পাখির বাড়িতে পাখি দেখা

বৈচিত্র ডেস্ক : ঘুম ভেঙেছে সেই কখন এরপরেও ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছা করছে না। এদিকে হঠাৎ করে মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরতেই ওপর পাশ থেকে তানভীর ভাইয়ের গলা ভেসে এলো। সুমন্ত আর কত ঘুমাবে উঠে তৈরি হয়ে নেও। আমি ঝটপট ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। হাতের কাজ শেষ করে নিলাম দ্রুত। গাড়ি আগে থেকেই উপস্থিত। আমরা বেড়িয়ে পড়লাম নতুন গন্তব্যের পানে। শুক্রবার তাই রাস্তায় তেমন একটা যানজট নেই। তবে সূর্যদেবের উজ্জ্বল হাসিরও দেখা নেই। তার মাঝেই আমরা এগিয়ে চলছি। জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। ও বলাই হল না আমরা যাচ্ছি সিলেট শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে সালুটিকরের ছালিয়া গ্রামের পাখি বাড়িতে। শহরের আবহাওয়া ছেড়ে লাক্কাতুরা চা বাগানের দিকে ঢুকতেই বেশ ঠাণ্ডা অনুভব করলাম। যেতে যেতে চা গাছের নতুন পাতা দেখতে বেশ ভালোই লাগছে।

আমরা এসে পৌঁছলাম সালুটিকর এলাকায়, স্থানীয় একজনকে বলতেই দেখিয়ে দিলেন পাখি বাগানের পথ। আমরা উপস্থিত হলাম পাখি বাগানের সামনে। অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করলাম পাখি বাগানের ভেতর। দেখা পেলাম হরেক রকমের পাখি। পাখির ডাকে চারপাশ মুখরিত। পাশে দেখতে খাঁচার ভেতর হরিণ ঘুরে বেড়াচ্ছে তার পাশেই একটি খাঁচার ভেতর বানর লম্ফঝম্প করছে।

আমাদের মতো অনেকেই এসেছে ঘুরতে এখানে। এখানকার স্থানীয় রহিম মিয়ার সঙ্গে কথা হল তিনি বললেন বাড়ির মালিক নুরুদ্দিন বাজারে গেলেই পাখি কিনতেন। কখনও এক জোড়া, কখনও চার-পাঁচ জোড়া। বাড়িতে এনে সেগুলোকে ছেড়ে দিতেন। বলতেন, ‘পাখির জায়গা খাঁচায় না, আকাশে।’ কিছু পাখি তার তিন একর বাড়ির গাছগাছালিতে থেকে যেত। দেখাদেখি আরও পাখি আসতে থাকে, একসময় তা সংখ্যা ছাড়িয়ে অসংখ্য হয়ে যায়। বাড়ি থেকে পাখিদের জন্য খাবারও দেয়া হয়।

কেউ সে বাড়িতে পাখি শিকার করতে আসে না এবং বাড়ির কেউই পাখিও শিকার করে না। তাদের ধারণা, কেউ এ পাখি শিকার করলে বাড়ি থেকে বের হতে পারবে না। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে মারা পড়বে! নুরুদ্দিন সাহেব বর্তমানে বেঁচে নেই। কিন্তু বাড়িকে বানিয়ে গেছেন পাখিদের নিরাপদ অভয়াশ্রম। নুরুদ্দিন সাহেবের ছেলে বাড়ির দেখভাল করেন। আমরা পুরো বাড়ি ঘুরে দেখতে লাগলাম।

একেকটি গাছে প্রায় ২০-২৫টি পাখি নিজেদের মতো করে সাজিয়েছে বাসা। কোনো বাসাতে দেখা মিলছে নীল ও সাদা রঙের ডিম। কোনো বাসাতে ছোট-বড় আকারের ফুটফুটে বাচ্চা। মায়াবী সন্তানের মুখে সরু ঠোঁটের আদর মাখা খাবার তুলে দিচ্ছে পাখিরা। নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেশীয় প্রজাতির পাখি। আকাশের মন ভালো নেই তাই ছবি তুলতেও বেশ কষ্ট হচ্ছিল।

এরপরেও দেখে খুব ভালো লাগছিল সবুজ পাতা ও বাঁশঝাড়ের ফাঁকে খড়কুটো দিয়ে আপন মনে ঘর সাজিয়ে বসবাস করছে বক, পানকৌড়িসহ বিভিন্ন জাতের ডানামেলা পাখির দল। রহিম মিয়া বলছিলেন ভোরের সূর্যের আলো ফোটার সঙ্গেই দলবদ্ধ হয়ে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে পাখিরা। সূর্যাস্তের আগেই বাচ্চাদের জন্য খাবার নিয়ে নীড়ে ফিরে আসে তারা।

লতাপাতা আর খড়কুটো দিয়ে গাছের মগডালে তৈরি করা অস্থায়ী বাসায় পাখি। নিজেদের মতো করে বোনা বাসায় ডিম পাড়া, বাচ্চাদের যত্নসহকারে লালন করার কাজগুলো অভয়ে নিজের মতো করে যাচ্ছে তারা।

পালাবদল করে ডিমে তা দেয়া ও বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দেয়ার মতো কাজ সাধারণভাবে মানিয়ে বসবাস করছে পাখিগুলো। তাই নানা বর্ণের পাখির কলকাকলিতে মুখরিত বাড়িটিতে প্রতিদিন পাখিপ্রেমী মানুষের ভিড় লেগেই থাকে।

যাত্রাপথের ঠিকানা : সিলেট শহর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে ছালিয়া গ্রামে এ পাখি বাড়ির অবস্থান। সিলেটের আম্বরখানা ইস্টার্ন প্লাজার সামনে থেকে সিএনজি অটোরিকশা করে সে বাড়িতে যাওয়া যায়।

রাস্তার ডানদিকে আলিশান একটি বাড়ি যা পাখিবাড়ি নামেই পরিচিত। সালুটিকর পাগলা বাজারের কিলোমিটার খানেক আগেই এ বাড়িটি পাখিদের নিরাপদ এক আশ্রয়স্থল। এরপরে আপনি ঘুরে আসতে পারেন মালিনিছড়া চা বাগানে অবস্থিত রাবার বাগানে। ফিরতি পথেই পাবেন মালিনিছড়া চা বাগানের দেখা। সেখানে যে কাউকেই বললেই দেখিয়ে দেবে রাবার বাগানের খোঁজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *