হুমায়ূনের ভুবন থেকে

বৈচিত্র ডেস্ক: ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ লড়াইয়ের এক পর্যায়ে ২০১২ সালে তুলি প্যাস্টেল নিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করেন কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর ছবি যেমন বাঙময়, তেমনই তিনি নিজের লেখার মতো উদ্ভাসিত তাঁর উৎসর্গপত্রে। হুমায়ূনের আঁকা ছবি আর কয়েকটি গ্রন্থের উৎসর্গপত্রে অন্য এক হুমায়ূনকে জানা যায়…

তাঁর নির্বাচিত উৎসর্গপত্র

নন্দিত নরকে

নন্দিত নরকবাসী মা-বাবা, ভাইবোনদের

রূপার পালঙ্ক

একবার একজন লেখক আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। আমাদের তিনকন্যা যে যেখানে ছিলো, লেখকের নাম শুনে উড়ে চলে এলো। আমার মেজো মেয়ে বলল, এতো বড় লেখকের সামনে সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। তার না-কি পা ঝিমঝিম করছে। আমি তখন লেখককে দেখছিলাম না, মুগ্ধ হয়ে আমার তিনকন্যার উচ্ছ্বাস দেখছিলাম।

সেই লেখকের নাম-
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

হুমায়ূন আহমেদের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস
ভালবেসে যদি সুখ নাহি তবে কেন,
তবে কেন মিছে ভালোবাসা
… গুলতেকিনকে

দারুচিনি দ্বীপ
মা মনি নোভা আহমেদ

এই উপন্যাসের পাণ্ডুলিপির প্রথম পাঠিকা নবম শ্রেণীর বালিকা আমার বড় মেয়ে নোভা আহমেদ। সে বই শেষ করেই আমাকে বললো, আমার যখন একুশ বছর বয়স হবে তখন কি তুমি আমাকে এই বইয়ের নায়িকার মতো একা একা সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ড যেতে দেবে? আমি বললাম- না।

সে কঠিন গলায় বলল, তাহলে তুমি এই বইয়ে মিথ্যা কথা কেন লিখলে? আমি তার অভিমানী চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে বাধ্য হলাম-আচ্ছা যাও তোমাকেও যেতে দেবো।

চলে যায় বসন্তের দিন
আমার একটি খুব প্রিয় গান আছে, গিয়াসউদ্দিন সাহেবের লেখা ‘মরণ সঙ্গীত’- ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায়’।

প্রায়ই ভাবি আমি মারা গেছি, শবদেহ বিছানায় পড়ে আছে, একজন কেউ গভীর আবেগে গাইছে- ‘মরিলে কান্দিস না আমার দায় …’

‘নক্ষত্রের রাত’ নামের ধারাবাহিক নাটকের শুটিং ফ্লোরে আমি আমার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। এবং একজন কে দায়িত্ব দিলাম গানটি বিশেষ সময়ে গাইতে। সে রাজি হলো। উৎসর্গ পত্রের মাধ্যমে তাকে ঘটনাটি মনে করিয়ে দিচ্ছি। আমার ধারণা সময় এসে গেছে।

মেহের আফরোজ শাওন

এই মেঘ, রৌদ্রছায়া
ছবি পাড়ায় আমার ছোট্ট একটা অফিস আছে। সেই অফিসে রোজ দুপুরবেলা অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ উপস্থিত হয় এবং হাসিমুখে বলে, ভাত খেতে এসেছি। সে আসলে আসে কিছুক্ষণ গল্প করার জন্যে। ইদানীং মাহফুজ খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দুপুরবেলা তার হাসিমুখ দেখতে পাই না। মাহফুজ কি জানে, প্রতিদিন দুপুরে আমি মনে মনে তার জন্যে অপেক্ষা করি?

দিঘির জলে কার ছায়া গো

কন্যা লীলাবতীকে। এই উপন্যাসের নায়িকা লীলা। আমার মেয়ে লীলাবতীর নামে নাম। লীলাবতী কোনোদিন বড় হবে না। আমি কল্পনায় তাকে বড় করেছি। চেষ্টা করেছি ভালোবাসায় মাখামাখি একটি জীবন তাকে দিতে। মা লীলাবতী : নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।

লিলুয়া বাতাস

দীর্ঘদিন কেউ আমার পাশে থাকে না, একসময় দূরে সরে যায়।

হঠাৎ হঠাৎ এক আধজন পাওয়া যায় যারা ঝুলেই থাকে, যেমন অভিনেতা ফারুক।

লিলুয়া বাতাস বইটি তার জন্যে।

পরম করুণাময় তার হৃদয়ে লিলুয়া বাতাস বইয়ে দেবেন, এই আমার শুভ কামনা।

ফারুক আহমেদ

সুকনিষ্ঠেষু

দেখা না-দেখা

নিষাদ হুমায়ূন, তুমি যখন বাবার লেখা এই ভ্রমণ কাহিনী পড়তে শুরু করবে তখন আমি হয়তোবা অন্য এক ভ্রমণে বের হয়েছি। অদ্ভুত সেই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কাউকেই জানাতে পারব না। আফসোস!

আমার প্রিয় ভৌতিক গল্প

আমার তিন কন্যা বিপাশা, শীলা, নোভা।

এরা ভূত বিশ্বাস করে না, কিন্তু ভূতের ভয়ে অস্থির হয়ে থাকে। প্রায়ই দেখা যায় তিন কন্যা ঠাসাঠাসি করে এক বিছানায় ঘুমুচ্ছে, কারণ কেউ একজন ভয় পেয়েছে।

সেদিন চৈত্রমাস

আমি লক্ষ্য করে দেখেছি অতি বুদ্ধিমান কেউ কখনো ভাল মানুষ হয় না। মারুফ তার ব্যতিক্রম। আচ্ছা তার সমস্যাটা কি?

মারুফুল ইসলাম
ভালমানুষেষু

আজ আমি কোথাও যাবো না

মানুষ পৃথিবীতে এসেছে পঞ্চ ইন্দ্রিয় নিয়ে। শোনা যায় কিছু মহাসৌভাগ্যবান মানুষ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় নিয়েও আসেন। আমার কপাল মন্দ, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দূরের কথা পঞ্চম ইন্দ্রিয়ের এক ইন্দ্রিয় কাজ করে না। দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে আমি কোন কিছুর গন্ধ পাই না। ফুলের ঘ্রাণ, লেবুর ঘ্রাণ, ভেজা মাটির ঘ্রাণ … কোন কিছুই না।

এদেশের এবং বিদেশের অনেক ডাক্তার দেখালাম। সবাই বললেন, যে নার্ভ গন্ধের সিগন্যাল মস্তিস্কে নিয়ে যায় সেই নার্ভ নষ্ট হয়ে গেছে। সেটা আর ঠিক হবে না। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে গন্ধবিহীন জগৎ স্বীকার করে নিলাম।

কী আশ্চর্য কথা, অল্পবয়স্ক এক ডাক্তার আমার জগতকে সৌরভময় করতে এগিয়ে এলেন। দীর্ঘ পনেরো বছর পর হঠাৎ লেবু ফুলের গন্ধ পেয়ে অভিভূত হয়ে বললাম, এ-কী!

যিনি আমার জগৎ সৌরভময় করেছেন, তাঁর নিজস্ব ভুবনে শত বর্ণের শত গন্ধের, শত পুষ্প আজীবন ফুটে থাকুক- এই আমার তাঁর প্রতি শুভ কামনা।

ডা. জাহিদ

পুতুল
নীলু, কল্যাণীয়াসু
‘কতো না দিন রাতি
তুমি ছিলে আমার খেলার সাথী’

মানবী
মেহের আফরোজ শাওন
সুকল্যাণ হাসে
প্রসন্ন হাসি আজ
দিতে হবে দাসে

বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল

উপন্যাস লেখার একটা পর্যায়ে

উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে

রক্তমাংসের মানুষ মনে হতে থাকে।

তাদেরকে কি বই উৎসর্গ করা যুক্তিযুক্ত না?

হেদায়েতের বড় ভাই বেলায়েতকে।

মধ্যাহ্ন প্রথম খণ্ড
মেহের আফরোজ শাওন।

পরম করুণাময় ত্রিভুবনের শ্রেষ্ঠ উপহার তাকে দিয়েছেন। তার কোলভর্তি নিষাদ নামের কোমল জোছনা। আমার মতো অভাজন তাকে কি দিতে পারে? আমি দিলাম মধ্যাহ্ন। তার কোলে জোছনা, মাথার উপর মধ্যাহ্ন। খারাপ কি?

মধ্যাহ্ন দ্বিতীয় খণ্ড

বোবায় ধরা নামের একটি জটিল ব্যাধি আমার আছে। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মনে হয় বিকট দর্শন জন্তুর মতো কয়েকটি অতিপ্রাকৃত প্রাণী আমার বুকে বসেছে। গলা চেপে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে। আতঙ্কে আমি অস্থির হয়ে চিৎকার করতে থাকি। তখন একটা কোমল স্পর্শ আমার কপালে পৌঁছে। গভীর মমতায় একজন বলে, ‘এই তো আমি আছি’। আমার ঘুম ভাঙে, আমি স্বাভাবিক হই।

মমতাময়ী শাওনকে।

জোছনা ও জননীর গল্প
আমার মা বেগম আয়েশা আক্তার খাতুন
বাবা [শহীদ] ফয়জুর রহমান আহমেদ

মাতাল হাওয়া
কোন মৃত মানুষ মহান আন্দোলন চালিয়ে নিতে পারেন না। একজন পেরেছিলেন।
আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান
তাঁর রক্তমাখা শার্ট ছিলো ঊনসত্তরের
গণআন্দোলনের চালিকাশক্তি

আজ দুপুরে তোমার নিমন্ত্রণ
বৃক্ষদের!
যাদের কারণে গল্পগুলি লেখা হয়েছে

শুভ্র গেছে বনে
শুভ্রর মতো কাউকে কি আমি চিনি, যাকে এই বই উৎসর্গ করা যায়? না, চিনি না। প্রকৃতি শুদ্ধতম মানুষ তৈরি করে না। কিছু-না-কিছু খাদ ঢুকিয়ে দেয়।

এই বই আমার অচেনা সেইসব মানুষের জন্যে, যারা জানেন তাদের হৃদয় শুভ্রর মতোই শুভ্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *