মুক্তিযোদ্ধা কোটায় উত্তীর্ণ ১২৪ চিকিৎসকের বিড়ম্বনা

বৈচিত্র ডেস্ক : ৩৯তম বিশেষ বিসিএস (স্বাস্থ্য-চিকিৎসক) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ১২৪ প্রার্থীর নিয়োগ নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। অথচ তাদের নিয়োগ বিষয়ে সরকারি কর্ম-কমিশন (পিএসসি) থেকেও সুপারিশ করা হয়েছে। তবে ওই ১২৪ প্রার্থীর মুক্তিযোদ্ধা কোটার তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই শেষে এ সংক্রান্ত উপকমিটি প্রতিবেদন দিলেও তা আমলে নেয়নি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)। ফলে গত দুই মাস ধরে মন্ত্রণালয় ও জামুকা কার্যালয়ে ধরনা দিচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৩৯তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণরা।

এ পর্যায়ে আজ সোমবার ও বুধবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর উপস্থিতিতে জামুকায় উত্তীর্ণদের অভিভাবকসহ সংশ্নিষ্টদের প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তসহ ফের যাচাই-বাছাইয়ে হাজির থাকতে বলা হয়েছে। বেলা আড়াইটায় এ শুনানি শুরু হবে। জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়াদের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই শেষে জামুকার উপকমিটি একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। তবে তা আরও অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্য সংশ্নিষ্টদের ফের শুনানি গ্রহণ করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের একটি নীতিমালা আছে। ওই নীতিমালা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এটি যাতে দ্রুত করা যায় সে জন্য মন্ত্রণালয় তৎপর। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যারা নিয়োগ পেয়েছে তাদের প্রতি আমরা আন্তরিক। কিন্তু আইনের বাইরে কোনো কিছু হবে না।

সূত্র জানায়, গত ৩০ এপ্রিল ৩৯তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ চার হাজার ৭৯২ প্রার্থীকে নিয়োগের সুপারিশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় পিএসসি। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ২০ নভেম্বর চার হাজার ৪৪৩ জন এবং ৮ ডিসেম্বর ১৬৮ জনসহ মোট চার হাজার ৬১১ জনকে নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ বিভিন্ন কারণে ঝুলে যায় ১৮১ জনের নিয়োগ কার্যক্রম। যার মধ্যে ১২৪ জনই মুক্তিযোদ্ধা কোটার প্রার্থী। তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করতে গত ১ অক্টোবর জামুকার সদস্য মো. মোতাহার হোসেন এমপিকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের উপকমিটি গঠন করা হয়। অপর দুই সদস্য হলেন শহীদুজ্জামান সরকার এমপি ও মেজর (অব.) ওয়াকার হাসান বীরপ্রতীক। উপকমিটি ২২ অক্টোবর ও ২৪ নভেম্বর পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা কোটার ১২৪ জনের মুক্তিযোদ্ধা অভিভাবকের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। পরে তাদের বিষয়ে জামুকার ৬৬তম সভায় প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। সব প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে। কিন্তু সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেক মুক্তিযোদ্ধার যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত উপজেলা কমিটির প্রতিবেদনে তিন শ্রেণির সুপারিশ পাওয়া গেছে। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও জামুকার চেয়ারম্যান আ ক ম মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বাধীন জামুকার ৬৬তম সভায় সংশ্নিষ্টদের বিষয়ে ফের শুনানি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিকে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় উত্তীর্ণ ১২৪ জনের মধ্যে ১০৪ জন গত ১৯ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। এতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যাচাই-বাছাইয়ে বিড়ম্বনার কথা তুলে ধরে এ সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।

যে কারণে জটিলতা :মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে  গেজেটভুক্তির জন্য ২০১৪ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ আবেদন গ্রহণ করা হয় মন্ত্রণালয়ে। পরে তাদের সবাইকে যাছাই-বাছাইয়ের জন্য ডাকা হয়েছিল। ২০১৭ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে দেশের ৪৭০টি উপজেলা, জেলা, মহানগরে কমিটি গঠন করে আবেদনকারী ব্যক্তিদের যাচাই-বাছাই শুরু করা হয়। সংশ্নিষ্ট কমিটি থেকে তিনটি (ক,খ ও গ) শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে। তবে ৪৭০টি কমিটির মধ্যে ৮৫টি কমিটি আইনি জটিলতায় কোনো প্রতিবেদন দেয়নি। যারা প্রতিবেদন দিয়েছে সেই তালিকা অনুযায়ী ‘ক’ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত। অর্থাৎ ‘ক’ শ্রেণিতে সুপারিশপ্রাপ্তরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হবেন। ‘খ’ হচ্ছে কমিটির দ্বিধাবিভক্ত তালিকা। অর্থাৎ তাদের বিষয়ে উপজেলা কমিটির একটি অংশ সায় দিয়েছে, অপর অংশ বিরোধিতা করেছে। আর ‘গ’ হচ্ছে কমিটির নামঞ্জুর করা তালিকা। অর্থাৎ তারা মুক্তিযোদ্ধা নন। জামুকা সূত্রে জানা গেছে, পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত ১২৪ জনের মধ্যে কোনো তালিকায় নাম নেই এমন সংখ্যা ৩৪। জামুকার কোনো প্রতিবেদনে নেই এমন সংখ্যা ২৭। ‘গ’ তালিকায় আছে ৮ জন। এখন প্রশ্ন- কোনো তালিকায় নাম না থাকা ৩৪ জন ও ‘গ’ তালিকার ৮ জনকে কিসের ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। তাই জামুকার উপকমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী ১২৪ জনকেই নিয়োগের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হলে ‘গ’ তালিকার ৮ জন, কোনো তালিকায় নাম না থাকা ৩৪ জন এবং প্রতিবেদন না পাওয়া ২৭ জনসহ সবাইকেই মুক্তিযোদ্ধার গেজেট ও সনদ বহাল রাখতে হবে। অর্থাৎ তাদের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বলে স্বীকার করে নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই এখনও শেষ হয়নি। যাদের নাম কোনো তালিকায় নেই বা যাদেরকে ‘গ’ শ্রেণিতে নামঞ্জুর করা হয়েছে, তাদের প্রায় অধিকাংশ জামুকায় আপিল করেছে। তাই এসব প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই শেষ হয়েছে- বলা যাবে না। অনেকে আবার হাইকোর্টে রিট করেছেন। যার ফলে বিষয়টি জটিলতর হয়েছে।

অন্যদিকে ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়া এক চিকিৎসক সমকালকে বলেন, জামুকার উপকমিটি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ১২৪ জনকেই নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছে। মন্ত্রণালয় একটু আন্তরিক হলেই তাদের নিয়োগ নিয়ে জটিলতা দূর করা সম্ভব। তার মতে, চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ে কেউ যদি অমুক্তিযোদ্ধা প্রমাণিত হন, তাহলে তার (সন্তান) নিয়োগ তো পরেও বাতিল হতে পারে। মন্ত্রণালয় এ ধরনের শর্তারোপ করে দিলে সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *