এ অভিযান যেন থমকে না যায়

নূরে আলম সিদ্দিকী:

বোধকরি, অবশেষে কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ হয়েছে। শেখ হাসিনা অনেক বিলম্বে হলেও দুর্নীতি এবং দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে ক্যাসিনো উচ্ছেদের দৃপ্ত অভিপ্রায়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছেন। দেরিতে হলেও তা ভালো। এটা শুধু জাতির জন্য কল্যাণকর নয়, সময়মতো তিনি যে চোখ মেলে দেখতে পারেন এবং তার প্রতিবিধানের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে উদ্যোগী হন, এটা সবার বিশেষ করে আমার মতো মুখপোড়া, রসকষহীন তীব্র বাস্তববাদী লোকের কাছেও গ্রহণযোগ্য এবং ক্ষেত্রবিশেষ প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের ভাবী (প্রধানমন্ত্রীর মা) দেশ স্বাধীনের আগে আমার বক্তৃতা মানুষের মুখে কিছুটা শুনতেন। মুডে থাকলে বসের (মুজিব ভাই) সামনেই পান চিবোতে চিবোতে তার একটা অদ্ভুত স্বভাবসুলভ হাসি হেসে বলতেন, ‘ভাই, জন্মের সময় আপনার মা কি আপনার মুখে মধু দেন নাই? চক্ষুলজ্জার বালাই তো নাই-ই, প্রতিপক্ষকে পচাতে মিছে কথা বলতেও তো কুণ্ঠাবোধ করেন না।’ প্রায় সময় আমি নিশ্চুপ থাকতাম। কখনো কখনো বলতাম, মিছে কথা তো দূরে থাক, আমি বানিয়ে শানিয়ে কোনো কথাই বলি না। বরং যেটা ঘটেছে সেটাকেই আমি আমার ভাষায় আমার অনুভূতির আবির মাখিয়ে জনসম্মুখে আমার আবেগাপ্লুত হৃদয় নিয়ে তুলে ধরি। আমি যে কাঁদি সেটাও কৃত্রিম নয়। আমার হৃদয়, আমার অনুভূতি আমার সত্তা আমার বিশ্বাস যেটা গ্রহণ করতে পারে না, সেটা আমি আমার অন্তরের অনুভূতির আবির মাখিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে উচ্চারণ করি। বাঙালির বঞ্চনা-যন্ত্রণার কথা তো কারও অজানা নেই। কিন্তু আমার বক্তৃতার প্রকাশভঙ্গিতে বেদনাপ্লুত হয়ে আমি কাঁদি, সহস্র সহস্র মানুষ তারাও কাঁদে। রাজনীতিতে আবেগ শুধু আমার চালিকাশক্তি নয়, ওটাই যেন আমার সত্তা। আমার নিজস্ব সত্তাকে অবদমিত করে রাখঢাক করে কোনো কথা আমি বলতে পারি না।

আমার স্পষ্ট মনে আছে, মুজিব ভাই এক সন্ধ্যায় তাঁর খাটে অর্ধশায়িত। ভাবী মোড়ায় বসে পান বানাচ্ছেন। আরেকটি মোড়ায় বঙ্গবন্ধুর শিয়রের কাছে আমি বসা। বঙ্গবন্ধু তাঁর অতীত জীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ এবং আবেগতাড়িত কিছু একটা বলছিলেন। হঠাৎ ভাবী আমাকে অপ্রস্তুত করার জন্যই বোধহয় বললেন- ভাই মনু মিয়ার মা তো একজন লেখাপড়া না জানা অতি সাধারণ মহিলা। মঞ্চে দাঁড়িয়ে আপনি মনু মিয়ার মাকে উদ্ধৃত করে অশ্রুসিক্ত নয়নে যে বয়ান করেন, ওই পল্টন ময়দানে দর্শকদের মধ্যে তো মনু মিয়ার মা-ও থাকতে পারেন। বলা তো যায় না, যদি কখনো উনি দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেন, না আমি তো কখনো আপনাকে মনু সম্পর্কে এত কথা বলিনি! আপনি কারাগারে যাওয়ার আগেও বলিনি, কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পরে তো বলিইনি। আপনি কোথা থেকে এত কথা পেলেন? আমি বিন্দুমাত্র হতচকিত না হয়ে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে তার জবাবে বলেছিলাম- ভাবী, আমি এ ধরনের অবস্থার মুখোমুখি কখনই হব না। তার কারণ, পল্টন ময়দানে আমার বক্তৃতায় মনু মিয়া সম্পর্কে আমি যা বলি তার কোনোটাই বিন্দুমাত্র মিথ্যা নয়। মনু মিয়া মারা গেছে এটি সত্য। আমার বাঁ পাশেই সে দাঁড়ানো ছিল সেটাও সত্য। শুধু মরণের বুলেটটা আমার বক্ষ বিদীর্ণ না করে নির্মম আঘাতে মনু মিয়াকে হত্যা করেছে। সত্যি মনু মিয়া কোনো দিন তার মাকে আর মা বলে ডাকতে পারবে না। এই নিরেট সত্যটাকে বুকে লালন করে আমি পল্টনের জাগ্রত উদ্গত, উদ্যত, উদ্ধত কালজয়ী জনতাকে উদ্দেশ করে বক্তৃতা করার সময় মনু মিয়ার মৃত্যুর ঘটনাটিকে আমার অনুভূতিপ্রবণ হৃদয়ের সব আবির মাখিয়ে আমার উদ্দীপ্ত হৃদয়ের স্পর্শ দিয়ে যখন তুলে ধরতাম, তখন স্মৃতির বেদনায় আমি কাঁদতাম, জনস্রোতকেও কাঁদাতাম। আমি আমার ভাষায় মনু মিয়ার মৃত্যুর ঘটনা, মৃত্যুর পরপরই তার মায়ের সঙ্গে দেখা করার ঘটনা, প্রায় তিন বছর পর কারাগার থেকে অবমুক্ত হয়ে আবার তার মায়ের কাছে যাওয়ার ঘটনা- এসব বাস্তবতাকে যখন তুলে ধরতাম, তাতে মিথ্যার কোনো প্রলেপ থাকত না। শুধু সত্যের সঙ্গে আমার আবেগ-উচ্ছ্বাস এবং উদ্বেলিত হৃদয়ের আবির মাখানো থাকত। আমি সেদিন মানুষকে শুধু কাঁদাইনি, কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও আমাকে প্রভাবিত করেনি। আবেগ আমাকে এতটাই তাড়িত করত যে, আমি পাগলপ্রায় হয়ে যেতাম। আমার সব সত্তা, চিন্তা-চেতনা, চাওয়া-পাওয়া- সবকিছু মনু মিয়ার বিদেহী আত্মার সঙ্গে আমার অজান্তেই মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। আমি বক্তৃতা করতাম না, উন্মাদের মতো আমার হৃদয়ের অনুভূতিকে তুলে ধরতাম। মনু মিয়ার মা আমাকে মাতৃস্নেহে জড়িয়ে ধরে যা বলত, সেটি সত্যিই তার নিজস্ব অভিব্যক্তি। সেটিকেই আমার অনুভূতির রং চড়িয়ে আমার হৃদয়ের তুলি দিয়ে মনু মিয়ার মায়ের অশ্রুর অভিব্যক্তির ছবি আঁকতাম। এটি আমার হৃদয়-নিংড়ানো নিরেট সত্য। এখানে আমার ভাষা, আমার প্রকাশভঙ্গি সন্দেহাতীতভাবে মনু মিয়ার মায়ের অভিব্যক্তি থেকে ভিন্নতর ছিল কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল না।

পুলিশের ছোড়া যে বুলেটটি মনু মিয়ার বক্ষ বিদীর্ণ করেছে, সেই বুলেটটি আমার বুকেও বিঁধতে পারত। মনু মিয়ার মতো আমিও শহীদ হতে পারতাম। আমি শহীদ হলে অন্য কেউ নিজের হৃদয়ের আবির মাখিয়ে অথবা চোখের জলে বুক ভাসিয়ে পল্টনের লাখ লাখ লোকের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আমার মতো করে বর্ণনা করত কিনা জানি না, মনু মিয়ার পরিবর্তে আমি শহীদ হলে আমার লাশ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে ওইরূপ ধস্তাধস্তি করত কিনা তাও জানি না- যেরূপ আমরা করেছিলাম। এখানে এই নিবন্ধে আমি একটি সত্যকেই তুলে ধরতে চাই; ঘটনাপ্রবাহ একটি, সেটিকে কে কীভাবে উপস্থাপন করবেন তা তার নিজস্ব মনন, নিজস্ব মানসিকতা, ভাষা ও আবেগের ওপর নির্ভর করে। এত বিস্তারিত না বললেও মূল ও সারকথা বললে মুজিব ভাই তো বটেই, সেই সন্ধ্যায় ভাবীর চোখও ছলছল করে ওঠে। পল্টনের লাখ লাখ মানুষ তখন আমার সামনে ছিল না কিন্তু তাদের বিশাল উপস্থিতি ছিল আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে। পাকিস্তানের যে কোনো শোষণ-বঞ্চনার বিস্তীর্ণ ঘটনার বর্ণনা দিতে গেলে আমি পাগলপ্রায় হয়ে যেতাম। এখন জীবনসায়াহ্নে এসে আবেগ অনেকটাই স্তমিত, তবু সেদিনের সেই রক্তস্নাত স্মৃতিগুলো আজও আমার হৃদয়কে আপ্লুত করে বলেই পরবর্তীতে পদ ও পদবির কিছুই না পাওয়া সত্ত্বেও আমি আমার হৃদয়ের গভীরে পরিতৃপ্ত ও আত্মহারা। এ কথাগুলো বলতে হলো এটা বোঝাতে যে, আমাদের সময়ে যারা রাজনীতিতে আসত তারা জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন ও কল্যাণচিন্তা থেকে রাজনীতি করত। ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তা ও অর্থবিত্তের পাহাড় গড়ার উদ্দেশ্য তাদের ছিল না। দেশপ্রেম, দেশ ও মানুষের প্রতি নিখাদ আবেগ আমাদের সত্তাকে সবসময় জড়িয়ে থাকত। অথচ এখন রাজনীতি যেন বাণিজ্যের হাতিয়ার হয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে রাজনীতিকে অবমুক্ত করতে হবে। শুধু আমার একার কথা কেন, দেশের যত মানুষই মুক্তির লক্ষ্যে কণ্টকাকীর্ণ পথ হাঁটতে গিয়ে অনেক কষ্ট ও ক্লেশ সহ্য করেছে তাদের মধ্যে যারা জীবিত আছেন, তারা স্থির প্রত্যয়ে দুর্নীতি-বিমুক্ত নিরাপদ বাংলাদেশ দেখতে চান। খালেদ, জি কে শামীম, সম্রাটদের এই ঔদ্ধত্যের বহিঃপ্রকাশ তারা দেখতে চান না। সেদিন মুক্তিযুদ্ধের জন্য আমাদের প্রজন্ম যে অনন্যসাধারণ ত্যাগ ও তিতিক্ষার পরিচয় দিয়েছেন আজও তারা সেই মননের পাদপীঠেই দাঁড়িয়ে। আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠরা তো প্রয়াতই।

পরিস্থিতি যেভাবে জট পাকিয়েছিল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ধর্ষণ, শিশু ও নারী নির্যাতন যেভাবে নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছিল, তাতে বাংলাদেশটা নিরীহ শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের পক্ষে বসবাসের অযোগ্য হয়ে একটা বিভীষিকার বেলাভূমিতে উপনীত হচ্ছিল। মধ্যযুগীয় জনাকীর্ণ একটা আবাসস্থল যেখানে ন্যায়বিচার, আদালত, প্রশাসন প্রত্যাশিত নিয়মে চলছিল না তো বটেই, সবই যেন অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা চীনের পুতুল। নর্তন-কুর্দন, যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রতীকীভাবে ওইসব চীনা পুতুলের সুতোয় বাঁধা নৃত্যে উঠে আসত। প্রতীকী হলেও এর মধ্যে একটা মেসেজ থাকত বটে। কেউ কেউ সেই মেসেজ পেত, আবার কেউ কেউ পুতুলনাচের মজা দেখে বাড়ি ফিরত। আমার স্পষ্ট মনে আছে, ওই পুতুলনাচের মধ্যেই একজন তরুণ-তাজা-তপ্তপ্রাণ সেজে ন্যায়ের পক্ষে দুষ্কর্মের নটরাজকে যখন ধরাশায়ী করত, তখন মানুষ এতটাই উৎফুল্ল হতো, যেন জগতের সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা বিজয়ী হয়ে গেছে। যেন কোনো ক্লেশ, কোনো শোষণ-নির্যাতন তাদের জীবনের দিগন্তবিস্তৃত আকাশে আর কালো ছায়া ফেলতে পারবে না। এ রকম একটা দুঃসহ পরিবেশে ইত্তেফাকের ‘স্থান-কাল-পাত্র’ কলামে ব্যঙ্গ করে লেখা হয়েছিল, পুতুলনাচে মহিষাসুরের মৃত্যু দেখেছি, ক্ষণিকের জন্য একঝলক আনন্দও পেয়েছি, কিন্তু সমাজের স্খলিত দানবেরা মুচকি হেসে হয়তো ভেবেছে- পুতুলনাচে দানবের মৃত্যু হয় কিন্তু সমাজে কেউ আমাদের লোমও স্পর্শ করতে পারে না। পাকিস্তান আমলে পুুলিশের একমাত্র কাজ ছিল বিরোধী দলগুলোকে অবদমিত রাখা। এই সময়ের আওয়ামী লীগের প্রশাসনযন্ত্রেরও একমাত্র মোটিভেশন ছিল জমি থেকে নিড়ানি দিয়ে একটি একটি করে জামায়াত-বিএনপিকে উপড়ে ফেলা। এটা করতে গিয়ে মজার বিষয় দাঁড়াল এই যে, চোর-ডাকাত, দুর্নীতিপরায়ণ, জামায়াত-শিবির সবাই খোলস পাল্টে আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়ল। শুধু ঢুকেই পড়েনি, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত মামু-খালুদের দোয়া ও বরকতে তারা পদ-পদবিও পেয়ে গেল! তারা না থাকল ভিন্ন দলে, না থাকল বিচ্ছিন্ন হয়ে। আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জমিদখল- সবই পুরোদমে নির্বিঘে চলতে লাগল। এ যেন এক অন্যায়, দৌরাত্ম্য ও ঔদ্ধত্যপনার মহোৎসব। বিগত নির্বাচনের মূল হোতা প্রশাসন বিশেষ করে পুলিশের কর্তৃপক্ষ ওসি থেকে শুরু করে সবাই চিন্তা-চেতনায় ভাবতে শুরু করলেন যে, শেখ হাসিনার বর্তমান সরকারের তারাই স্রষ্টা, তারাই দন্ডমুন্ডের কর্তা।

এই ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনামলেও পুলিশ এতখানি দুঃসাহসিক চিন্তা-চেতনা করত না। প্রশাসন ও পুলিশ ব্রিটিশের আজ্ঞাবহ ছিল বটে, কিন্তু আচারে-ব্যবহারে অনেকটা মার্জিত স্বভাব ধরে রাখত। আগের একাধিক নিবন্ধেও আমি উল্লেখ করেছি, বিএনপির এক শীর্ষ নেতাকে আমি বললাম- রাজনীতি করবেন, আর জেলগেট পেরোতে চাইবেন না, তাহলে আন্দোলন গড়ে উঠবে কীভাবে? তিনি ম্লান হেসে জবাব দিয়েছিলেন, আপনাদের সময় রাজনীতিতে সৌজন্যবোধ ছিল, রাজনীতিকদের সম্মানই ছিল ভিন্নস্তরের। আপনারা কারাগারে গেলেও রাজবন্দী হয়ে থাকতেন। বঙ্গবন্ধু দোর্দ- প্রতাপে পাইপ টানতেন। সমগ্র জেল কর্তৃপক্ষ আপনাদের শুধু সম্মানই দিত না, হুজুর হুজুর করে চলত। আর এখন গ্রেফতার করলে থানায় আমাদের একটা চেয়ার পর্যন্ত দেওয়া হয় না। বরং মাটিতে বসতে বাধ্য করা হয়। কর্মকর্তাদের সে কী চরম দাম্ভিকতা! বেআইনি অস্ত্রের অভাব তো কোনো থানাতেই নেই। হয় মোটা টাকা উৎকোচ, নয় তো রক্ষিত অস্ত্রের মামলা। বিগত নির্বাচনের কিছুদিন আগে শেখ হাসিনা সরকারি কর্মচারী বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা এমনভাবে বৃদ্ধি করলেন, মোটিভেশনের মাধ্যমে তাদের এমন মগজ ধোলাই দিলেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে সবাই ভাবতে বাধ্য হলেন, তারা রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী নন, বরং তারা সংগঠনের কর্মচারী।

আহা রে! বিএনপির বেহাল অবস্থা! নির্বাচনে তারা অংশ নিল বটে, কিন্তু নির্বাচনী কেন্দ্রে এজেন্ট পর্যন্ত দিতে পারল না! সিলমারা ভোটের বাক্সগুলো কেন্দ্রে আসা প্রতিরোধ করতে পারল না! এই এক অভিনব ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। নির্বাচনের নামে নির্মম নিষ্ঠুর তামাশা। সে যাই হোক, এর কোনো প্রতিবাদ হয়নি, বিক্ষোভ ও মিছিল হয়নি। শুধু শেখ হাসিনার একক ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন দেশের রাজনৈতিক অবস্থা মানেই শেখ হাসিনার একক নিরবচ্ছিন্ন ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থান। শেখ হাসিনা তো বটেই, দেশবাসীও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, জীবিত অবস্থায় তাকে কেউ ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে না। দেশে যে ভয়াবহ অশনিসংকেত পরিলক্ষিত হচ্ছিল সেই পরিস্থিতি তার হস্তক্ষেপে কিছুটা অবদমিত মনে হচ্ছে। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি চলমান থাকতে হবে, তাকে প্রত্যয়দৃঢ় হতে হবে। দেশ ও জাতির কল্যাণে অকুতোভয়ে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে অগ্রসর হতে পারলে উন্নয়নের যে প্রত্যাশার প্রচার-প্রচারণা হচ্ছে তা অনেকটাই অর্জন করা সম্ভব হবে। উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণ অতীতের মতো দুর্বৃত্তায়ন নয়, সুদৃঢ় হস্তে দুর্নীতিবিমুক্ত বাস্তবায়ন কামনা করে।

দেরিতে হলেও কিছুটা বিক্ষিপ্তভাবে খালেদ, জি কে শামীম গংদের বিরুদ্ধে, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে দেশবাসী প্রত্যাশা করছে, শেখ হাসিনা এই সাহসী পদক্ষেপ থেকে মাঝপথে সরে যাবেন না। তেমন হলে তাদের হৃদয়ের প্রত্যাশা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে। এ প্রত্যাশাকে ধারণ করে অনিশ্চয়তার বক্ষ বিদীর্ণ করে চূড়ান্তভাবে এগিয়ে যেতে পারলে দেশ দুর্নীতিবিমুক্ত হবে, স্বাধীনতার সুফল জাতি পেতে শুরু করবে। সবচেয়ে বড় কথা- একটা নির্মল ভীতিহীন উন্মুক্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে মানুষ বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে পারবে। যেনতেন প্রকারে নির্বাচন করে জাতিকে যে অন্ধকারের গভীরে শেখ হাসিনা নিপতিত করেছিলেন, ‘দেশ শাসনের প্রশ্নে জনগণই শেষ কথা’- হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এই কথাটি যখন প্রায় বিদ্রুপে পরিণত হয়েছিল, ২০১৯-এর নির্বাচন গণতন্ত্রের সূর্যরশ্মি তো দূরে থাক, শেষ লালিমাটিকেও মুছে দিয়েছিল, তখন অবাধ্য ও উদ্ধত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এখনকার গৃহীত পদক্ষেপ প্রান্তিক জনতার হৃদয়ে একটু হলেও আশার আলো সঞ্চার করেছে। এ আলো সব অন্ধকারের বক্ষ বিদীর্ণ করুক, স্বাধীনতাকে প্রদীপ্ত করুক এবং জনগণের সব সত্তা ও অনুভূতিকে আলোকিত করুক। আজকের দিনে এটিই প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *