৩১ বছরে এগারো বিচারক বদল

বৈচিত্র ডেস্ক:  পুরান ঢাকার চাঞ্চল্যকর সীমা হত্যা মামলার বিচার ৩১ বছরেও শেষ হয়নি। ফরেনসিক বিভাগের এক চিকিৎসকের সাক্ষ্যের অভাবে মামলাটি ঝুলে আছে।

সীমার পরিবারের সদস্য ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, আসামি ধরতে পুলিশ প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ নেই। একই সঙ্গে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সাক্ষ্য দেয়ার অনীহায় বিচারকাজ আরও বিলম্বিত হচ্ছে। একের পর এক সমন জারির পরও বিচারিক আদালতে তাকে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না।

সাক্ষীকে হাজির করতে বিচারক বেশ কয়েকটি আদেশও দিয়েছেন। একটি সূত্র জানায়, অনেক আগেই ডা. মো. আনোয়ার হোসেন অবসরে গেছেন। তবে বর্তমানে একটি বেসরকারি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি চাকরি করছেন। ওই ঠিকানায় আদালতের সমন পৌঁছে কিনা তাও কেউ বলতে পারছেন না।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের বিশেষ পিপি আনোয়ার সাদাত শাওন  বলেন, মামলাটি ঢাকার জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক চমন বেগম চৌধুরীর আদালতে বিচারাধীন। এ মামলায় এ পর্যন্ত পাঁচজনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। মামলার বাদীর প্রতিও শতবার ওয়ারেন্ট দেয়া হয়েছে।

পরে আমরা জানতে পরেছি তিনি মারা গেছেন। বাদীপক্ষের কোনো আইনজীবী ও তদবিরকারী নেই। আমরা ওয়ারেন্ট দিয়েও সাক্ষী আনতে পারেনি। সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না। আগামী আগস্টে সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য আছে। তিনি বলেন, ডকুমেন্টারি সাক্ষী হলেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক। ফৌজদারি কার্যবিধির ৭২ ধারায় তাকে নোটিশ দিয়েছি। সরকারকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে। তিনি যেখানেই থাকুন আদালতে আনা প্রয়োজন।

বর্তমানে বাদীর পক্ষে কেউ না থাকায় রাষ্ট্র বাদী হয়েছে। এ মামলায় আসামির পক্ষে সরকারি খরচে আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পাঁচজন সাক্ষীকে ওই আইনজীবী জেরা করেছেন। আমরা চাচ্ছি মামলাটি দ্রুত যেন শেষ হয়। পিপি শাওন আরও বলেন, আসামি জামিনে যাওয়ার পর আর আসেনি। সে এখন পলাতক। তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট হয়েছে। আশা করছি চিকিৎসক সাক্ষ্য দিলেই মামলাটি শেষ হবে।

১৯৮৮ সালের ২৬ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টায় লালবাগের ১৬৬ জগন্নাথ সাহা রোডের বাড়িতে ঢুকে ছুরিকাঘাতে সীমাকে হত্যা করে অভিযুক্ত আমিন। বিয়ে করতে না পেরে সে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ওই ঘটনার পরপরই লালবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন সীমার মা ইজহার মোহাম্মদী। দুই মাস পর ২৫ জুন আহাম্মদ ওরফে আমিনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। আদালত থেকে আসামিকে হাজিরের জন্য ১৯৯৯ সালের ২২ জুন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়।

২০০১ সালের ২৯ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের পরও সাক্ষ্য দিতে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের অনীহার কারণে মামলার বিচারকাজ বারবার পিছিয়ে যায়। অজামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের তৎকালীন প্রভাষক আনোয়ার হোসেন সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির হননি। ওই চিকিৎসককে এ পর্যন্ত অর্ধশত অজামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা পাঠানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবরও তাকে আদালতে হাজির করানোর জন্য নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের এক কর্মচারী বলেন, তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তার বর্তমান কর্মস্থলের ঠিকানাও পাওয়া গেছে। মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ আগামী ৫ আগস্ট। এদিকে পলাতক আমিন সম্প্রতি হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন করেছে বলে জানা গেছে।

এদিকে মামলার আসামি আমিনের পেশা ও ঠিকানা উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। অভিযোগপত্রে তার বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনাও নেই। এতে বলা হয়, মো. জামিলের ছেলে আমিন থাকত তার ভগ্নিপতি মাহতাবের ১৪/৮ শাজাহান রোডের বাসায়। তবে আমিন প্রায়ই পুরান ঢাকার উর্দু রোডের একটি বোর্ডিংয়ে রাতযাপন করত। সীমা হত্যার পরদিন থেকে আর ওই বোর্ডিংয়ে সে যায়নি। সেখান থেকে তার ট্রাঙ্ক ও জামাকাপড় উদ্ধার করে পুলিশ।

সীমার ভাই মবিনুর রহমান বলেন, ঘটনার সময় আমি ছোট ছিলাম। তেমন কিছু মনে নেই। এরপরও আমি ২০০৮ সালে সাক্ষ্য দিয়েছি। মামলার খবর কী তাও জানি না। তবে সীমা হত্যার বিচার চাই।

এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ  বলেন, বিলম্বিত বিচার হল বিচারহীনতার অন্যতম কারণ। ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বড় বাধা।

এ থেকে পরিত্রাণ পেতে সরকারকে মহাপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে হলে কোনোরকম মুলতবি ছাড়া শুনানি করতে হবে। সাক্ষীদের দায়িত্ববোধ থেকে সাক্ষ্য দিতে হবে এবং সাক্ষী হাজির করতে সংশ্লিষ্টদের যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *