ছাত্ররাজনীতি কতোটা হিংসাত্মক হয়ে উঠেছে তার বিপজ্জনক উদাহরণ আবরারের খুন

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : ছাত্ররাজনীতি কতোটা হিংসাত্মক হয়ে উঠেছে, তার বিপজ্জনক উদাহরণ আবরারের খুন। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজের ছাত্ররাজনীতিতে সহিংসতার আধিক্য বহু দিনের। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশের নানা প্রান্তে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে যে আতঙ্কের পরিবেশ আমরা দেখছি, তা অভূতপূর্ব। আমরা এতোটাই বিভাজিত হয়েছি, পরিস্থিতি যতোই অগ্নিগর্ভ হোক, কিছু মানুষের নিকট রাজনৈতিক আনুগত্য বজায় রাখাই অধিকতর জরুরি। তারা বলে চলেছে, যেহেতু পুলিশ খুনিদের আটক করেছে, তাই আন্দোলনের প্রয়োজন নেই, খুনের প্রতিবাদ করার প্রয়োজন নেই। আজ যা ছাত্রলীগ করছে, আগে তা করেছে ছাত্রদল, শিবির কম বা বেশি। আমাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বহুদিন যাবৎ সহিংসতানির্ভর। ইসলামী ছাত্রশিবিরের রগ কাটা থেকে আজকের এই পিটিয়ে হত্যা। কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন, এবার হিংস্রতার মাত্রা হয়তো বেড়েছে, কিন্তু তা মাত্রার ফারাক মাত্র, চরিত্রের নয়। এবার নতুন কি হলো? আসলে যা নতুন, তা-ই সর্বাধিক উদ্বেগের। এতোদিন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারে লড়াই হতো, মারামারি হতো, এখন এক অতি অপরিচিত অরাজনৈতিক ছাত্র নৃশংসভাবে খুন হলেন শুধু একটি ফেসবুক পোস্টের জন্য।

যুবলীগের কিছু নেতার ক্যাসিনো সাম্রাজ্য, ছাত্রলীগের কর্মকা- নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন ছাত্রলীগ বা যুবলীগ আওয়ামী লীগের কোন কাজে লাগে? প্রধামন্ত্রীর সব ভালো কাজ জনতার দরবারে ম্লান হয়ে যায় এদের কা-ে। বুয়েটের এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবে পুরো ছাত্ররাজনীতি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে ‘কী প্রয়োজন ছাত্ররাজনীতির?’ খুন, সহিংসতা, হানাহানি আর রাজনীতির সমার্থক হয়ে ওঠা সামাজিক অমঙ্গল। আমরা সাধারণ মানুষেরা সামগ্রিক সচেতনতার দিকে এগিয়ে না গিয়ে স্রোতে ভাসিয়ে দিচ্ছি নিজেদের। আর চারপাশের ব্যবস্থা ক্রমে পরিবর্তন হতে হতে এমন এক পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়াচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন বিষয়ের শিকার হলেও আমাদের বিরোধিতার সুর একরকম শোনাচ্ছে না। একটি অতি বিভাজিত সমাজে হয়তো এটাই স্বাভাবিক।
দেশের বর্তমান সাংবিধানিক আইন অনুসারে আঠারো বছর বয়স হলেই যেকোনো নাগরিক নির্বাচনে ভোট দেয়ার অধিকার অর্জন করেন। গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকের মতামতের মূল্য সমান। সেই বিবেচনায় রাজনীতি ছাত্রছাত্রীরা করবেই।

কিন্তু কী সেই রাজনীতি? পশ্চিমা সমাজে ছাত্রছাত্রীরা যথেষ্ট রাজনীতি করে। সেখানে রীতিমতো ছাত্র আন্দোলন হয়, ছাত্র ধর্মঘটও হয়। কিন্তু যা হয় না তা হলো ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতি। আমাদের সমস্যা আমাদের ছাত্রজীবনে দলীয় রাজনীতির ব্যাপক অনুপ্রবেশ। রাজনৈতিক দলের কাছে ছাত্র সংগঠন লেজুড়ে পরিণত হওয়ার কারণে ক্যাম্পাসে দলাদলি, বিশৃঙ্খলা আর হিংসা প্রবলভাবে বেড়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ছাত্ররাজনীতিতে দলীয় প্রভাব কমলে সহিংসতা কমবে, চাঁদাবাজির সংস্কৃতি বন্ধ হবে, আধিপত্যের লড়াই কমবে। দিনে দিনে বড় হয়ে ওঠা সমস্যার চটজলদি সমাধান নেই, কিন্তু একটা রাজনৈতিক দলের কোনো অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন থাকবে না, আর এমন একটা উদ্যোগ সরকার নিতে পারে এখনই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *