বিতর্কে শহীদ নূর হোসেন, শরীর যার রাজনৈতিক ইশতেহার

রোবায়েত ফেরদৌস : এটাই বোধ হয় বাকি ছিল। দিন কয়েক আগে শহীদ নূর হোসেনকে নেশাগ্রস্ত অভিহিত করেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা। অথচ তার নাম মনে ভাসলেই ভেসে ওঠে টগবগে এক উদোম শরীর। সেখানে রক্তের অক্ষরে লেখা ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’ আর ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। নূর হোসেন বুক দিয়ে পিঠ দিয়ে গোটা শরীর দিয়ে তার রাজনৈতিক ইশতেহার প্রকাশ করে গেছেন। মাত্র ছয়টি শব্দে তিনি তার দুই দফা ঘোষণা করেছিলেন। রৌদ্রের অক্ষরে অনন্য স্লোগান লিখে নিজেই হয়ে উঠেছিলেন এক জীবন্ত পোস্টার। ভুল বানানে বুকে লেখা এক নম্বর দফা ছিল, ‘স্বৈরাচার নীপাত যাক’ আর পিঠে লেখা দ্বিতীয় দফা ছিল, ‘গনতন্ত্র মুক্তি পাক’। রাজনীতিবিদদের বানানো মেকি নির্বাচনী ইশতেহারের মতো কোনো দ্ব্যর্থবোধকতা সেখানে ছিল না। প্রশ্ন হচ্ছে, ৩২ বছর পর এসে যদি ফিরে তাকাই নূর হোসেনের বুকে-পিঠের দুই দফাকে আমরা কি মর্যাদা দিয়েছি? জীবন বাজি রেখে যে দাবি তিনি জানিয়েছিলেন তা কি সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে? বুকে হাত দিয়ে বলব, এর কোনো সদুত্তর আমাদের জানা নেই। কারণ সমাজ ও রাষ্ট্রে বরং নূর হোসেনের চাওয়ার উল্টোটারই অধিষ্ঠান ঘটেছে : স্বৈরাচার মুক্তি পেয়েছে আর গণতন্ত্র নিপাতের পথে গেছে এবং যাচ্ছে; আর নূর হোসেনের কপালে জুটছে নেশাগ্রস্তের কালিমা। ব্যাপক সমালোচনার মুখে অবশেষে গেল ১৩ নভেম্বর জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে নিজ বক্তব্যের জন্য জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন মসিউর রহমান রাঙ্গা। বিতর্ক আর সমালোচনার এই ডামাডোলের ভিতরেই প্রিয় পাঠক! আসুন দেখে আসি, কে এই নূর হোসেন? কী তার বৃত্তান্ত? কেন তিনি জীবন দিয়েছিলেন?

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর জোটবদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচি গ্রহণ করে। এর লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদ সরকারের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি আদায়। রাজধানীতে অন্তত ১০ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটানোর মাধ্যমে এরশাদশাহির পতন নিশ্চিত করতে চেয়েছিল বিরোধী দলগুলো। অন্যদিকে এরশাদ সরকারও যে কোনো মূল্যে বিরোধী দলের কর্মসূচি বানচাল করতে প্রস্তুত। অবৈধ এরশাদ সরকার সারা দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ করে, নেতা-কর্মীদের আটক করে। লঞ্চ-ট্রেন বন্ধ করে দেয়। টানটান উত্তেজনার মধ্যে সব বাধা উপেক্ষা করে ১০ নভেম্বর সারা দেশ থেকে মানুষ ‘নাফ নদীর বানের লাহান’ ঢাকায় আসতে থাকে। ঢাকার রাস্তায় সামরিক-আধাসামরিক বাহিনীও নামিয়ে দেওয়া হয়। সবার মুখে এক স্লোগান- ‘এক দফা এক দাবি, এরশাদ তুই কবে যাবি?’ এ কর্মসূচিতেই নূর হোসেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অভিনব পথ বেছে নেন; গায়ের জামা খুলে উদোম বুকে ও পিঠে সাদা রঙে লিখিয়ে নেন কিংবদন্তির সেই স্লোগান : ‘স্বৈরাচার নীপাত যাক/গনতন্ত্র মুক্তি পাক’। পেছনে নয়, একেবারে মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন তিনি- ছিলেন ‘বীরের মুদ্রায়’। তাকে চিনতে ভুল করেনি পুলিশ। জিরো পয়েন্টে পুলিশের গুলি চিনে নেয় নূর হোসেনকে। আসলে সেই সকালে সচিবালয়ের রাস্তায় এমন জীবন্ত পোস্টারকে সহ্য করা কঠিন। ছুটে আসা গুলি তাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়, রক্তলাল রং ছিটায় তার বুকের লেখায়, স্লোগানের রং মুহূর্তে পাল্টে যায়, সাদা থেকে লালে। তার স্লোগান ভূপাতিত হয় এবং তিনি নিজেও- তার উদোম গা বনপাখির মতো লুটিয়ে পড়ে পিচঢালা রাজপথে।  বনগ্রামের নূর হোসেন হয়ে ওঠেন সমগ্র বাংলাদেশ, হয়ে ওঠেন সারা দুনিয়ার সংবাদ। কবি শামসুর রাহমানের ভাষায় : ‘ঝাঁক ঝাঁক বন্দুকের সিসা, নূর হোসেনের বুক নয়, বাংলাদেশের হৃদয় ফুটো ক’রে দেয়; বাংলাদেশ বনপোড়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে, তার বুক থেকে অবিরল রক্ত ঝরতে থাকে।’ কবি লিখছেন, ‘নেকড়ের দাঁতের মতো, বুলেটে ঝাঁঝরা ঐ যুবার বুকের রক্ত, প্রবল বর্ষার অবিরল জলও রাজপথ আজো মুছে ফেলতে পারেনি।’ নূর হেসেনকে হত্যা করেই এরশাদশাহি ক্ষান্ত হয়নি; নূর হোসেনের বুক-পিঠের ক্যানভাসে যিনি স্লোগান লিখে দিয়েছিলেন খোঁজ করা হয়েছিল সেই স্লোগান লেখককেও। তার পেছনেও গোয়েন্দা লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জীবনের আশঙ্কায় স্লোগান লেখক ইকরাম হোসেন তিনটি বছর পালিয়ে ছিলেন। নূর হোসেনের কবর কোথায় হয়েছিল তা নিয়েও অস্পষ্টতা ছিল। স্বৈরশাসক নূর হোসেনের লাশকেও ভয় পেয়েছিল। কারণ তিনি কেবল লাশ ছিলেন না, ছিলেন স্বৈরাচার পতনের জীবন্ত দাবিনামা। অনেক পরে জানা গেছে, জুরাইনে তার লাশ সমাধিস্থ করা হয়েছিল। জুরাইন গোরস্থানের কবরখোদক আলমগীর বলেছিলেন, ‘তার বুকে-পিঠে লেখা ছিল, সেগুলো ঘইষ্যা তুলতে পারি নাই। পুলিশ-বিডিআর খুব তাড়াহুড়া করছিল। তাড়াতাড়ি কবর দিতে কইছিল।’ কিন্তু জীবন যেখানে দ্রোহের মৃত্যুই সেখানে শেষ কথা নয়, নূর হোসেন মৃত্যুঞ্জয়ী। তাকে নিয়ে অনেক কবিতা, কিংবদন্তি, নিবন্ধ, বক্তৃতা আর লেখালেখি হয়েছে; গণতন্ত্রের জন্য নূর হোসেনের আত্মত্যাগ কবি, লেখক, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির হাজারো মানুষকে আন্দোলিত করেছে; তাকে নিয়ে নাটক হয়েছে, পোস্টারের বিষয় হয়েছেন তিনি, তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘এক গর্ব, নতুন এক সাহস’ হিসেবে; প্রতিজ্ঞা, সংকল্প আর শপথের সমার্থক শব্দ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। রাজপথে দাবি আদায়ের অনুপ্রাণিত আকর্ষণ আর সংগ্রামের অফুরান উৎস হিসেবে তিনি এখনো সমুুজ্জ্বল- যদিও এত দিনে তা কিছুটা ফিকে হয়ে গেছে। তাকে নিয়ে শামসুর রাহমান কমপক্ষে তিনটি কবিতা লিখেছেন : ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’, ‘একজন শহীদের মা বলছেন’, ‘আলো-ঝরানো ডানা’। প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান তাকে, তার বাবা ও পরিবারকে নিয়ে বেশ কটি লেখা লিখেছেন, লেখাগুলো নিয়ে বই সাজিয়েছেন। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী তাকে নিয়ে ছবি আর স্কেচ এঁকেছেন। জিরো স্কোয়ারের নাম এখন ‘নূর হোসেন স্কোয়ার’। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ১৯৯১ সালে তার নামে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। প্রতি বছর ১০ নভেম্বর শহীদ নূর হোসেন দিবস পালিত হয়। নূর হোসেনের জন্ম ১৯৬১ সালে ঢাকার নারিন্দায়। আদি বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার ঝাটিবুনিয়া গ্রামে। নূর হোসেনের বাবা মজিবুর রহমান। পুরান ঢাকার বনগ্রাম রোডের ৭৯/১ নম্বর বাড়িতে একটি মাত্র ঘরের বাসায় থাকতেন তারা। দেশ স্বাধীনের পর থেকে তাদের পরিবার বনগ্রামে বসবাস শুরু করে। টানা ৩০ বছর সেখানে থেকেছেন। চার পুত্র আর এক কন্যা- আলী হোসেন, দেলোয়ার, আনোয়ার আর সাহানা। দ্বিতীয় সন্তান নূর হেসেন। নূর হোসেনের বাবা কখনো মসলা পিষে, কখনো সিক বয়ের ডিউটি দিয়ে, হোস্টেলের বাবুর্চির কাজ করে, রিকশা টেনে, বেবিট্যাক্সি চালিয়ে সংসার চালাতেন। নূর হোসেনের প্রাথমিক শিক্ষা বনগ্রামের রাধাসুন্দরী স্কুলে। ঢাকার গ্র্যাজুয়েট হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে পড়াশোনা বন্ধ করে মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নেন। ঢাকা মহানগরী যুবলীগের বনগ্রাম শাখার প্রচার সম্পাদক ছিলেন।

২০১০ সালে এক সাক্ষাৎকারে নূর হোসেনের মা ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমার সন্তান যে জন্য জীবন দিয়েছে এখনো তার কিছুই দেখছি না।’ তার বাবা বলেছিলেন, ‘এখনো দেশে এত হানাহানি, সন্ত্রাস। গণতন্ত্র তো মুক্তি পেল না।… ছেলেটা যা চেয়েছিল, তা তো হলো না।’ পুত্র হারানোর কষ্টে নূর হোসেনের বাবা মারা গেছেন কিন্তু এরশাদ মুক্তি পেয়েছেন।  সংসদ এখন ব্যবসায়ী-আমলাদের দখলে। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য আর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এখন শিকেয় উঠেছে। নির্বাচন কমিশন প্রশ্নবিদ্ধ। নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথ রুদ্ধ। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আর ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় না। নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য চলে দেদার। হুন্ডা, গুন্ডা, কালো টাকার খেলা থেকে নির্বাচনী ব্যবস্থা বেরিয়ে আসতে পারেনি। রাজনৈতিক দলের ভিতরে কোনো অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা নেই। সমাজে গণতন্ত্রের অন্যতম নিদান দ্বিমত-ভিন্নমত আর পরমতসহিষ্ণুতা নেই বললেই চলে। সব ক্ষমতা একজনের হাতে। ক্ষমতার চূড়ান্ত এককেন্দ্রীকরণ হয়েছে। নেই কোনো জবাবদিহি, ক্ষমতার চেক-অ্যান্ড-ব্যালান্স এখনো তৈরি হয়নি; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি, তৃণমূলে গণতন্ত্রের চর্চা ও বিকাশ নেই। এক ব্যক্তি এক দল-শাসিত এক ধরনের দলতন্ত্র চলছে। জনগণের রাজনীতি সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা পায়নি। রাজনীতি যেন দাবার কূটচাল, কেবলই মিথ্যা কথার প্রতিশ্রুতি- সিংহাসনের হাতলে হাত রাখলে যা উবে যায় কর্পূরের মতো।

আমরা কি নূর হোসেনের কাছে করজোড়ে ক্ষমা চাইব? তবে কি নূর হোসেনের আত্মত্যাগ বৃথা গেছে? তা বোধহয় বলা যাবে না। কারণ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা বলছে, ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীর’ – শরীরের পতন আছে, দেহের মৃত্যু আছে কিন্তু মানুষের যে চেতনা, মানুষের যে স্পিরিট তার মৃত্যু নেই। নূর হোসেন চিরঞ্জীব। কাইয়ুম চৌধুরী নূর হোসেনের স্কেচ করতে গিয়ে ফরাসি বিপ্লবের ওপরে আঁকা ইউজিন দেলাক্রোয়ার ছবি ‘জনগণের নেতৃত্বে স্বাধীনতা’র কথা স্মরণে এনেছেন। কাইয়ুম চৌধুরী লিখেছেন : ‘যে দেশে মানবতা অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হয় প্রতিনিয়ত, সে দেশে এই আত্মদান আমাকে বিমূঢ় করে। গর্বিত হই অন্তরে, উজ্জীবিত হই প্রাণে। দেলাক্রোয়ার স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে নারী জাতির একজনকে বেছে নিয়েছিলেন। গণতন্ত্রের পতাকা হাতে বাংলাদেশে এগিয়ে এসেছিলেন একজন নূর হোসেন। নূর হোসেনের প্রতি অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দেলাক্রোয়ার অমর তুলিকা হস্তে কেউ কি এগিয়ে আসবেন ভবিষ্যতে?’ বব ডিলানের লাইন হতে পারে এর সর্বোত্তম উত্তর : ‘দ্য অ্যানসার, মাই ফ্রেন্ড, ইজ ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড, দ্য অ্যানসার ইজ ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *