দুর্নীতি দমনে আত্মীয়তার তোয়াক্কা করবেন না

নূরে আলম সিদ্দিকী:

এখনকার রাজনীতিতে ব্যতিক্রমধর্মী একটা উদ্যোগ বা প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেটি একদিকে প্রচন্ড আশাব্যঞ্জক, আবার অন্যদিকে নিরাশার দোলাচলে ভীষণভাবে দোদুল্যমান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি দুর্র্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, হত্যা ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে একটা দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতীতি ঘোষণা করেছেন। এটা কতটা চমক, কতটা আন্তরিক- তা তাঁর বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণেই প্রমাণিত হবে। আজকের মূল্যবোধের এ চূড়ান্ত অবক্ষয়, দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজির গডফাদার কে তা শনাক্তকরণের জন্য কোনো জ্যোতিষীর কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, কোনো বিশ্লেষণেরও অপেক্ষা রাখে না। জি কে শামীম, খালেদ ও সম্রাটকে নিয়েই সংবাদমাধ্যম ব্যস্ত রয়েছে। যদিও জি কে শামীম, খালেদ ও সম্রাট কিছু কিছু কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন। স্বল্পমাত্রায় তার যেটুকু সংবাদমাধ্যমে আভাস এসেছে তাতে আমজনতারও আজকে বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না, খালেদ, জি কে শামীম ও সম্রাটদের গডফাদার কে বা কারা। সরাসরি নাম না বললেও পদ ও পদবির উল্লেখসহ তারা যেভাবে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করেছেন, তাতে ব্যক্তি ও ব্যক্তিবর্গকে শনাক্ত করা সরকার বা সরকারপ্রধানের কাছে মোটেও দুরূহ নয়। এখানে সরকার বা সরকারপ্রধানের আন্তরিকতার ব্যাপারটা উল্লেখ করে কোনো লাভ নেই। শুধু নির্দ্বিধায় এ কথাটি বলা চলে, চলমান এ অভিযান ব্যর্থ হলে বা মধ্যম শ্রেণির দুর্বৃত্তদের ওপর নজর নিবদ্ধ রেখে বা তাদেরই সামনে রেখে কর্মকা- পরিচালনা করলে মূল হোতারা সরকার ও প্রশাসনের কাছে সর্বজনজ্ঞাত হওয়া সত্ত্বেও শাস্তির বিধানের আওতায় আসবে না। তাতে সমস্ত উদ্যোগই লোক দেখানো বা মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখার শামিল হবে। এখন সময়টা এতটাই উপযোগী এবং উপসংহারের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে যে, সাহসের সঙ্গে আত্মীয়তার পরিমন্ডল থেকে বেরিয়ে এসে মূল হোতাদের যথাযথ শাস্তি- তা যত রূঢ় ও নির্মমই হোক না কেন, প্রদান করতে পারলে শুধু দুষ্টচক্রের চাক ভেঙে যাবেই না, দুর্নীতিবাজরা শুধু ‘ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি’ই করবে না, বাংলাদেশের দুর্নীতির ৯০ ভাগ বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু মূল গডফাদারদের সম্পূর্ণ কর্মকা-, অস্তিত্ব ও অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পরও যদি যোগ্য শাস্তির (যত রূঢ় ও নির্মমই হোক না কেন) বাইরে রয়ে যায়, তবে দুর্নীতি প্রতিরোধ শুধু দুষ্করই নয়, আগামীতে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। এতে শেখ হাসিনার সব আন্তরিকতা ও অর্জন শুধু ম্লান ও নিষ্প্রভই হবে না, বরং বুমেরাং হয়ে যাবে।

প্রশ্নটা এখন স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে তিনি আত্মীয়তার বিরুদ্ধে কতখানি শক্ত হতে পারবেন। যদিও সাম্প্রতিককালের সংবাদ সম্মেলনে তিনি উচ্চকণ্ঠে বলেছেন, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে পরিচালিত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। দুবর্ৃৃত্ত যে, আমার ঘনিষ্ঠ হলেও তারা পরিত্রাণ পাবে না। কথাটি চমক দেওয়ার জন্য বলে থাকলে স্বতন্ত্র কথা, কিন্তু কার্যকরের লক্ষ্যে বলা হলে শেখ হাসিনাকে অবশ্যই চিহ্নিত গডফাদারদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা অতিসত্বর নিতে হবে। এই গডফাদারদের নেটওয়ার্ক বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। আর তাদের অর্থ, সে তো অপরিসীম- সীমাহীন! এদিক থেকে তারা এতটাই শক্তিশালী যে, অর্থের জোরে তারা প্রশাসনের কোথায় কতটুকু প্রভাবান্বিত করে রেখেছেন- তা আল্লাহ মালুম।

সাম্প্রতিককালের সংবাদ সম্মেলনে তাঁর যে প্রত্যয়দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে, তাতেও স্পষ্ট যে, তিনি গডফাদারদের সম্পর্কে সুনিশ্চিত। এখন শুধু তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অপেক্ষা। এ পদক্ষেপ যত শিগগিরই তিনি গ্রহণ করতে পারবেন ততই তাঁর ও দেশের জন্য কল্যাণকর হবে। নইলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দন্ডিত আসামিদের মতো বিদেশে আশ্রয় নিতে পারলে, তখন কোনো শাস্তি প্রদান করে কার্যকর তো করা যাবেই না, বরং দুর্বৃত্ত ও দুর্নীতিবাজরা ভাবতে সাহস পাবে, শাস্তি প্রদানের উদ্যোগের প্রাক্কালে তারা নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে সক্ষম হবে। শেখ হাসিনাকে বিশ্বাস করতে হবে, আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে তিনি দশভুজা নন। দুর্বৃত্ত অথবা সব পশুশক্তির বিরুদ্ধে দেশের তথাকথিত দেবতারা শেখ হাসিনাকে সম্মিলিত সমর্থন প্রদানও করতে পারবেন না। কারণ তাদের অনেকের মাথাই দুর্বৃত্ত ডনদের কাছে বিক্রি হয়ে আছে। যারা আজও অবিক্রীত আছেন তারাও অকুতোভয়ে মাথা উঁচু করে সত্য কথাটি একযোগে বলতে উদ্যোগী নন। দেশের বর্তমান অবস্থায় যাদের কথা বলা উচিত, তারা ভাবছেন, কোনো ঝুঁকি না নিয়ে বালবাচ্চাসহকারে নিরুপদ্রব সংসারধর্ম পালন করাই শ্রেয়। এ ধারণাটি আরও মারাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারের সাহসী উদ্যোগ ও তার নির্মম পরিণতির মধ্য দিয়ে। হিটলারের নাৎসি বাহিনীর মতো যেসব কর্মকান্ড  চলছে তার বেশির ভাগই সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত হচ্ছে না। তারও কারণ, হয় সংবাদমাধ্যম ভীতসন্ত্রস্ত, নতুবা মাথা বিক্রি করে বসে আছে।

দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও দুরাচার যা-ই হোক না কেন, সেখান থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সত্যিকার অর্থে সেই গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসতে হলে স্বজনপ্রীতিকে সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলতে হবে। হৃদয়ে ও মননে যে কোনো কার্যক্রম ও শাস্তিবিধানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এতটুকু দুর্বলতা ও প্রশ্রয় প্রদানের মানসিকতা থাকলে হবে না। আমি আমার আগের অনেক নিবন্ধে বলেছি, ফ্রাঙ্কেনস্টাইন পালবেন না। কারণ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন এতটাই সর্বভুক যে, প্রতিপালককেও খেয়ে ফেলে। বাংলাদেশের ইথারে একটি কথা জাজ্বল্যমান হয়ে ভাসছে- অসদুপায়ে উপার্জিত অর্থে যারা ফুলে ফেঁপে বিশালাকার হয়েছেন, তারা কিছুটা স্বস্তিতে আছেন এই ভেবে যে, তাদের উপার্জিত অর্থ দেশের বাইরে গচ্ছিত। সুইস ব্যাংক তো বটেই, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক এমনকি ভারতবর্ষেও নানাভাবে তাদের অর্থ গচ্ছিত আছে। শোনা যায়, কেউ কেউ আবার অতিচালাকি করে স্বনামে না রেখে বেনামে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে টাকা অথবা সোনা গচ্ছিত রেখেছেন। সত্যিই তাদের কথা ভাবলে মায়া হয়। এভাবে গচ্ছিত টাকা ও সোনা ঝাঁপিতে রাখা বিষধর সাপের মতো। ঝাঁপি খুললে প্রথম ছোবলটা তাকেই খেতে হবে। অন্যায়ভাবে অর্জিত টাকা এমনিতেই তাদের চিত্তকে অস্থির করে রেখেছে। যেখানেই তারা টাকা গচ্ছিত রাখেন না কেন, যে কোনো সময় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা চব্বিশ ঘণ্টা তাদের আশঙ্কিত করে রাখে। আজকের মতো দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান হলে তো বটেই, যে কোনো সময় ভাগ্যদোষে সম্পদ গচ্ছিত রাখার মাধ্যমদের একজন জায়গামতো ধরা পড়লেই তো সর্বনাশের চূড়ান্ত। এই কদিন আগে জি কে শামীম ও খালেদের নাম কজন জানত? আজকে তাদের যোগ্য শাস্তি এমনকি মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত গণদাবি। অবস্থার বাস্তবতা হলো এই যে, কোনোরকমের ছলচাতুরী করে এ দাবিকে পাশ কাটানো যাবে না। তদুপরি তাদের কাছ থেকে অনেক বিশিষ্টজনের এমনকি সরকারপ্রধানের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের নামও প্রকট হয়ে প্রতিভাত হতে পারে। ছিমছাম দোহারা গড়নের সাদামাটা চেহারার,  নীতিনির্ধারকদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মধ্য থেকে কাউকে ধরে টান দিলে শুধু ক্যাসিনো, মাদক, অসামাজিক কার্যক্রমের শিকড়ই বেরিয়ে আসবে না, সরকারি বলয়ের যেসব চেহারা প্রতিভাত হবে, তা অবলোকন করলে মনে হবে, দুর্নীতির অথৈ সাগরে বাংলাদেশটি ভাসছে, তাও আবার ছোট্ট একটি পানসি নৌকার মতো। পানসি নৌকাটি উত্তাল তরঙ্গমালার মাঝে প্রচ-ভাবে দোল খাচ্ছে বটে, কিন্তু আজকে এখনই উপযুক্ত সময় পানসি নৌকার মালিক আজও যারা সমাজে দুঃসাহস প্রদর্শন করেন, পদপদবি ও আত্মীয়তার জোরে, তাদের শুধু গ্রেফতারই নয়, দ্রুত বিচারের আওতায় এনে কঠিন শাস্তি প্রদানের সময় বয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনীতির ভালোমন্দ সবটুকুই শেখ হাসিনার আঁচলে বাঁধা। বিগত নির্বাচন, যাকে প্রহসন বললেই যথার্থ হবে, তার মাধ্যমে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হলেও শেখ হাসিনা আজ বাংলাদেশে দুর্দমনীয় শক্তি। ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার, জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল, চায়নার সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রাক্কালে মাও সে তুংয়ের চতুর্থ স্ত্রী চিয়াং চিংসহ যেসব লৌহমানবীর নাম ইতিহাসে খ্যাত মনে হয়, একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রশ্নে শেখ হাসিনা তাদের সবাইকে হার মানিয়েছেন। বাংলাদেশকে স্বাধীন করে বঙ্গবন্ধু জগদ্ব্যাপী যে খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি, শেখ হাসিনা আজকে যে অভিযানে নেমেছেন, তাকে সফল করতে পারলে তার সুখ্যাতি একটি অপরিসীম উচ্চতায় উন্নীত করতে পারবেন। সেই উদ্যোগটি তিনি সত্যিকারভাবেই নিতে আগ্রহী কিনা তা-ই বিবেচনার বিষয়। দেশবাসী স্পষ্ট দিবালোকের মতো অবহিত, মাদক ব্যবসা, ক্যাসিনো দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন- সবকিছুরই গডফাদার নীতিনির্ধারকদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আর প্রশাসন এটি স্পষ্ট ওয়াকিবহাল বলেই কচ্ছপের মতো খোলসে মাথা লুকিয়ে রেখেছে। এ কচ্ছপরা নীতিনির্ধারকদের আত্মীয়তার জোরে যে পদপদবি সংগ্রহ করেছিলেন তারই বদৌলতে আজকে জিনের বাদশাহ বনে গেছেন। দুর্বৃত্তায়ন দূরীকরণের অভিযানে সবার প্রথমে যে বা যারা কারারুদ্ধ হয়ে কারাগারের অভ্যন্তরে বসবাস করার কথা, দ্রুত বিচার আইনে বিচার মোকাবিলা করে কঠোর শাস্তি এমনকি মৃত্যুদ- পর্যন্ত ভোগ করার কথা, তারা আজ উদ্ধত বেআদবের মতো দেশবাসীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলেছেন। মূল্যবোধ কোন তলানিতে এসে ঠেকেছে যে, প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য বাপ-চাচা মিলে নিজ হাতে সন্তানকে হত্যা করতে পারে! এটা প্রাগৈতিহাসিক যুগেও সম্ভব ছিল কিনা আমি জানি না।

আমাদের দেশে সংবাদমাধ্যম ও রাজনীতিতে একটা দুরারোগ্য ব্যাধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। যে কোনো একটি রাজনৈতিক ইস্যু ধূমকেতুর মতো আবির্র্ভূত হয় এবং কয়েকদিন সংবাদমাধ্যমে তোলপাড় হয়। আমাদের দেশে কেতাদুরস্ত সুশীলসমাজ মনে হয় ভাগাড়ের মরা গরুর প্রতি শকুনের আগ্রহের মতো ওত পেতে থাকেন এ রকম কোনো একটা রাজনৈতিক ইস্যুর উদ্ভব হয় কিনা। এই কেতাদুরস্ত মোটা ফ্রেমের চশমা আঁটা বুদ্ধিজীবীরা তাদের বুদ্ধিদীপ্ত বিবৃতি হাঁকানোর অমোঘ সুযোগটি গ্রহণ করেন এবং যথাযথ ব্যবহার করেন। কয়েকদিন তোলপাড় হয় কিন্তু সমাধান হয় না, এমনকি সমস্যাটিও বিলুপ্ত হয় না। সমস্যা সৃষ্টির কারিগররা আবার বীরদর্পে সমাজের মধ্যে ঔদ্ধত্য ও দাম্ভিকতার সঙ্গে বিচরণ করতে শুরু করেন। সুবিধামতো সরকারি দলে ঢুকে পড়েন এবং অর্থের জোরে পদপদবিও বাগিয়ে নেন। তারপর আর তাদের পায় কে! যথা পূর্বং – তথা পরং। সেই দাপট, সেই দম্ভ, সেই সমাজবিরোধী অনৈতিক কর্মকা- তারা প্রায় নিয়মিতই চালাতে থাকেন। দিন যত যাচ্ছে, ঘটনার নৈমিত্তিকতা ততই বাড়ছে। আর অসহায় জনগণ নির্বিচারে পরিস্থিতির শিকার হয়ে চলেছে। আবরারের মৃত্যু নিয়ে কয়েকদিন কি তুলকালামই না হলো। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আবরারের পিতা-মাতা সাক্ষাতের বিরল সুযোগও পেলেন, কিছু অর্র্র্থকড়ি ও মর্মস্পর্শী সান্ত¡নার বাণী তাদের নসিবে জুটল। আশঙ্কা হয়, ঘটনাটির এখানেই যবনিকাপাত হয়ে যাবে। আস্তে আস্তে সংবাদমাধ্যমেও বিষয়টি বিস্মৃত হবে। আর জনগণ? তাদের স্মৃতির ওপর তো এমনিতেই বিস্মৃতির চর পড়ে গেছে। যদি দৃষ্টান্তস্বরূপও দ্রুত ফায়ারিং স্কোয়াডে প্রকাশ্যে ওদের মৃত্যুদ- কায়েম করা যেত, তাহলে দুর্বৃত্তদের সীমাহীন ঔদ্ধত্যে জনগণকে আজকের মতো অতিষ্ঠ হতে হতো না। দুর্র্র্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও সন্ত্রাস যেভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে তা প্রতিরোধ করতে হলে সৌদি আরবের মতো বিচার পদ্ধতি প্রয়োগের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। এমনিতেই বিচারপতিদের অভিমত প্রকাশিত হয়েছে যে, বিচারাধীন মামলা এতটাই স্তূপীকৃত হয়েছে যে, তারাও এসব মামলার রায় দিতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে তারা নিজেরাই সন্দিহান।

স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধিকার, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা- ১৯৭০-এর নির্বাচনের ম্যান্ডেট নিয়ে সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা- সবকিছুর মধ্যে আমার একটা গৌরবময় অংশীদারিত্ব ছিল। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্রলীগের প্রত্যক্ষ অবদানই পরাধীনতার বক্ষ বিদীর্ণ করেছে। এও সত্য যে, তখন আপনিও ছাত্রলীগের প্রথম সারির নেত্রী ছিলেন। ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতা-কর্মীর কাছে এটি শুধু গৌরবেরই নয়, প্রত্যাশারও বটে। আপনি সব প্রতিকূলতাকে অস্বীকার করে মাথা তুলে দাঁড়াবেন; দুর্নীতিপরায়ণ দুর্বৃত্ত- সে যেই হোক না কেন, আপনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হলেও আপনি তাকে যথাযোগ্য শাস্তি প্রদানে কুণ্ঠিত হবেন না, বঙ্গবন্ধুকন্যার কাছে এটাই জাতির প্রত্যাশা। এ প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা বঙ্গবন্ধুর আত্মাকে বিদ্রূপ করবে। আপনিও জীবনসায়াহ্নে- এবং চারবার এ দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এমন কিছু করুন, যার ফলে ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। কারও জন্য, কাউকে অব্যাহতি দেওয়ার দুর্বলতায় এ স্বর্ণসুযোগকে অবহেলায় হারিয়ে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন না। দেশের স্বার্থ তো বটেই, নিজের স্বার্থেও আজকের চলমান সুযোগ কাজে লাগান। সুযোগ সবসময় আসে না। আপনার পিতা আজকে প্রাতঃস্মরণীয়, তার কারণ তিনি প্রাপ্ত সব সুযোগ দক্ষ কারিগরের মতো কাজে লাগিয়েছেন ছাত্রলীগের মতো অকুতোভয় সংগঠনের মাধ্যমে। বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনকে তিনি সফল করতে পেরেছেন। সেই ছাত্রলীগকে অঙ্গসংগঠনে পরিণত করলে জিয়া-এরশাদের মতোই পরিণতি নির্মম হবে। আপনি যদি ইতিহাস রচনা করতে চান, তাহলে অনেক শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার সময় আপনার সামনে বিশেষ করে আবরার হত্যার বিচার করতে গিয়ে কে বা কারা ফেঁসে গেল, তা ভাবতে গিয়ে ইতিহাসের উচ্ছিষ্ট ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হবেন না। প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও আপনার বড় পরিচয় আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা, ছাত্রলীগের কর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *