কোরবানির মাংস সংরক্ষণের উপায়

বৈচিত্র ডেস্ক: ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি করেন। তাই এই ঈদে মাংস সঠিক নিয়মে বিতরণের পর অতিথিদের আপ্যায়ন, নিজেদের খাওয়া-দাওয়ার পর যে মাংসটা থেকে যায় সেটা তাজা ও টাটকা রাখাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটা তখনই সম্ভব হয় যখন মাংসটা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যাবে।

প্রথমেই খেয়াল রাখতে হবে কোরবানির মাংস বাসায় আসার পর খোলা অবস্থায় অনেকক্ষণ ফেলে না রেখে ৪-৫ ঘণ্টার মাঝেই তা সংরক্ষণ করতে হবে। তবে সেটা এমনভাবে করতে হবে, যেন এর স্বাদ ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে। অনেকেই চিন্তিত থাকেন কত দিন মাংস ফ্রিজে রাখা যায় সেটি নিয়ে।

পশু জবাই করার পর সঙ্গে সঙ্গেই রান্না করা বা ফ্রিজে রাখা যাবে না। কারণ, কোরবানির পর অন্তত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা মাংস শক্ত থাকে। মাংস একটু নরম হওয়ার পর ধুয়ে পানি ভালো করে ঝরিয়ে রান্না করতে পারেন এবং ফ্রিজে রাখতে পারেন। এতে মাংস রান্না করার পর সুস্বাদু হবে এবং ফ্রিজে রাখলে অনেক দিন ভালো থাকবে।

কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করার সঠিক কয়েকটি পদ্ধতি উল্লেখ করা হল : মাংস সংরক্ষণের বেশ কয়েকটির পদ্ধতির মাঝে ফ্রিজে রেখে, জ্বাল দিয়ে, রান্না করে ও রোদে শুকিয়ে অন্যতম। আমরা অনেকেই পদ্ধতিগুলো জানলেও সঠিক নিয়ম জানার অভাবে কোরবানির মাংস নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই সংরক্ষণের পদ্ধতিগুলোর সঙ্গে সঠিক ধাপগুলোও উল্লেখ করলাম।

ফ্রিজে সংরক্ষণ : ঈদের আগেই ফ্রিজ পরিষ্কার করে নিতে হবে এবং ফ্রিজের তাপমাত্রা ঠিক আছে কিনা চেক করতে হবে। ফ্রিজে একই সঙ্গে যেমন মাছ ও মাংস রাখা যাবে না ঠিক তেমনি কাঁচা ও রান্না করা মাংসও একসঙ্গে রাখবেন না জীবাণুর আক্রমণ ও ক্রস-কন্টামিনেশনের ঝুঁকি এড়াতে।

ফ্রিজে রাখার সময় বড় চাকা মাংস না রেখে টুকরো করে রাখতে হবে। আবার একদম ছোট টুকরো করলে ভেতরে পানি জমে থাকে এবং ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে। তাই ফ্রিজে মাংস রাখার আগে রক্ত, চর্বি, পানি পরিষ্কার করে ঝরিয়ে নিতে হবে।

প্রয়োজন অনুসারে ছোট ছোট প্যাকেট করে রাখলে মাংস বরফ হবে তাড়াতাড়ি আর মাংস বের করতেও সুবিধা হবে এছাড়া পুষ্টিগুণও নষ্ট হবে কম। তবে গোল করে চেপে প্যাকেট না করে বিছিয়ে প্যাকেট করলে তাড়াতাড়ি বরফ হয়ে বেশি দিন ভালো থাকে।

মাংস রাখার একদিন পর ফ্রস্ট ফ্রিজের ক্ষেত্রে প্যাকেটগুলো একটু নড়িয়ে দিতে হবে যেন শক্তভাবে না লেগে যায়। ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেলে বারবার ফ্রিজ না খোলাই ভালো।

মাংস এয়ার টাইট বক্স, মোটা পলিথিনের ব্যাগে বা অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে মুড়িয়ে চেপে বাতাস বের করে রাখতে হবে। বাতাস ঢুকলে ব্যাকটেরিয়া জন্মায়। কোনো অবস্থায়ই খোলা বাটি বা ট্রেতে মাংস ফ্রিজে রাখবেন না।

অনেকে খবরের কাগজে মুড়িয়ে পলিথিনে ঢুকিয়ে মাংস ফ্রিজে রাখেন এটা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এতে খবরের কাগজের বিষাক্ত কালি মাংসের সঙ্গে মিশে যায়। এক্ষেত্রে বাটার পেপার বা ফয়েল পেপার ব্যবহার করতে পারেন। মাংস ফ্রিজে রাখার আগে প্যাকেটের গায়ে তারিখ লিখে রাখুন।

এতে মাংসগুলো কত দিন সংরক্ষণ করা হয়েছে সেটা বোঝা যাবে। আবার যদি প্যাকেটে কিসের মাংস, কোন অংশের মাংস সেটা লিখে রাখা হয় সেটা সহজে বের করা ও খুঁজে পাওয়াও সহজ হয়।

কাঁচা অবস্থায় মাংস ডিপ ফ্রিজে মাইনাস ১৮ থেকে মাইনাস ২২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপে রাখতে হবে। এভাবে গরুর মাংস ৮-১০ মাস, খাসির মাংস ৫-৬ মাস, উট, মহিষ ৬ মাস, ভেড়া রাখা যাবে ২-৩ মাস। মাথা, মগজ ও কলিজা বেশি দিন ফ্রিজে না রাখাই ভালো।

তবে সবকিছু ১-৩ মাসের মাঝে সব কিছু অবশ্যই শেষ করে ফেলা উচিত, কারণ যতদিন যাবে খাবারের গুণগত ও পুষ্টিগত মান ততই কমতে থাকে। এছাড়া কিমা করা মাংস ৩ মাস পর্যন্ত ডিপ ফ্রিজে থাকে। রান্নার জন্য প্রসেস করা কাঁচা মাংস নরমাল ফ্রিজের চিল্ড কম্পার্টমেন্টে ১-২ দিন রাখা যায়।

তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই ফ্রিজের তাপমাত্রা ঠিক থাকতে হবে। চিল্ড কম্পার্টমেন্টের তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি থেকে ৩ ডিগ্রিতে থাকতে হবে। রান্না করা মাংস বা বিভিন্ন প্রসেস করা মাংস এয়ার টাইট বক্স বা প্যাকেটে ৩ মাস পর্যন্ত রাখা যায়। তবে অবশ্যই পুষ্টিগুণ টাটকা মাংসের মতো থাকবে না।

রান্না করে সংরক্ষণ : নরমাল ফ্রিজে ৩ দিন পর্যন্ত রান্না করা মাংস ভালো থাকে। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই নরমাল ফ্রিজের তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি থেকে সর্বোচ্চ ৪ ডিগ্রিতে থাকতে হবে। এর চেয়ে বেশি দিন রাখলে স্বাদ ও পুষ্টি দুটোই নষ্ট হয়ে যায়।

রান্না করা মাংসগুলো প্রয়োজন অনুসারে ছোট ছোট বাক্সে রাখুন। ফ্রিজ থেকে বের করে মাংস গরম করে সেটা তখন শেষ করে ফেলতে হবে। গরম করা মাংস আবার ফ্রিজে রাখলে স্বাদ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি খাবারটাও ভালো থাকে না। সেটা খেলে পেটের অসুখসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

জ্বাল দিয়ে মাংস সংরক্ষণ : জ্বাল দিয়ে মাংস সংরক্ষণ করতে মাংসে চর্বির পরিমাণ একটু বেশি থাকাই ভালো। কারণ এতে মাংস দীর্ঘদিন ভালো থাকে। মাংস আনার ৬-৭ ঘণ্টা পর লবণ ও হলুদ দিয়ে একটি বড় হাঁড়িতে মাংস জ্বাল দিয়ে রাখতে পারেন (১০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা)।

এতে মাংসের ভেতরের অন্যান্য জীবাণু মরে যায়। এভাবে গরমকালে ১২ ঘণ্টা এবং শীতকালে ২৪ ঘণ্টা মাংস ভালো থাকে। মাংস ফোটানোর পর অবশ্যই ভালোভাবে ঠাণ্ডা করে ঢেকে রাখতে হবে।

সিদ্ধ দেয়ার আগে মাংসের টুকরা কাঁটাচামচ বা ছুরি দিয়ে কেঁচে লবণ ও লেবুর রস বা ভিনেগারের মিশ্রণে ডুবিয়ে নিলে সংরক্ষণের প্রক্রিয়াটি আরও ভালো হয়। এভাবে রাখলে মাংস ৫-৬ দিন মাংস ভালো থাকবে। তবে প্রতিদিনই নিয়ম করে জ্বাল দিয়ে ঠাণ্ডা করে রাখতে হবে।

রোদে শুকিয়ে মাংস সংরক্ষণ

চর্বি ছাড়া মাংস নিতে হবে রোদে শুকিয়ে মাংস সংরক্ষণ করতে হলে। প্রথমে মাংস পরিষ্কার করে ধুয়ে পাতলা ছোট টুকরা করে নিয়ে একটি লম্বা তারে একটার পর একটা মাংস গেঁথে নিতে হবে। কাপড় শুকানোর মতো করে ছাদে বা বারান্দায় গাঁথা মাংস টানিয়ে দিন।

এই উপায়ে মাংস সংরক্ষণ করলে মাংসের সব পানি টেনে মাংস একদম শুকিয়ে যায়, ফলে দীর্ঘদিন তা ভালো থাকে। তবে অবশ্যই সেটা পরিষ্কারভাবে করতে হবে।

ছাদে মাংস শুকাতে হলে পাতলা কাপড় বা নেট দিয়ে মাংস ঢেকে দিতে হবে। এতে ধুলোবালি পড়ে মাংস নোংরা হবে না। এছাড়া পাতলা করে কাটা মাংস ওভেনে অল্প হিট দিয়ে শুকিয়ে নিতে পারেন যাদের ওভেন থাকে।

পরপর ৫-৬ দিন মাংস রোদে দিয়ে মাংস শুকিয়ে একদম শুকিয়ে শক্ত হলে মুখ বন্ধ করা পাত্রে বা টিনের কৌটায় মাংস ভরে ভালো করে মুখ বন্ধ করে রাখুন। মাঝে মাঝে কৌটা ধরে মাংস রোদে দিন। তাহলে পোকার আক্রমণ হবে না।

রোদে শুকানো মাংস রান্না করার কমপক্ষে ১ ঘণ্টা আগে হালকা গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। এতে মাংস নরম হবে। অনেকে মাংসের আচার দিয়েও কিছুদিন সংরক্ষণ করতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *