আড়াই মাসে পেঁয়াজ আমদানি পৌনে ৫ লাখ টন

বৈচিত্র ডেস্ক : সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ থেকে নভেম্বরের ১৮ তারিখ পর্যন্ত ৭৯ দিনে ভারত, মিয়ানমার, মিসরসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ এসেছে চার লাখ ৭২ হাজার মেট্রিক টন। এতে গড়ে প্রতি কেজির দাম পড়েছে ৩৫ টাকা। যদিও এ সময় পেঁয়াজের চাহিদা পাঁচ লাখ মেট্রিক টনের সামান্য বেশি। আমদানির পাশাপাশি দেশি পেঁয়াজও বাজারে ছিল। এমন প্রেক্ষাপটে পেঁয়াজের দাম আড়াইশ’ টাকার ওপরে ওঠা অস্বাভাবিকই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে গত তিন দিনে দেশি নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসার পাশাপাশি ভোক্তাদের সংযমী আচারণের কারণে পেঁয়াজের দাম দ্রুত কমে আসতে থাকে। তিন দিনে ১০০ টাকার মতো কমেছে সব ধরনের পেঁয়াজের দাম। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে খুচরা ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ কেনা কমে দিয়েছে। খুচরা বাজারগুলোতেও ক্রেতার দেখা খুব কম। সবাই প্রত্যাশা করছেন নতুন পেঁয়াজ আসা শুরু হওয়ায় প্রতি দিনই দাম কমবে। এজন্য ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ অবস্থান নিয়েছেন সবাই।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ থেকে নভেম্বরের ১৮ তারিখ পর্যন্ত এক তথ্যে দেখা গেছে, এই ৭৯ দিনে মোট ৪ লাখ ৭২ হাজার ৫৭৮ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে ভারত থেকে এসেছে সবচেয়ে বেশি। ৪ লাখ ৩১ হাজার ২৪ মেট্রিক টন। ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়ার পর সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ এসেছে মিয়ানমার থেকে। দেশটি থেকে ৩৬ হাজার ৬২ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। এরপর মিসর থেকে এসেছে ৩ হাজার ৯০৮ মেট্রিক টন পেঁয়াজ। এছাড়া চীন থেকে এক হাজার ১৩২ মেট্রিক টন, তুরস্ক থেকে ২৮৬ মেট্রিক টন, পাকিস্তান থেকে ১৩৯ মেট্রিক টন, থাইল্যান্ড থেকে ২১ মেট্রিক টন পেঁয়াজ এসেছে। এখানে লক্ষণীয় যে, ভারত থেকে আমদানি বন্ধ হওয়ার পর অন্যান্য সব দেশ মিলে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ৪১ হাজার ৪৪৫ টন। পেঁয়াজের এই আমদানি তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নিষিদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানিতে খরচ হয়েছে প্রতি কেজি ৩৪ টাকা ৪২ পয়সা। এরপর মিয়ানমার থেকে আমদানিতে গড়ে খরচ পড়েছে ৪৩ টাকা ১৯ পয়সা। আর মিসর থেকে গড়ে ২৫ টাকা ১৫ পয়সা, চীন থেকে ৩৫ টাকা ৭৩ পয়সা দাম পড়েছে। অর্থাৎ সব দেশ মিলে গড় আমদানি খরচ ৩৫ টাকা। অবশ্য এটি ৭৯ দিনের গড়। এর প্রথম দিকে দাম কম ছিল। কিন্তু সঙ্কট ঘনীভ‚ত হলে শেষের দিকে দাম বাড়িয়ে দেয় রফতানিকারক দেশগুলো। যেমন মিয়ানমান শেষের দিকে দাম চারগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল বলে বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

পেঁয়াজের এই আমদানি তথ্য ও মূল্য পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ব্যবসায়ীদের কারসাজি। এই কারসাজির সঙ্গে যুক্ত আড়াই হাজার ব্যবসায়ীকে শাস্তি দেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার বিমানে করে যে পেঁয়াজ আসার কথা ছিল তা লোডিং জটিলতায় আসেনি বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এটি আজ সন্ধ্যা নাগাদ ঢাকায় পৌঁছবে। একই সঙ্গে আজ থেকে প্রতিদিন আড়াই হাজার টন পেঁয়াজ আসবে। এছাড়া টিসিবির মাধ্যমে কার্গো প্লেনে আসবে ৫০ হাজার টন বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।

গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, কার্গো প্লেনে মঙ্গলবার যে পেঁয়াজ আসার কথা সেটা ২৪ ঘণ্টা পিছিয়ে আজ বুধবার সন্ধ্যায় আসবে। কারণ লোড করতে গিয়ে টেকনিক্যাল সমস্যা হয়েছে। তবে কত টন করে পেঁয়াজ আসবে তার সঠিক হিসাব নেই। সাধারণত ১২০ থেকে ২০০ টনের কার্গো প্লেন আসবে। এছাড়া মিসর থেকে যেগুলো আসার কথা সেটা লোড হয়েছে। আজ থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন ফ্লাইটে দেশে পেঁয়াজ আসবে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিদিন একটি করে কার্গোতে পেঁয়াজ আসবে। আপাতত যেটা আসবে সেটা যাত্রীবাহী প্লেনে করে আসবে। মিসর, তুরস্ক, ইজমির ও ইস্তাম্বুল থেকে দু’তিন দিনের মধ্যে পেঁয়াজ আসবে। ২০ তারিখ রাতে সৌদি এয়ারলাইন্স করে প্রথম চালান আসবে। মিসর থেকে ফুল কার্গো প্লেনে করে ২১ তারিখ সন্ধ্যা ৬টায় আসবে। ২২ তারিখ রাত ১টায় যাত্রীবাহী প্লেনে আসবে তুরস্ক থেকে। একই দিন সৌদি এয়ারলাইন্সে করে মিসর থেকে আসবে রাত ১টায়। ২৬ নভেম্বর তুরস্ক থেকে আসবে দুপুর ৩.২৫ মিনিটে। মোট ২০, ২১, ২২ ও ২৬ তারিখে কার্গো ও যাত্রীবাহী প্লেনে পেঁয়াজ আসবে। তিনি বলেন, আমাদের প্রতি বছর ৭/৯ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজের ঘাটতি থাকে। ভারত বন্ধ করে দেয়ায় এখন আমাদের মিশর ও তুরস্কের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। গত বছর এ সময়ে দেশে ১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল। এ বছর মাত্র ৭৬ হাজার টন আমদানি হয়েছে। বছরে আমাদের ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। আর গড়ে প্রতিসাসে ২ লাখ টন। রমজানে লাগে ৫ লাখ টন। গত দুই মাসে এক লাখ টনও পেঁয়াজ আনতে পারিনি। এতকিছু মধ্যে ভালো খবর হলো আমাদের দেশের পেঁয়াজ ওঠা শুরু হয়েছে। ফলে পেঁয়াজর দাম কিছুটা কমেছে। আশা করছি ৭ দিনের মধ্যেই পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক হবে।

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৯০ টাকা কেজি দরে, মিয়ানমারের পেঁয়াজ ১৩০ টাকা, আমদানি করা মিসর ও তুরস্কের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া গাছসহ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে। এদিকে গত দুই দিনের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দর কমেছে ১২০ টাকা। গত সোমবার পাইকারি বাজারখ্যাত শ্যামবাজারে দেশি পেঁয়াজ ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও গতকাল মঙ্গলবার আরো ৬০ টাকা কমে যায় কেজিপ্রতি। বর্তমানে শ্যামবাজারে পাইকারি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে। আর আমদানি করা (মিসর-তুরস্ক) পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১১০ টাকা কেজি দরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *