‘ভিআইপি’ প্রতারক মশিউরকে নিয়ে বিস্ময়

বৈচিত্র ডেস্ক : সম্প্রতি গ্রেফতার মশিউর রহমান সমাজে ‘ভিআইপি’ প্রতারক হিসেবেই পরিচিত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব বেশি না থাকলেও তার চলাফেরা ছিল অন্যরকম। ২৫ বছর ধরে তিনি অবলীলায় প্রতারণা করে যাচ্ছিলেন।

তার প্রতারণার জালে আটকা পড়ে এরই মধ্যে পথে বসেছেন সাবেক সেনা, বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এই দীর্ঘ সময়ে সারা দেশে তার বিরুদ্ধে ৬৭টি মামলার কথা জানা যায়।

এর মধ্যে ৩৭টি মামলায়ই তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও ২৬টি সাজা পরোয়ানা জারি ছিল। এত মামলায় তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা থাকার পরও তিনি কী করে মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারলেন, সেটি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে বিস্ময়। তবে সঙ্গে শাসক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পর্ক থাকায় তিনি তা কাজে লাগিয়ে নিজেকে দীর্ঘদিন আড়ালে রাখতে পেরেছেন। তার প্রতারণায় সহযোগিতা করেছেন স্ত্রী সাবরিনা রহমান। সাবরিনার বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম  বলেন, প্রতারক মশিউর রহমান নাম-পরিচয় গোপন করে চলতেন। নিজেকে আড়াল করতে দীর্ঘ সময় কোনো এক জায়গায় থাকতেন না। প্রতারণার কৌশল হিসেবে তিনি অফিস ও বাসা পাল্টাতেন প্রায়ই। আর গুলশান, বনানী ও উত্তরা ঘিরেই ছিল তার এসব অফিস।

নতুন অফিস নিয়েই তিনি লাখ লাখ টাকা ব্যয় করতেন ডেকোরেশনে। নতুন অফিস নেয়ার পর শুরু হতো নানামুখী যোগাযোগ। বড় ‘দান মেরে’ তিনি গা-ঢাকা দিতেন। কিছুদিন পর আবার নতুন অফিস নিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পাততেন। বিশেষ করে কাঁচা টাকা ঢেলে তিনি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে ম্যানেজ করে চলতেন।

সম্প্রতি রাজধানীর সবুজবাগ এলাকা থেকে মশিউর রহমানকে গ্রেফতার করে ডিবি খিলগাঁও জোনাল টিম। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়। থাকেন রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায়।

গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে ৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকার জাল নোট এবং ৬ হাজার মার্কিন ডলার জব্দ করা হয়। সূত্র জানায়, মশিউরের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় তিনটি এবং বনানী, গুলশান, নিউমার্কেট ও সবুজবাগ থানায় একটি করে মামলা আছে। এর বাইরে ঢাকা সিএমএম কোর্টে ৩৬টি, চট্টগ্রাম আদালতে ১০টি এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালতে দুটি মামলা আছে। এর মধ্যে শুধু শাহবাগ থানায় তার বিরুদ্ধে ১৮টি এবং কোটালীপাড়া থানায় ১৩টি পরোয়ানা রয়েছে।

মশিউর রহমানের প্রতারণার শিকার হয়ে পথে বসেছে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এরকম ২৮টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পাওনা টাকার প্রমাণসহ ডিবি কার্যালয়ে অভিযোগ করেছেন। তাদের মধ্যে চকবাজারের ব্যবসায়ী জাহিদুর রহমান ১ কোটি ৫৩ লাখ, বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা ১ কোটি ২৫, অবসারপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর মোতাহারুল ইসলাম ৬৫ লাখ টাকা, মেজর (অব.) শাকিল ৩২ লাখ, সুইটি আক্তার ৬৪ লাখ, মোদি দোকানি সুজন ১০ লাখ টাকা। ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর ৩৬ লাখ, আমির হোসেন ১২ লাখ, ফারুক সরকার ২২ লাখ টাকা পান। এছাড়া খাজা গ্রুপ ৬৫ লাখ, আরসি ইন্টারন্যাশনাল ২৫ লাখ, আলিফ ইন্টারন্যাশনাল ২৬ লাখ, আর অ্যান্ড আরআইসি ও আশরাফ সেতু শপিং কমপ্লেক্স পাবেন ৩৯ লাখ ১০ হাজার টাকা, আল সেফা ড্রাগ হাউস ৭৭ লাখ।

আইআইডি এফসি (লোন বাবদ) ১ কোটি ২০ লাখ টাকা, সাগর এন্টারপ্রাইজ ৯৮ লাখ ২২ হাজার, কেয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ ৭৫ লাখ ১৯ হাজার ৬৯০, ওয়ালটন ইলেকট্রনিক্স ১২ লাখ, বেঙ্গল গ্রুপ ৪৩ লাখ, তানিন গ্রুপ ৩৩ লাখ, আর অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজ ২ কোটি ১০ লাখ টাকা, মোহাম্মদীয়া এন্টারপ্রাইজ ৫৮ লাখ এবং বসুন্ধরা সিমেন্ট ২৮ লাখ টাকা পান। এসব টাকা ফেরত পেতে তারা নানা পর্যায়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের খিলগাঁও জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক মো. আরিফুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মশিউরকে গ্রেফতারের পর থেকে পাওনাদাররা ডিবি কার্যালয়ে ভিড় করছে। প্রতারণার মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আমাদের কাছে এ পর্যন্ত ২৮ জন পাওনাদার এসেছে। তাদের দেয়া হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১৫ কোটি টাকা বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে নিয়েছে এ প্রতারক।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের খিলগাঁও জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহিদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মশিউরকে গ্রেফতারের পর তার বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিদিনই ভুক্তভোগীরা অভিযোগ নিয়ে আসছেন। এ পর্যন্ত ৬৭টি মামলার খোঁজ পাওয়া গেছে। মামলার সংখ্যা জানার জন্য সারা দেশে বার্তা পাঠানো হয়েছে। সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সে ২৫ বছর ধরে প্রতারণার কাজটি করে আসছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *