সাইক্লিস্ট জিনিয়া তাবাসসুম

বৈচিত্র ডেস্ক : শুধু সাইক্লিং নয়। প্রকৃতি দেখ। কোথাও গেলে একটি হলেও ভালো কাজ করে এসো। সেটা যদি একটি গাছ লাগানো হয়। একটি ভালো পরামর্শও হয়। অসুবিধা নেই। কথাগুলো জিনিয়া তাবাসসুমের। তিনি একজন নারী সাইক্লিস্ট।

দেশ ও দেশের বাইরে তার সাইক্লিংয়ের সাফল্যের ফিরিস্তি অনেক লম্বা। তিনি সাইক্লিং করেন। আবার সমাজকল্যাণমূলক কাজও করেন। দুটোই তার ধ্যান-জ্ঞান।

খুলনার দৌলতপুরের মেয়ে জিনিয়া তাবাসসুম থাকেন ঢাকার আজিমপুরে। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে ২০১৭ সালে সফ্টওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক করেছেন। তার বাবা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। তিনি নিজেও একটি বেসরকারি কোম্পানিতে খণ্ডকালীন চাকরি করেন। ইতিহাস, ঐতিহ্য, দর্শনীয় স্থান জিনিয়াকে খুব টানে।

২০১৭-তে সাইকেলে ভ্রমণ শুরু করেন। ২০১৯-এ এসে তার সাফল্যের তালিকা সমৃদ্ধ করেছেন খারদুংলা জয়, চারটি ক্রস কান্টি ভ্রমণ, দেশের মধ্যে ৪৫টি জেলা ভ্রমণ ইত্যাদি। সময় মাত্র দু’বছর। কিন্তু সাফল্য অনেক।

শৈশবে তার চাচাতো ভাইয়ের জন্য সাইকেল কিনে আনা হয়। সেই সাইকেল তিনি লুকিয়ে বাইরে নিয়ে চালানোর চেষ্টা করেন। এভাবেই তিনি সাইকেল চালানো রপ্ত করেন। তার প্রথম রাইড ছিল পার্বত্য অঞ্চলের তিন জেলা। শুরুটা তার অসমতল উঁচু-নিচু জায়গায় সাইক্লিং করে। প্রথম রাইডের ঠিক দু’মাস আগে নিজের উপার্জিত টাকায় তিনি নতুন সাইকেল কিনেন। মডেল ছিল ফিনিক্স টিকে ১২০০।

এ প্রসঙ্গে জিনিয়া তাবাসসুম বলেন, প্রথমদিকে সাইক্লিংয়ের তেমন কিছুই জানতাম না। কোন গিয়ারে কোথায় চালাতে হয় তা-ও বুঝতাম না। দু’বছরে আমি চারটি ক্রস কান্টি শেষ করেছি। ক্রস কান্টিগুলো হল- দেশের এক সীমান্ত থেকে আরেক সীমান্তে কোনাকোনি ক্রস করা। আমার জন্য এটা মোটেও সহজ কাজ ছিল না।

যেগুলো হল- টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, ১১ দিনে ১১০০ কিলোমিটার, দর্শনা থেকে আখাউড়া, ২ দিনে ৩৭০ কিলোমিটার, সাতক্ষীরা থেকে সিলেট এবং হালুয়া থেকে কুয়াকাটা, ৩ দিনে ৪৫০ কিলোমিটার। এখন অবধি ৪৫টি জেলা ভ্রমণ করেছি। প্রত্যেক জেলায় কমপক্ষে একটি স্কুল বেছে নেই। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতামূলক কথা বলি।

জিনিয়া তাবাসসুম বাংলাদেশি হিসেবে একাধিক ক্রস কান্টি ভ্রমণ করেছেন। তিনি প্রথম বাংলাদেশি নারী যিনি সফলভাবে খারদুংলা জয় করেছেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আঠারো হাজার তিনশ’ আশি ফুট উঁচুতে এ খারদুংলা, যা কিনা এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের চেয়েও উঁচু। খারদুংলা জয় তার জন্য কঠিন ব্যাপার ছিল। যাত্রাপথ মোটেও সহজ ছিল না।

জিনিয়া তাবাসসুমের মতে, উঁচু-নিচু পথ। প্রতিকূল পরিবেশ। ঠাণ্ডা লেগে জ্বরে ভুগেছেন। তবুও সাইকেল চালানো বন্ধ করেননি। লক্ষ্যে পৌঁছতে তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। কখনও মনোবল হারাননি। যে ধারণা নিয়ে খারদুংলার পথে গিয়েছিলেন। বাস্তবে তা অনেক কঠিন ছিল। অসুস্থ শরীরে সাইকেল চালিয়েছেন। অতিরিক্ত

ঠাণ্ডায় নাক দিয়ে কখনও কখনও হালকা রক্ত ঝরে। উচ্চতাজনিত সমস্যা তো ছিলই। তিনি ভ্রমণের পাশাপাশি সমাজকল্যাণমূলক কাজ করেন। দর্শনীয় স্থানগুলো দেখেন। কিছু ভালো কাজও করেন। কোথাও গেলে অন্তত একটি হলেও গাছ লাগিয়ে আসেন।

যদি তা-ও না পারেন, তাহলে কিছু সচেতনতামূলক কথা বলেন মানুষের সঙ্গে। সাইক্লিংয়ে নারীরা এগিয়ে আসছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক ছাত্রীরা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যায়। আজকাল শহরে অনেকে অফিসেও সাইকেল চালিয়ে যান। একদিনে সর্বোচ্চ ২২২ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে দর্শনা থেকে ঢাকায় ফেরেন।

সাইকেল ভ্রমণে জিনিয়ার কিছু সুখকর অভিজ্ঞতাও রয়েছে। টেকনাফ তেঁতুলিয়া ক্রস করার সময় এক প্রত্যন্ত এলাকায় জিনিয়ার খাবার পানি শেষ হয়ে যায়। গ্রামের এক বাড়িতে খাবার পানি আনতে যান। সে বাড়ির গৃহবধূ তাদের বসতে দেয়। মুড়ি মাখিয়ে খেতে দেয়। গাছে টসটসে পেয়ারা ঝুলে ছিল। সেগুলো পেড়ে খেতে দেয়।

এমনকি দুপুরে খাওয়ার জন্যও পীড়াপীড়ি করেন। গ্রামের একজন গৃহবধূর এ আন্তরিকতার কথা জিনিয়া আজও ভুলতে পারেননি। সাইকেলে নেপাল ভ্রমণ তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে বারবার পিছিয়ে যাচ্ছেন।

জিনিয়া জানান, নেপালে নির্দিষ্ট সময়ে যেতে হয়। নতুন সাইক্লিষ্টদের একটাই অনুরোধ চোখ কান খোলা রেখে সাইকেল চালাতে হবে। কোথাও গেলে একটি হলেও ভালো কাজ করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *