শাড়ি নারীকে পিছিয়ে নেওয়ার অপকৌশল নয়

নারী মহীয়সী। একজন নারী মাতা, ভগ্নি, কন্যা ও বধূ। হতে পারে কারো কারো বেলায় প্রেয়সী। আবার নারী ছলনাময়ী, মায়াবিনী, ডাইনি। রূপকথার গল্পে ডাইনি শব্দটি পাওয়া যায়। যে কিনা মানুষের বাচ্চা চুরি করে। শিশুদের ছলনায় ভুলিয়ে বিড়াল কিংবা পাখি এসব বানিয়ে নিজের আস্তানায় পোষ মানায়। সেই ডাইনিকে লেখক বা শিল্পী অঙ্কন করেন আটপৌড়ে শাড়িতে। গল্পের পাতায় পাতায় শাড়ি পরা আড়াই প্যাচি উচু খোপায় ডাইনির ছবিও কিন্তু পাঠকের চিত্তকে আকর্ষণ করে।

“মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী
দেব খোপায় তারার ফুল
কর্ণে দোলাব চৈতি চাদরের দুল”

কবি নিশ্চই কর্ম-বান্ধব পোশাক পরিহিতা কোন নারীকে নয়; বরং শাড়ি পরা লাস্যময়ী নারীকে কল্পনা করে এতটাই বিমোহিত যার খোপায় পরাতে চেয়েছেন তারার ফুল আর চৈতি চাঁদের ডিজাইনের কানের দুল। প্রেমময়ী নারীর সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে যুগে যুগে রচিত হয়েছে কত না গান। যেমন-
“বাসন্তি রঙের শাড়ি পরে
জলকে বঁধুয়া চলে যায়
বলব যদি শরম রাঙ্গা মুখটি তোমার ঢাকো অনুরাগে”

আবার কবি আল-মাহমুদের নোলক কবিতায় –
“আমার মায়ের সোনার নোলক
হারিয়ে গেলো শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি
সারা বাংলাদেশে”

এখানে শাড়ি পরা বাংলা মায়ের শাশ্বত রূপটি ফুটে উঠেছে। এই বাংলা মায়ের আঁচল বলে একটি কথা আছে। সত্যই, বাংলা মায়ের শাড়ির আঁচলের মধ্যে রয়েছে নিবিড় স্নেহের পরশ।

কথায় আছে “মানুষ সুন্দরের পূজারি”, বলা কিন্তু হয় নাই যে, পুরুষ সুন্দরের পূজারি। শাড়ি পরিহিতা একজন নারীকে দেখলে চোখ জুড়ায়। এটি অবধারিত সত্য। এই যে শাড়ি পরার স্টাইল তা প্যাচে প্যাচেই হোক আর ভাজে ভাজেই হোক। এই সৌন্দর্য অবলোকন করার মত অনুভূতি সম্পন্ন দৃষ্টি থাকা চাই। এমন দৃষ্টি নারী পুরুষ উভয়েরই থাকতে পারে।

প্রত্যেক জাতির যেমন নিজস্ব সংস্কৃতি আছে তেমনি আছে আমাদেরও। সংস্কৃতির বিশেষ একটি উপকরণ পোশাক। বিশ্বের প্রতিটি সভ্য জাতিরই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পোশাক। আবহমান কাল থেকেই চলে এসেছে বাঙালি নারীর প্রধান পোশাক শাড়ি। মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া যার ভাস্কর্য কিংবা ছবি শাড়ি পরা অবস্থায় আমরা দেখি পরম শ্রদ্ধায়। যিনি শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় ষষ্ঠতম।

মনে পড়ে গেল একটি শিশু ছাত্রের কথা, অনেক পড়েও সে মুখস্ত করতে পারতো না।
“মনারে মনা
কোথায় যাস?
বিলের ধারে কাটবো ঘাস
ঘাস কী হবে?
বেচবো হাটে
কিনব শাড়ি পাটে পাটে
মাকে দিব রঙিন হাড়ি
বোনকে দিবো পাটের শাড়ি”

(প্রতিবেশী ছেলে মজাম্মেল নামের ছাত্রটির অগ্রগতি বলতে ‘মনা-রে মনা’ পড়তে পড়তেই সে একটু বড় হয়ে শিশু শ্রমিক হলো)

মনা ঘাস বিক্রি করে বনের জন্য পাটের শাড়ি কিনবে। এই শাড়ি পরা বোনটির মাঝে ‘পথের প্যাঁচালির দশ/এগারো বছরের দুর্গাকেই যেন খুঁজে পাওয়া যায়’

সাম্যের কবি নজরুলের কবিতায় আমরা দেখতে পাই-
বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর /
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।

“শক্তি দিয়েছে প্রেরণা দিয়েছে
বিজয় লক্ষ্মী নারী”

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির জন্য যে অবদান রেখে গেছেন তার অর্ধেক অংশীদার কিন্তু বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসার। এই মহীয়সী নারী শাড়িই পরতেন। কবি বেগম সুফিয়ে কামাল, ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নুরজাহান বেগম, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ইনাদের মত মহীয়সী নাড়ীরাই (শাড়ি পরে) সমাজকে এতদূর এগিয়ে এনেছেন।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, যিনি আলোকিত মানুষ গড়ার প্রত্যাশায় নিরন্তন পরিশ্রম করে চলেছেন। ৩০ আগস্ট, ১৯ প্রথম আলো পত্রিকায় তার সাহিত্য রচনা শাড়ি লেখাটি পড়লাম। এখানে তিনি বাঙ্গালি নারী ছাড়াও আন্তর্জাতিকভাবে নারীর পোশাক গর-পরতায় কতটা মানানসই বা কতটা বেমানান তা আলোচনা করেছেন। মূলত শাড়ির শাশ্বত সৌন্দর্যকে তুলে ধরেছেন তার সাহিত্য গবেষণায়। উল্লেখ করেছেন, শাড়ি পরা নারীর বিপরীত মুখিতাও। প্রকৃতি অর্থে নারীর সাথে সম্পর্কগুলো তো বিপরীত। শুরুতেই লিখেছি, নারী মাতা, নারী ভগ্নি, নারী বধু, নারী মহিয়ান।

লেখকের ভাষায়- “শাড়ি তার রূপের শরীরে বইয়ে দেয় এক অলৌকিক হিল্লোল” এ কথার অর্থ আদিম বর্বরতার দিকে গড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি যথার্থই লিখেছেন “শাড়ি একটা রহস্যময় পোশাক”। নারী দেহকে কতটা প্রদর্শন করলে আর কতটা অপ্রকাশিত রাখলে তার শারীরিক মোহ বজায় রেখেও দর্শকের চোখে অনিন্দ্য হয়ে উঠবে তা পোশাকটি যেন সহজাতভাবেই জানে।

অতীতে (নানি-দাদিদের সময়) গ্রাম্য নারীদের শাড়ি পরার একটা স্টাইল ছিল এমন- কোমরে বিছা পরে শাড়ির পাড়টাকে ঝুলিয়ে দেওয়া। আব্দুল আলীম কিংবা ঐ সময়ের শিল্পীদের কণ্ঠে শাড়ির পার নিয়ে গানও শোনা যেত।

কিষাণ বধূর গান ছিল –
“ধান বেচিয়া কিন্‌মু শাড়ি
পিন্ধিয়া যামু বাপের বাড়ি”

বাংলার স্বর্ণযুগ ছিল মধ্যযুগ অর্থাৎ মুসলিম শাসনামল। ঐ সময় এদেশে কৃষিকাজের পাশাপাশি ছিল কুটির শিল্পের ব্যাপক প্রসার। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলার শাড়ি ছিল খ্যাতির শিখরে। এসব শাড়ির মধ্যে ঢাকাই মসলিন শাড়ির সুনাম সকলেরই জানা আছে। এছাড়া বিভিন্ন তাঁতের শাড়ি, সিল্ক, জামদানী বেনারশির কদর ছিল অনেক। ইংরেজ শাসনামল, পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের চাপে এসব শিল্প ধ্বংসপ্রায় হয়ে গিয়েছিলো অনেকাংশে। যেগুলোর চাহিদা এখনও দেশে বিদেশে বহাল আছে।

বর্তমান সময়ে বিবাহ অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য উৎসব পার্বণে দেখা যায় শাড়ির প্রতি মানুষের দারুণ ঝোঁক। ব্যক্তি, স্থান, কাল ও পেশার সাথে শাড়ি বেশ মানানসই, দেখতেও দারুণ লাগে। একজন, সাহিত্যিক তার সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে সমাজের হীনতা-দৈন্যতাকে সাহিত্য দর্পণে তুলে ধরবেন এমনটিইতো স্বাভাবিক।
যেমন, শহিদুল্লাহ কায়সারের কালজয়ী উপন্যাস “সারেংবউ” এর নায়িকা নবিতুনের সম্ভ্রম রক্ষা করতে লেখক যেটুকু প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তা উপন্যাসের সার্থকতা। এখানে নারীর প্রতি অবমাননা নয়। অথবা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’তে কপিলা বার বার জপজপ করে চুলে তেল দেওয়া আর বেগুনি শাড়ি পরে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলা এসব-ই সাহিত্যের অসাধারণ প্রকাশ।

সেক্ষেত্রে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ সাহিত্যে শাড়িতে নারীর সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন। এমনটি নারীকে পিছিয়ে রাখার অপপ্রয়োগ-অপকৌশল নয়, অবশ্যই নয়। সেকেলে ধ্যান ধারণা থেকে অনেক পথ পেরিয়ে আজকের সমাজ নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হতে চলেছে। শাড়ির পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারী তার প্রয়োজনীয় পোশাকটি গ্রহণ করতে দ্বিধাহীন।

আজকের নারী ঘরে বাইরে, কর্মক্ষেত্রে প্রতিটি শাখায় তার যোগ্যতা প্রমাণ করতে সক্ষম। সবশেষে বলা যায়, শাড়ি কিংবা গহনায় নারীর অগ্রসরতায় প্রতিবন্ধকতা নয়। নারীকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আজ আমাদের প্রয়োজন হয়েছে দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *