়। দেশের প্রায় সব ফল চাষি এ নামগুলোর সঙ্গে পরিচিত। আশির দশকে পাবনার ঈশ্বরদীর সলিমপুর গ্রামের এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান মো. শাহজাহান আলী বাদশা বেকারত্ব দূরীকরণের উপায় হিসেবে বেছে নেন কৃষিকাজ। মাত্র আড়াই বিঘা জমিতে শুরু করেন আধুনিক ফল-ফসলের এক সমন্বিত কৃষি খামার। তারপর পেঁপে চাষ করে খুব অল্প সময়ে অর্থ আর খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে যান। এখন ২০০ বিঘা আয়তনের এক বিশাল কৃষি খামারের অধিকর্তা তিনি। সবার কাছে পেঁপে বাদশা নামেই পরিচিত। কৃষি ডিপ্লোমা করেও কোনো চাকরি না পেয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় আতিক আজ থেকে ১০ বছর আগে মাত্র ৬ বিঘা জমি লিজ নিয়ে শুরু করেছিলেন পেয়ারাবাগান। পেয়ারা চাষ তার ভাগ্য বদলে দিয়েছে। এখন তার বাগানের পরিধি ২৭০ বিঘার মতো। তার এ সাফল্য দেখে ওই এলাকায় বহু তরুণ যুক্ত হয়েছেন পেয়ারা চাষে। ফলে নাটোর-রাজশাহী এলাকায় অর্থকরী ফসলের অন্যতম জায়গায় পৌঁছে গেছে থাই পেয়ারা। এ রকম গল্পই কাশেম, বাবুল কিংবা কাদেরের। ফল চাষ পাল্টে দিয়েছে তাদের জীবনের গল্প। সারা দেশে এমন কৃষকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এই কৃষকের সাফল্যের পেছনে নেই কোনো অলৌকিক আলাদিনের চেরাগ। বুদ্ধি আর শ্রমেই গড়েছেন তাদের নিজ নিজ সাম্রাজ্য। পেয়েছেন কাক্সিক্ষত ফল, সাফল্য। এদের হাত ধরেই বিশে^র কাছে বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে সফলতার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে, বাংলাদেশে ১৮ বছর ধরে ফল উৎপাদন বাড়ছে ১১.৫ শতাংশ হারে। ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির সর্বোচ্চ হারের রেকর্ডটি আমাদের। শুধু তাই নয়, মৌসুমি ফল উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। এ সাফল্যে ফল চাষিদের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প’ এর কার্যক্রম আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। কারণ এ প্রকল্পের পরিচালক মেহেদী মাসুদ আমাদের ‘ছাদকৃষি’ অনুষ্ঠানের গাছের ডাক্তার। তার কাছ থেকে সব সময়ই এ প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পর্কে জেনেছি। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। দুই যুগ আগেও আম আর কাঁঠাল ছিল এ দেশের প্রধান ফল। কৃষকের আঙিনার গাছে ফলানো উদ্বৃত্ত ফল বাজারে মিলত। কৃষকের আঙিনা থেকে ফল চলে এসেছে ফসলের মাঠে। কৃষি অধিদফতরের হিসাবে এখন বাংলাদেশে ৭২ প্রজাতির ফলের চাষ হচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১.৫৭ লাখ হেক্টর জমিতে ৫০.৭ লাখ মেট্রিক টন ফল উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে আম, কলা ও কাঁঠাল এ তিনটি প্রধান ফল থেকে আসে মোট উৎপাদিত ফলের প্রায় ৬৩% (বিবিএস-২০১৮)। বাংলাদেশ কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয়, আমে সপ্তম এবং পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে রয়েছে। মৌসুমি ফল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে দশম।

শুধু ফলের উৎপাদনই বৃদ্ধি পায়নি, বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু ফল খাওয়ার পরিমাণও গত এক যুগে দ্বিগুণ হয়েছে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশের মানুষ দিনে ৫৫ গ্রাম করে ফল খেত। তা ৮৫ গ্রামে উঠে এসেছে। সুস্থসবল দেহের জন্য প্রতিদিন জনপ্রতি ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন। খুব শিগগিরই আমরা সেই লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করে ফেলব।

১০ বছর আগে বিশ্বের আম উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দশম। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে উঠে এসেছে। দেশের ফল থেকে আসা পুষ্টির চাহিদার বড় অংশের জোগান আসে আম থেকে। মনে আছে, এক যুগ আগেও আম ছিল শুধু বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ফল। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে হিমসাগর, গোপালভোগ, ল্যাংড়া ও ফজলি আমের ওপর দেশের চাষিরা নির্ভরশীল ছিলেন। আম্রপালি আম চাষের ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে দিয়েছে। বর্তমানে ৩০ জেলায় আমের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। দেশের মোট উৎপাদিত আমের ৪০ শতাংশই আম্রপালি। ২০১৭-১৮ সালে দেশে প্রায় ২৪ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়েছে। আম এখন আর মৌসুমি ফল নয়। চাষ হচ্ছে বারোমাসি আমের। চুয়াডাঙ্গার কৃষক আবুল কাশেম বারোমাসি আম চাষের অগ্রপথিক। আমাদের দেশের কৃষক যে অনন্য এবং প্রচ- ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগ দেখাতে সক্ষম তার প্রমাণ আবুল কাশেম। তিনি নিজে কখনো থাইল্যান্ড যাননি। এক পরিচিতের কাছে শুনেছিলেন থাইল্যান্ডে এক জাতের আম আছে যা বারো মাস ফল দেয়। তিনি পরিচিত জনকে অনুরোধ করে থাইল্যান্ড থেকে বারোমাসি আমের জাতের সায়ান আনালেন। অমৌসুমে সুমিষ্ট এ আমের নতুন জাত কাটিমন বাংলাদেশের মাটিতে ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। ২০০৮ সালে প্রথম এ আম রোপণ করে ১০ বছরের ব্যবধানে ২২ বিঘার বিশাল এক আমবাগান গড়েছেন। শুধু তাই নয়, আমের চারা তৈরি করেও গড়েছেন কোটি টাকার বাণিজ্য। ফল পাল্টে দিয়েছে কৃষকের হিসাব-নিকাশ। আম, কাঁঠাল, কুল, লিচু, পেয়ারা, লটকনের পাশাপাশি বিদেশি ফলের চাষ বেড়েছে এক দশকে বিপুল পরিমাণে। মাল্টা, স্ট্রবেরি, ড্রাগন, রামবুটান থেকে শুরু করে আরবি খেজুর চাষেও সফল হয়েছেন এ দেশের কৃষক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ লাখ ২২ হাজার একর জমিতে ৪৬ লাখ ৩৪ হাজার টন ফল চাষ হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ফল চাষে জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৮০ হাজার একর। আর মোট ফল উৎপাদিত হয় ৫০ লাখ ১৮ হাজার টন। ফল উৎপাদনের হার দিন দিন বেড়েই চলেছে। শহরের বাড়ির ছাদগুলোয়ও হরেক রকম ফলের চাষ হচ্ছে। মনে আছে, আশির দশকে যখন বিটিভিতে মাটি ও মানুষের প্রোগ্রাম করি, তখন বাড়ির ছাদে কাজি পেয়ার চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এখন ছাদকৃষি উদ্যোক্তারা শুধু পেয়ারাই নয়, আখ থেকে শুরু করে জামরুল, ড্রাগন, পেঁপে, জলপাই, তেঁতুল এবং বিদেশি ফলের মধ্যে ত্বিন, এমনকি কলাও চাষ করছেন। ফল চাষের এ বিস্তারে দেশের নার্সারিগুলোর ভূমিকাও অপরিসীম। কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী দেশে নিবন্ধনকৃত নার্সারির সংখ্যা ১৮ হাজার। অনিবন্ধিত নার্সারির সংখ্যা আরও বেশি। বিনিয়োগের পরিমাণ ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। ৫ লাখের অধিক মানুষ এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব নার্সারিতে দেশি ফলের পাশাপাশি বিদেশি ফলের বিভিন্ন জাতের চারা পাওয়া যায়। নার্সারিগুলোও জাত উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। তবে অনেকেই কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি অনুসরণ না করে দেশের বাইরে থেকে সায়ান, গাছের চারা, বীজ নিয়ে আসছে। সে বিষয়ে সচেতন হতে হবে, কারণ ফাইটো স্যানিটারি সার্টিফিকেশন নিশ্চিত না হলে বৃক্ষের জন্য ক্ষতিকর জীবাণুও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফল চাষে বাংলাদেশের সাফল্য সত্যিই আশাজাগানিয়া। তবে ফল চাষিদের বেশ কিছু সমস্যার কথা আমি শুনেছি। যেমন বরিশাল ও দেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচুর পেয়ারার চাষ হয়, কিন্তু মৌসুমে পেয়ারার কোনো দাম কৃষক পায় না। কারণ পেয়ারা সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। নেই পেয়ারা থেকে জ্যাম-জেলি তৈরির কোনো কারখানা। ফলে কৃষক তার উৎপাদিত ফল নিয়ে পড়ে সমস্যায়। এ সমস্যা শুধু পেয়ারার ক্ষেত্রেই নয়, আনারস কিংবা আমের ক্ষেত্রেও। বাজার তৈরি করতে ফলের রপ্তানি রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। রপ্তানির জন্য কমপ্লায়েন্স মেনে ফল উৎপাদন ও বাজারজাত করা গেলে এটি হবে কৃষির সোনালি খাত। লেখাটি শেষ করার আগে সাম্প্রতিক সময়ের একটি ঘটনার কথা বলতে চাই। আমরা জানি সুমিষ্ট আমের দেশ হিসেবে ফিলিপাইনের খুব সুনাম রয়েছে। এ বছর ফিলিপাইনে আমের ফলন খুব ভালো হয়েছে। এত ভালো হয়েছে যে, ২ মিলিয়ন কেজি আম বেশি উৎপাদিত হয়েছে। ফলে আমের দাম পাচ্ছে না কৃষক। বাজার অর্থনীতিতে এমনটা ঘটতেই পারে। সে দেশের কৃষি বিভাগ আম চাষিদের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা খুব দ্রুত সময়ে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। যেমন ‘মেট্রো ম্যাংগো’ নামে একটা কার্যক্রমের কথা বলা যেতে পারে। তারা বিভিন্ন শহরে আম বিক্রির জন্য অসংখ্য স্টল তৈরি করেছে। আম রপ্তানির ব্যবস্থা করেছে। ওয়ালমার্ট কৃষকের আমের জন্য বিনামূল্যে স্টল বরাদ্দ দিয়েছে। সবাই মিলে দাঁড়িয়েছে কৃষকের পাশে। কারণ কৃষক একবার হেরে গেলে সমগ্র কৃষির ওপরই এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে।

আমাদের দেশেও ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের এগিয়ে আসা। আমাদের দেশে উৎপাদিত পেয়ারা থেকে জ্যাম-জেলির শিল্পকারখানা হতে পারে। আনারস থেকে হতে পারে জুস। এ ছাড়া মাল্টা, তরমুজ, বাঙ্গিসহ নানা ফল থেকে তৈরি হতে পারে নানান জাতের খাদ্যদ্রব্য। ফল নিয়ে আমাদের সম্ভাবনার ক্ষেত্রটা অনেক বড়। সারা বিশে^ই ফলের বড় একটি বাজার আছে। তা মাথায় রেখে ফল চাষ নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। তৈরি করতে হবে ফল সংরক্ষণাগার ও বাজার কাঠামো। সরকারের পাশাপাশি ফলকে নিয়ে বাণিজ্যের ক্ষেত্র তৈরি করতে এগিয়ে আসতে হবে শিল্পোদ্যোক্তাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *