পরিবর্তন আসছে পিপিপি আইনে: প্রকল্পের অর্থের বিকল্প উৎস সন্ধান

বৈচিত্র ডেস্ক : উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের বিকল্প উৎস খুঁজতে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) আইনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আইন সংশোধনের দায়িত্ব অর্থ বিভাগ, পিপিপি কর্তৃপক্ষ ও পরিকল্পনা কমিশনকে দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিকল্প অর্থায়ন’ সংক্রান্ত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সংশোধনের যুক্তি ও ধারা উল্লেখ করে আইনের খসড়া দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে নির্দেশ দেয়া হয়। পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ সময় কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে আনারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বুধবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল যুগান্তরকে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়নের সমস্যা নেই। নতুন বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পিপিপি আইন সংশোধন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এজন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ রয়েছে। বিষয়টি তারা দেখছেন। তবে সংশোধনের বিষয়টি তার কাছে আসেনি।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিনি বলেন, পিপিপি আইন-২০১৫ সংশোধনের যুক্তি তুলে ধরা হবে। পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ সময় কমিয়ে আনার ব্যাপারে বৈঠকে একমত পোষণ করা হয়।

বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সদ্যবিদায়ী নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী মো. আমিনুল ইসলাম জানান, দক্ষ প্রতিষ্ঠান ও উপযুক্ত পলিসি ছাড়া পিপিপি থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। এজন্য উপযুক্ত পলিসি ও প্রতিষ্ঠান দরকার। তিনি বলেন, একটি প্রকল্প প্রণয়নের পর পরিকল্পনা কমিশন পেশাগত দক্ষতার সঙ্গে বাণিজ্যিক মূল্যায়ন করে। এ মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে পিপিপি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রকল্পটি পাঠানো হয়। প্রকল্পের বাণিজ্যিক মূল্যায়ন নেতিবাচক হলেও সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ হলে সেটি সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পের বিকল্প উৎসের জন্য পিপিপি আইনকে আরও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যে পিপিপি আইনের আওতায় জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করা হয়েছে। এক্ষেত্রে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো নিজ থেকে পিপিপির মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে অংশীদার খুঁজে দেবে। ফলে সমঝোতা স্মারকেও সীমাবদ্ধতা থাকছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক ঘাটতি ও কারিগরি সহায়তার প্রয়োজন হলে তা পিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত থেকেও অর্থায়ন করা হয়। বিকল্প অর্থায়নের উৎস আরও সহজ করতে পিপিপি আইন প্রণয়নের চার বছরের মাথায় তা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বৈঠকের কার্যবিবরণীতে বলা হয়, পিপিপির আওতায় প্রকল্পগুলো পূর্ণাঙ্গ বিবেচনার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেয়া হয় না। মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা প্রকল্প তৈরি ও বিবেচনা করে। পরবর্তী সময়ে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে পরিচালক কমিটি পিপিপির বোর্ডে উপস্থাপন করে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে গঠিত পিপিপি বোর্ড চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। ফলে একাধিক প্রতিষ্ঠান ও পর্যায়ে দায়িত্ব এবং ক্ষমতার বিভাজন পিপিপির অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করা হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়- এখন থেকে মন্ত্রণালয়ের প্রণয়ন করা প্রকল্পগুলো আর্থিক ও অর্থনৈতিকভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পারবে পরিকল্পনা কমিশন। প্রকল্প যুক্তিসঙ্গত হলে এর অর্থায়ন পদ্ধতিও বিবেচনা করতে পারবে।

বৈঠকে পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ সময় কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বর্তমান পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ করতে সিসিইএ’র নীতিগত অনুমোদনের পর থেকে চুক্তি স্বাক্ষর পর্যন্ত সর্বনিু আট মাস এবং সর্বোচ্চ ২৪ মাস লাগে। এটি নির্ভর করে প্রকল্পের ধরন ও প্রকৃতির ওপর। তবে গড়ে ১৮ মাস সময়ের প্রয়োজন হয়।

প্রকল্পের অর্থ সংগ্রহের জন্য পিপিপির ধারণা বিশ্বব্যাপী রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ায় পিপিপি রয়েছে। পিপিপির ধারণা হচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাব উপস্থাপন করবে। সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী সেসব প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য বিভিন্ন সংস্থা বিওটি মডেলে অথবা বিকল্প কোনো ডেলিভারি মডেলে এর বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

উল্লেখ্য, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) লক্ষ্য ২ লাখ ১ হাজার ৭২১ কোটি টাকা ধরা হয়। বর্তমানে ৭৪টি প্রকল্প পিপিপির পাইপলাইনে রয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রকল্প সেবা প্রদান কার্যক্রম চালাচ্ছে। পাঁচটির বাস্তবায়ন কাজ চলছে। বেসরকারি অংশীদারিত্বের সঙ্গে চারটি প্রকল্পের চুক্তি হয়েছে, চুক্তির অপেক্ষায় আরও দুটি প্রকল্প। ১৭টি প্রকল্প বেসরকারি অংশীদারিত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। পাশাপাশি আটটি প্রকল্পের সম্ভাব্য যাচাই-বাছাই চলছে। ১৯টি প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে ১৩টি প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *