গ্রেডিং পদ্ধতি সংস্কার: জেএসসিতে প্রবর্তন হচ্ছে না জিপিএ-৪

বৈচিত্র ডেস্ক:   পাবলিক পরীক্ষার ফল তৈরিতে বিদ্যমান গ্রেডিং পদ্ধতি সংস্কার প্রক্রিয়া পিছিয়ে গেছে। চলতি বছরের জেএসসি ও সমমানের পরীক্ষা থেকে পদ্ধতি সংস্কারের চিন্তা-ভাবনা করা হয়েছিল। প্রস্তুতি ও পরামর্শ কার্যক্রম শেষ না হওয়ায় তা হচ্ছে না। তবে কবে হবে তা চূড়ান্ত হয়নি।

অন্যদিকে সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপনের পর বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব আলোচনা করতে গিয়ে জিপিএর (গ্রেড পয়েন্ট অ্যাভারেজ) পরিবর্তে শুধু ‘জিপি’-তে (গ্রেড পয়েন্ট) ফল তৈরির প্রস্তাবও এসেছে।

বিদেশি কারিকুলামে (ইংরেজি মাধ্যম) অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ফল জিপি পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়। এ ছাড়া দেশে উচ্চ মাধ্যমিক এবং বুয়েটসহ বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বিষয়ভিত্তিক জিপি মূল্যায়িত হয়।

বিদেশেও ভর্তির ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক প্রাপ্ত জিপি মূল্যায়ন করা হয়। এসব কারণে সংস্কার আনার ক্ষেত্রে এখন জিপিএর পাশাপাশি ‘জিপি’ও আলোচনায় এসেছে।

জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বুধবার যুগান্তরকে বলেন, সনাতনী পদ্ধতি বাতিল করে ২০০১ সালে জিপিএ চালু করা হয়। ইতিমধ্যে ১৮ বছর চলে যাওয়ায় এ পদ্ধতি সংস্কারের বিষয়টি সময়ের দাবি। কিন্তু আমরা হুট করে বা একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন কিছু চাপিয়ে দেব না। এ জন্য শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, অভিভাবক এবং সাংবাদিকসহ অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। সেটি শেষ করে পদ্ধতিটি চালু করা হবে। আমরা এখন সেই সময়টা নিচ্ছি। পাশাপাশি এর প্রস্তুতিমূলক কাজ চলছে।

১০ জুন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভায় গ্রেডিং পদ্ধতির সংস্কার প্রস্তাব তোলা হয়। এ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। এতে পাবলিক পরীক্ষায় বিদ্যমান শিক্ষার্থীর ফলের সর্বোচ্চ ধাপ (স্কেল) জিপিএ-৫-এর জিপিএ-৪ করার প্রস্তাব করা হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব জানান, এ সভা থেকে প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি পরিবর্তনের আগে অধিক পর্যালোচনার পরামর্শ দেন শিক্ষামন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো এড়িয়ে প্রমাণ ও উপাত্তের (অ্যাভিডেন্স অ্যান্ড ডেটা) ওপর নির্ভর করারও পরামর্শ দেন তিনি। এরপর এ পদ্ধতি সংস্কারের উদ্যোক্তারা গতি কমিয়ে দেন।

অন্যদিকে বিষয়টি নানাভাবে গণমাধ্যমে উপস্থাপিত হওয়ায় এ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও ভুল বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্বিগ্ন অনেকে এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এমন পরিস্থিতিতে এ পদ্ধতি সংস্কারের আগে আরও বেশি পর্যালোচনার ব্যাপারে মন্ত্রণালয় থেকে পরামর্শ দেয়া হয়। এ কারণে আসন্ন জেএসসিতে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও সেই চিন্তা থেকে সরে আসা হয়েছে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, গ্রেডিং পদ্ধতিতে একটি মাত্র পরীক্ষার ফলকে সাধারণত জিপিএ (বিভিন্ন বিষয়ে প্রাপ্ত গ্রেডের গড়) বলা হয়। আর একাধিক পরীক্ষার ফল নিয়ে যখন চূড়ান্ত ফলাফল তৈরি করা হয় তখন সেটিকে বলা হয় সিজিপিএ (কিউমুলেটিভ গ্রেড পয়েন্টস অ্যাভারেজ)।

সাধারণত অনার্স পর্যায়ে একাধিক বর্ষের পরীক্ষার ফল নিয়ে অনার্স চূড়ান্ত পর্বে যে ফল তৈরি করা হয় সেটিকে সিজিপিএ বলা হয়। আর জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি বা সমমানের স্তরে একটি পরীক্ষার ফল হওয়ায় এটাকে জিপিএ বলা হয়।

আর প্রত্যেক বিষয়ের আলাদা প্রাপ্ত পয়েন্টকে (নম্বরের গ্রেড) বলা হয় জিপি। দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে গবেষণা ও সুপারিশ করে থাকে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট (বেডু)।

এ সংস্থার পরিচালক অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরী বুধবার যুগান্তরকে বলেন, সংস্কার প্রস্তাব আসার পর আমরা বিভিন্ন মডেল তৈরির কাজ করছি। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক চর্চা, বিভিন্ন দৃষ্টান্ত এবং শিক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা, পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই চলছে। বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। কেননা প্রমাণ ও উপাত্তের জন্য ট্রাইআউট (পদ্ধতির পরীক্ষা) ও পাইলটিং (পরীক্ষামূলক প্রবর্তন) দরকার। এরপর প্রাপ্ত উপাত্ত যাচাই এবং বিশ্লেষণ দরকার। মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত প্রমাণ ও উপাত্ত নিয়ে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ও কর্মশালার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আছে প্রস্তাব অনুমোদনে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এসব কাজের জন্যই সময় প্রয়োজন হবে।

এদিকে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে কার্যক্রম চলাকালীন নানা মডেল বিশেষজ্ঞদের সামনে চলে এসেছে বলে জানা গেছে। বেডুর কর্মকর্তারা জানান, উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে যেসব দেশে বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েটরা উচ্চশিক্ষার জন্য গমন করেন, সেসব দেশে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শুধু গড় গ্রেড নিয়ে সমন্বিত রেজাল্ট তৈরির ধারণা আছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ফলাফল গড় করা হয়।

অর্থাৎ ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের প্রাপ্ত গ্রেডের সঙ্গে রসায়ন বা গণিতের গ্রেডের গড় বা সমন্বয় করে সমন্বিত ফল করা হয় না। এ বিষয়টি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ব্রিটিশ, অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডার কারিকুলামের ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষায় প্রচলিত আছে। সেখানে শুধু বিষয়ভিত্তিক স্বতন্ত্র ফল ট্রান্সক্রিপ্টে তুলে ধরা হয়।

এরপর উচ্চশিক্ষায় আবেদন করলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিষয়ভিত্তিক রেজাল্ট দেখে থাকে। অন্যদিকে বর্তমানে জিপিএ-৫ পাওয়ার এক ধরনের প্রতিযোগিতা সমাজে সৃষ্টি হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

তাই প্রতিযোগিতা বন্ধ করে বিষয়ের প্রতি মনোনিবেশ কেন্দ্রীভূত করতে শুধু জিপিতে ফল প্রকাশের প্রস্তাবও আসছে। তবে বিদ্যমান ব্যবস্থা বহালের প্রস্তাবও আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত কী হবে সেটা নীতিনির্ধারক ঠিক করবেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *