কোন পথে কাশ্মীর পরিস্থিতি

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন:  কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত করতে গিয়ে মোদি সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে অনেকে অবাক হলেও হঠাৎ করে শুধু ভারতে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে তেমন ভাবার অবকাশ নেই। তবে কাশ্মীরের অবস্থানের পরিবর্তন করেছে, কাশ্মীরকে লাদাখ অঞ্চল থেকে আলাদা করা, তার বাহ্যিক কারণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যের অংশ থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বের করে আনা। লাদাখ এখন ইউনিয়ন অঞ্চল হলেও ভবিষ্যতে তেমন থাকবে, না আরেকটি রাজ্যে পরিণত হবে তা জানতে সময় লাগবে। তবে কাশ্মীরে মুসলমান জনসংখ্যার সঙ্গে হিন্দু ও হিন্দু প-িতদের দ্বারা ভারসাম্য তৈরি করার প্রচেষ্টা যে শুরু হতে যাচ্ছে, সে বিষয় হয়তো আগামীতে দৃশ্যমান হবে।

অভ্যন্তরীণ কারণ যতই থাকুক না কেন, এ অবস্থায় নিয়ে আসার পেছনে কয়েকটি ভূকৌশলগত কারণও রয়েছে। আফগানিস্তানের যে ভূকৌশলগত ও ভূরাজনীতিতে পরিবর্তন হতে চলেছে, তা আফগানিস্তানে ভারতের অবস্থানের বর্তমানকে পরিবর্তন করতে পারে। এ কারণে পাকিস্তান এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিকীকরণ ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপে আগ্রহী নয়। আফগানিস্তানে প্রায় ৪০ বছর প্রচুর রক্তক্ষরণের এবং ২০০১ সাল থেকে বিগত ১৮ বছরে মার্কিনিদের আটকে পড়া থেকে বের হতে তালেবানদের সঙ্গে যে চুক্তির দ্বারপ্রান্তে, তার নেপথ্যে রয়েছে পাকিস্তান। এই চুক্তি শান্তি প্রতিষ্ঠায় এক ধাপ আগালে এবং তালেবান আশরাফ ঘানি সরকার ক্ষমতা ভাগাভাগিতে পাকিস্তান ভূকৌশলগত অঙ্কে এগিয়ে যাবে। মার্কিনিরা ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এ যুদ্ধ তাদের নয়। মার্কিন বাহিনীর ভূকৌশলগত পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে, সে কারণে এ চুক্তি ২০২০ সালের নভেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের সহায়ক হবে।

যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের ৭ মাসের শর্ত থেকে ১৫ মাসে সামরিক অপসারণে সম্মতি পাওয়ার পর চুক্তির পথে তেমন বড় বাধা নেই। কাজেই যুক্তরাষ্ট্রের এ মুহূর্তে পাকিস্তানের যেমন দরকার, অপরদিকে চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের গড়া সম্পর্ক থাকলেও পাকিস্তানকে দরকার পড়ছে। এ কারণে কাশ্মীর প্রশ্নে আপসকামীর ভূমিকায় থাকতে অবতীর্ণ হতে কয়েকবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এ সংকটেও মার্কিনিদের উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা দিয়েছে। মার্কিনিদের এ অবস্থান হয়তো মোদি সরকারকে খুশি করতে পারেনি।

এ মুহূর্তে আফগানিস্তান নিয়ে পাকিস্তানের এগিয়ে থাকা ওই অঞ্চলে ভারতের অবস্থানে যথেষ্ট প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের সঙ্গে আফগানিস্তানের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনায় চীনের অবস্থানও সুদৃঢ় হবে। এ অবস্থায় পাকিস্তানের পক্ষে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে আরও সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে। ভারত সরকারকে এ অবস্থায় আফগানিস্তানের পরিবর্তনের দিকে নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার চুক্তি সম্পাদিত হলে কাশ্মীরের কথিত ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীরা’ আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কাও ভারতের ধর্তব্যের মধ্যে নিশ্চয়ই রয়েছে। তবে এ পর্যন্ত পাকিস্তান শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই সক্রিয় রয়েছে।

কাশ্মীর এখন বিশ্বের সবচেয়ে ঘন মিলিটারি উপস্থিতির অঞ্চল। ১৯৪৭-৪৮ সালের পর থেকে সময়ে সময়ে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি হতে থাকে। বর্তমানে শুধু ভারতীয় অংশেই ৬ লাখ থেকে ৭ লাখ সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। আগামীতে আরও বাড়তে পারে। এই অস্বাভাবিক সামরিক উপস্থিতি বেসামরিক জনজীবনকে জটিল করে তুলেছে।

কাশ্মীরকে ঘিরে ভারত-পাকিস্তানে এ পর্যন্ত তিনটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। সংঘটিত হয়েছে একাধিক সীমান্ত সংঘাত ছোটখাটো হলে এর কয়েকটি বড় ধরনের সংঘাতে পরিণত হতে পারত। অপরদিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের অভ্যন্তরে এবং কাশ্মীরে কথিত সন্ত্রাসী হামলার জন্য দায়ী করা হয়েছে বহুবার। এসব ঘিরে ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতির প্রভাব পড়ছে উপমহাদেশের অন্যান্য দেশেও আন্তঃদেশীয় সম্পর্কে প্রভাব পড়ছে। এমনকি আঞ্চলিক সহযোগিতার সংগঠনগুলোও কার্যকর হতে পারেনি।

১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পরিণতিতে কাশ্মীর অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পাকিস্তানের দখলে রয়েছে, যার একাংশকে আজাদ-কাশ্মীর এবং গিলগিত-বাল্টিস্তান নিয়ে বর্তমানে পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চল। এ দুই অঞ্চল বর্তমানে পাকিস্তানের কাছে রয়েছে, যার আয়তন ৯৬ হাজার ১৬৮ বর্গকিলোমিার। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের পর কাশ্মীর এখন তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে রয়েছে। চীনের দখলে রয়েছে তিব্বত ও জিনজিয়াংয়ের এক অংশ, যার নাম আকসাই চীন। আকসাই চীনের আয়তন ৩৭ হাজার ৫৫৫ বর্গকিলোমিটার। চীন এখনো দাবি করছে, লাদাখ এলাকায় চীন-ভারত সীমান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। চীন তিব্বত অঞ্চলে জনসন লাইন স্বীকার করে না। কাজেই সহজে বলা যে, বর্তমানে কাশ্মীর সংকট ত্রিমুখী। ভারতের বিজেপি সরকার এখন লাদাখকে আলাদা ইউনিয়ন টেরিটোরিতে পরিণত করায় এখন চীনের সীমান্ত উত্তর-পশ্চিমে লাদাখের সঙ্গেই গণ্য করা হবে। তবে লাদাখ অঞ্চল সব সময়ই ঐতিহাসিকভাবেই কাশ্মীরের অংশ ছিল।

১৯৬২ সালের চীন-ভারত এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও পশ্চিম রণাঙ্গনের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কাশ্মীরের ভূকৌশলগত (এবড়-ংঃৎধঃবমরপ বয়ঁধঃরড়হ) অবস্থানে ব্যাপক পরিবর্তন হওয়ার কারণে শুধু পাকিস্তানই নয়, চীনও কাশ্মীর জটিলতায় সরাসরি যুক্ত রয়েছে। ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান চীনকে ট্রান্স-কারাকোরাম ট্র্যাক্ট প্রায় ২ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার দিয়েছিল। এই লম্বা টানা (ঝঃৎরঢ়) চীনকে দেওয়া হয়েছিল সীমানা সংশোধনের এবং কারাকোরাম মহাসড়ক তৈরির প্রাক্কালে। চীন ১৯৬২ সালের পর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি করে, যা ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর মার্কিন সামরিক সাহায্য বন্ধ হলে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ভূকৌশলগত এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ভূরাজনীতি, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যায়।

বর্তমানে পাকিস্তান-চীনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে এবং উত্তর আফ্রিকার জ্বালানি সঞ্চালনের প্রধান পথ। অপরদিকে নিকট বর্তমানের পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের হামাম আবদাল থেকে গিলগিত বাল্টিস্তানের খুনজেরার ঘিঞ্জিপথ পর্যন্ত যেখানে চীনের জাতীয় সড়ক ৩১৪-এর সঙ্গে যুক্ত করে, কারাকোরাম মহাসড়ক চীনের জন্য ক্রমেই অর্থনৈতিক ও ভূকৌশলগত কারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে প্রাধিকারে রয়েছে। এ কারণেই চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর রক্ষায় পাকিস্তান চীনের অর্থায়নে বিশেষ বাহিনী গড়ে তুলেছে। এর মদ্যে গোয়াদর বন্দর এবং কারাকোরাম হাইওয়ে অন্তর্ভুক্ত।

কারাকোরাম হাইওয়ে মোট ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার, যার ৮৮৭ কিলোমিটার পাকিস্তান অঞ্চলে এবং ৪১৩ কিলোমিটার চীনের মধ্যে রয়েছে। এই হাইওয়ে তৈরি শেষ হয় ১৯৭৯ সালে এবং জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় ১৯৮৬ সালে। উল্লেখ্য, গিলগিত-বাল্টিস্তান, যেখান দিয়ে এই মহাসড়ক চীনের সঙ্গে যুক্ত হয়, সে অঞ্চল ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের দখলে চলে আসে, যা ছিল কাশ্মীরের অংশ। কারাকোরাম হাইওয়ে আরব সাগরের বন্দর গোয়াদরকে চীনের শিংজিয়াংয়ের যুক্ত করার একমাত্র পথ। এটি ঘিরেই চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর, যার ব্যয় (২০১৭) বাড়িয়ে বরাদ্দ করা হয়েছে ৬৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে রয়েছে কারাকোরাম মহাসড়ক সংস্কার ও সম্প্রসারণ। করাচি-পেশোয়ার রেললাইনের উন্নয়ন, যাতে ১৬০ কিলোমিটার গতির ট্রেন চলতে পারে। একই সঙ্গে এবোতাবাদ হয়ে কাশগড় পর্যাপ্ত রেলওয়ে লাইন সম্প্রসারণ, যার কাজ শুরু হয়েছে বলে তথ্যে প্রকাশ। পাকিস্তানের এই প্রকল্প চীনের আগামী শতাব্দীর বেল্ট রো প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যতম প্রধান অংশ।

গিলগিত-বাল্টিস্তান অঞ্চলের কারাকোরাম হাইওয়ে শুধু যোগাযোগের ব্যবস্থাই নয়, সামরিক দিক থেকেও দারুণ গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সামরিক সরঞ্জাম, সামরিক উপকরণের চলাচলের জন্য ব্যবহৃত এই পথ। এ পথেই পাকিস্তান ও চীনের মধ্য এশিয়া হয়ে পূর্ব এশিয়ায় যোগাযোগের একমাত্র পথ। অপরদিকে এ যোগাযোগ আফগানিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হতে যাচ্ছে। এখানেই ভারতের সামরিক ও ভূকৌশলগত দুর্বলতা, যে কারণে কারাকোরাম রেঞ্জের সলটোরো (ঝড়ষঃড়ৎড়) উচ্চতা, যাকে আমরা সিয়াচিন গ্লেসিয়ার বলে চিনি, ভারতীয়দের দখলে রয়েছে বলে দাবি করছে। অপরদিকে পাকিস্তানি সামরিক উপস্থিতিও রয়েছে দিল্লি। শুধু ভারত একাই নয়, অপরদিকে রয়েছে পাকিস্তানের বাহিনী, যার সর্বপ্রথমে এই গ্লেসিয়ারে পৌঁছেছিল। এখানে ছোটখাটো যুদ্ধও হয়েছিল। প্রতিনিয়তই গোলাগুলি হয় বলে তথ্য পাওয়া যায়। এই যুদ্ধক্ষেত্রের উচ্চতা ১৮ হাজার ৮৭৫ ফুট এবং চীনের দিকে ১১ হাজার ৮৭৫ ফুট। এর সামরিক গুরুত্ব ছাড়া অন্য কোনো গুরুত্ব না থাকলেও একটি প্রাকৃতিক কারণ হলো সিয়াচিন গ্লেসিয়ার পাঁচ নদীতে পানিপ্রবাহ বাড়ানোর ক্ষমতা রাখে। এই পানির প্রবাহ ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে কারাকোরাম হাইওয়ের এবং চীনের দখলে থাকা আকসাই চীন পর্যবেক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই উচ্চতা। এ অঞ্চল দখলে রাখতে গত ২০ বছরে উভয় পক্ষের প্রায় ২০ হাজার সৈনিক প্রাণ হারিয়েছে মূলত ঠা-াজনিত কারণে। ভারতের হিসাবে সামরিক উপস্থিতির জন্য ব্যয় প্রতিদিন দুই কোটি রুপি। পাকিস্তানের ব্যয়ও অনুরূপ হওয়ার কথা। অথচ এ বিষয়টি উভয় দেশের সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরে।

আকসাই চীন ছাড়াও কারাকোরাম রেঞ্জের সাকসাম ভ্যালি, যা এখন পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের অংশ চীনকে পাকিস্তান পুরোটাই হস্তান্তর করতে পারেÑ এমন সম্ভাবনা নিয়েও ভারত উদ্বিগ্ন। এরই মধ্যে ২ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার পাকিস্তান হস্তান্তর করেছে, যে বিষয়ে ভারত পাকিস্তানের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিল। কিন্তু জায়গাটি যে বিরোধপূর্ণ, সে ধরনের বক্তব্য থেকে বিরত থেকেছে।

কাশ্মীরের ভূকৌশলগত ও ভূরাজনীতি এখন এক চরম পর্যায়ে উঠেছে, যার মধ্যে ক্রমেই চীন জড়িয়ে পড়ছে মোটা দাগে, যার কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। চীন শুধু সিয়াচিনের বহুলাংশ দাবি করেই ক্ষান্ত নয়, বরং ম্যাকমোহন লাইনকেই বহুলাংশে স্বীকার করেনি এবং করছে না। ১৯৬২ সালে চীন শুধু আকসাই চীনই নয়, পূর্ব ভারতের উত্তরের তৎকালীন নর্থ-ইস্ট ফ্রন্টিয়ার এজেন্সির (ঘঊঋঅ), যা এখন অরুণাচল প্রদেশ, এর দাবিতে অনড় রয়েছে। চীন সব সময়ই মনে করে, বর্তমান অরুণাচল প্রদেশের প্রায় ৮ হাজার ফুট উচ্চ মালভূমি, থোয়াং এলাকা তিব্বতের অংশ। কাজেই ওই এলাকায় চীনের দাবি যৌক্তিক। ১৯৬২ সালে যুদ্ধ শেষে চীন জায়গা ছেড়ে দেয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ দাবি থেকে চীন সরে আসেনি। থোয়াং শহরের এবং ওই অঞ্চলের বহু অংশ দখল করে নিয়েছিল। এ জায়গা যে এক সময় তিব্বতের ছিল কিনা বিতর্ক থাকলেও জায়গাটি যে তিব্বতের বৌদ্ধদের জন্য পবিত্র, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ যেখানে ষষ্ঠ দালাইলামা জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

৫ আগস্ট ২০১৯, মোদি সরকার একতরফাভাবে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে ইউনিয়ন টেরিটোরি যেভাবে এবং যে কারণে বানালেন, তার পেছনে অভ্যন্তরীণ কারণ যতই তুলে ধরুন না কেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূকৌশলগত বিষয় দারুণভাবে কাজ করেছে। কাশ্মীরের এ অবস্থানের মাধ্যমে ভারত এ জায়গা যে বিতর্কিত এবং ত্রিমুখী, সেখান থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে আসতে কার্যত এখন যে কোনো আগ্রাসন, অভ্যন্তরীণ অথবা আন্তঃসীমান্ত শুধু কাশ্মীর অঞ্চলেই নয়, ভারতের ওপর হামলা বলে ভারত গণ্য করবে। ভারত এখন কাশ্মীর নয়, পাকিস্তানের কাছে থাকা পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর নিয়ে কথা বলতে চায়। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর ভারতের সঞ্জাম শুধু মোজাফফরাবাদ অঞ্চলই নয়, পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চল কারাকোরাম মহাসড়কসহ নিয়ে আলোচনার কথা বলা শুরু করেছে। তবে ভারতের এ দাবি বহির্বিশ্বে কতখানি হালে পানি পাবে, তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না।

এমন জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আগুনে ঘি ঢালার মতো করে ৬ আগস্ট ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে দাঁড়িয়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেছেন, তার প্রাণের বিনিময়ে হলেও তিনি পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর ও চীনের দখলে থাকা আকসাই চীন ফিরিয়ে আনবেন (দি ইকোনমিক টাইমস, আগস্ট ৬, ২০১৯)। এর জবাবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির উল্লেখ করে পারমাণবিক অস্ত্রের পরোক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছেন। একইভাবে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংও পরোক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং চীন ৫৪ বছর পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বিষয়টি তুলতে সহায়তা করে পাকিস্তানের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে। স্মরণযোগ্য, কাশ্মীর অঞ্চল ঘিরে রাখা তিনটি দেশই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।

ভারত দাবি করে আসছে, কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৫৪ বছর পর কাশ্মীর নিয়ে বৈঠক করা এবং বিশ্বের বড় দেশগুলো দুপক্ষের কথা বলাতে হয়তো ভারতীয় সরকারকে বিপাকে ফেলেছে।

কাশ্মীর বিষয় পুনরায় জোরেশোরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চর্চিত হচ্ছে, বিশেষ করে সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কায়। এ ধরনের সংঘাত যে শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমিত থাকবে, তেমন মনে হয় না। কারণ ভারত যেমন চীনকে টেনে এনে আরেক প্রতিপক্ষ তৈরি করেছে, তেমনি চীন নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর চীনের বক্তব্যে প্রতীয়মান। কারণ চীনের ভূকৌশলগত অবস্থান।

যাহোক কাশ্মীর নিয়ে যে উত্তেজনা, সেখান থেকে অতীতের মতো সংঘাতের সৃষ্টি হলে পুরো উপমহাদেশ অস্থির হবে। ভারতের এই পদক্ষেপ ভারতের অভ্যন্তরীণ হলেও ওই অঞ্চলের জনগণের মধ্যে শান্তি না এলে অথবা অস্থির হলে সেখানে নানা ধরনের উগ্র সংগঠনগুলোও ভিন্ন মাত্রায় যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্মরণযোগ্য যে, আল কায়েদা এর আগেই তাদের অবস্থানের জানান দিয়েছে। এ ধরনের উগ্র সংগঠন যুক্ত হলে তা আমাদের দেশের জন্যও সুখকর হবে না। আমরা এ অঞ্চলে আর সংঘাত দেখতে চাই না, দেখতে চাই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *